উজানের ঢলে বাড়ছে তিস্তার পানি, নিম্নাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল রোববার দুপুর ১২টায় তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার রেকর্ড করা হয়েছে। গত শনিবার থেকেই পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করায় ব্যারাজের ভাটিতে থাকা নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় তিস্তার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এরইমধ্যে পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি ও আবাদি জমিতেও পানি ঢুকতে শুরু করেছে। তবে বর্তমানে মাঠে উল্লেখযোগ্য কোনো মৌসুমি ফসল না থাকায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা নেই বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে আগামী ৭২ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে করে স্বল্পমাত্রার বন্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, মূলত উজানের ঢল এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণেই তিস্তা ও ধরলায় বন্যার সৃষ্টি হয়। শনিবার থেকেই তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং বৃষ্টির কারণে পানি মাত্রা ওঠানামা করছে। তিনি আরও বলেন, বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আমরা ধরলা এবং তিস্তা নদীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছি এবং সতর্ক অবস্থায় রয়েছি।

৩ বিভাগে ৩ দিন ভারী বৃষ্টির শঙ্কা, হতে পারে বন্যা : আগামী তিন দিন ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর বিভাগে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এতে সেখানে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। গতকাল রোববার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের সব প্রধান নদ-নদী বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদী ডালিয়া (নীলফামারী), কাউনিয়া (রংপুর) ও ভারাপুর (গাইবান্ধা) স্টেশনে, সুরমা নদী কানাইঘাট (সিলেট), ছাতক (সুনামগঞ্জ) ও সুনামগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) স্টেশনে, কুশিয়ারা নদী ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) স্টেশনে এবং সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরে চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী এবং রংপুর ও সিলেট বিভাগে মাঝারি-ভারী থেকে ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে। উজানে ভারতের মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ ও অরুণাচল প্রদেশে অতি ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে।

আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন দিন দেশের অভ্যন্তরে রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী এবং পরবর্তী দুই দিন মাঝারি-ভারী থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, অপরদিকে যমুনা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল রয়েছে। নদ-নদীগুলোর পানি সমতল আগামী পাঁচ দিন বাড়তে পারে, তবে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।

গত ২৪ ঘণ্টায় গঙ্গা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী দুই দিন অব্যহত থাকতে পারে এবং পরবর্তী তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে।

অপরদিকে পদ্মা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল রয়েছে, যা আগামী দুই দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং পরবর্তী তিন দিন বাড়তে পারে। তবে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।

গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী তিন দিন বাড়তে পারে।

এ সময়ে নদীগুলোতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

রংপুর বিভাগ : বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী তিন দিন বৃদ্ধি পেতে পারে।

আগামী ৭২ ঘণ্টায় নদীগুলো নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলায় বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

ময়মনসিংহ বিভাগ : গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ময়মনসিংহ বিভাগের সোমেশ্বরী, জিঞ্জিরাম ও ভুগাই নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে, অপরদিকে কংস নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। উক্ত নদীগুলোর পানি সমতল আগামী তিন দিন বাড়তে পারে। এ সময়ে নদীগুলো নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

সিলেট বিভাগ : গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগের সারিগোয়াইন ও জাদুকাটা নদীর পানি সমতল বেড়েছে, অপরদিকে মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে; যা আগামী তিন দিন বাড়তে পারে।

চট্টগ্রাম বিভাগ : গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় চট্টগ্রাম বিভাগের মুহুরী ও হালদা নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে, অপরদিকে ফেনী, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, সেলোনিয়া ও গোমতী নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে।

উক্ত নদীর পানি সমতল আগামী তিন দিন দ্রুত বাড়তে পারে।

এদিকে গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তর ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তায় বলেছে, সক্রিয় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গতকাল সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (৪৪-৮৮ মি.মি. ২৪ ঘণ্টা) থেকে অতি ভারী (১৮৮ মি.মি./২৪ ঘণ্টা) বর্ষণ হতে পারে।