আগামী ২ বছর সময় কঠিন যাবে : অর্থমন্ত্রী
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
অর্থনীতি নানামুখী চাপে থাকায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতিরও তেমন ‘উন্নতি না মেলায়’ আগামী ২ বছর সময় ‘কঠিন’ যাবে বলে সতর্ক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ব্যবসায় চাঙ্গা ভাব না এলেও এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল না হওয়া সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির বাজেট ঘোষণায় নানান আশার কথা শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অথচ বাজেট বিষয়ক এক আলোচনায় গতকাল সোমবার আমির খসরু বলেন, ২ বছর সময় ‘কঠিন যাবে’ আমি ‘আগেভাগে বলছি’। দুইটা বছর কষ্ট করতে হবে সবাই মিলে।
‘আর জনগণের লাইফ যেটা (স্বাভাবিক রাখার) ওটা আমরা করব নীতির ভিত্তিতে। সহায়তার ভিত্তিতে। যতটুকু সীমিত আমাদের সম্পদ ওটা দিয়েই আমরা করব। ওইটা বলছি না। কিন্তু এটা (অর্থনীতি) ঘুরে দাঁড়াতে, এই যে ভঙ্গুর থেকে স্থিতিশীলতা, সেটার জন্য দুবছর লাগবে।’
আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে অর্থপাচার বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং কোভিড মহামারি পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে অর্থনীতির যে অস্থিতিশীল অবস্থা দেখা গেছে তার ক্ষত আরও গভীর হয় জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতিতে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা জাগলে ব্যক্তি খাতে স্থবিরতা দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সময় প্রয়োজন বলে আসছিল অর্থনী্তরি বিশ্লেষকরা; একই সঙ্গে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বড় অঙ্কের বাজেট দেখাতে সংখ্যার মুনশিয়ানা না দেখিয়ে বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ ছিল তাদের।
দুর্নীতি কমানো, সরকারি ব্যয়ের অপচয় রোধ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির কথা বলছিলেন তারা; এতে প্রবৃদ্ধি কম হলেও তাতে প্রকৃত পক্ষে কর্মসংস্থান তৈরি এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির দেখা মেলার সম্ভাবনা দেখছিলেন। তবে সরকার সে পথে না হেঁটে এত বড় বাজেট ঘোষণার পথে হাঁটায় বাস্তবায়ন নিয়েই ‘শঙ্কা দেখা দিয়েছে’; এর মধ্যে ‘কঠিন সময়ের’ বার্তা দিলেন অর্থমন্ত্রী। ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের সহযোগিতায় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যদি বলি কালকে সকালে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, এটা এটা এই কমিটমেন্টটা আমি দিতে চাইব না। এটার জন্য দুবছর সময় প্রয়োজন।
‘এই ভঙ্গুর অর্থনীতি, খারাপ অর্থনীতি থেকে স্থিতিশীল করতে দুই বছর লাগবে। তৃতীয় বছরে অর্থনীতিং ঘুরে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ। ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে অর্থনীতি হবে ‘প্রসপারিটি অব বাংলাদেশ’। চতুর্থ ও পঞ্চম বছর হবে ‘প্রসপারিটি ফর বাংলাদেশ’। চতুর্থ ও পঞ্চম বছর হচ্ছে সমৃদ্ধির বাংলাদেশ- আমরা দেখব।’ পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতেও ২ বছর প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ক্যাপিটাল মার্কেট, এগেইন আমি তো বলছি দুই বছরের কুশন দরকার। আপনি দেখবেন ইনশাআল্লাহ সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ঘুরে দাঁড়াবে। ‘এবং আমাদের বিশাল একটা অপরচুনিটি ক্রিয়েট হবে ক্যাপিটাল মার্কেটে, বিশাল অপরচুনিটি। সবার জন্য।’
কীভাবে হবে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এইজন্য আমরা ক্যাপিটাল মার্কেটের প্রথম আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আস্থাটা ফিরিয়ে আনা। এইজন্য আমরা একটা কমিশন করেছি যারা একদম ইন্ডিপেন্ডেন্ট, নন পলিটিক্যাল এবং পুরোপুরি পেশারদার লোক। ‘সুতরাং এরা সব আইনগুলো চেঞ্জ করছে যাতে আমাদের ইনভেস্টররা সিকিউর থাকে। যারা তালিকাভুক্ত হবে কোম্পানিগুলো তারা যেন আস্থা পায় যে, এই ক্যাপিটাল মার্কেটে তার শেয়ারটা প্রোপারলি লেনদেন হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল যারা ইনভেস্টর আছে তাদের যেন বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেটের ওপর আস্থা থাকে।’ মন্ত্রীর ভাষ্য, ‘ডিরেগুলেশন ইজ এ বিগ মুভ।’ আমি জানি এটা খুব কঠিন। অনেক বাধাগ্রস্ত আমি হয়ে গেছি অলরেডি। এরই মধ্যে করার (ঘোষণা) সময়ই বাধাগ্রস্ত হয়েছি।
‘এটা এক্সিকিউশন করতে গেলে আরও বাধাগ্রস্ত হব আমি জানি কিন্তু যত কঠিন ডিসিশন নিতে হয় আমি নিতে প্রস্তুত আছি।’ তিনি বলেন, ‘এই ডিরেগুলেশনের পথে যদি কেউ বাধাগ্রস্ত হয়, তাদের আমরা বেরিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দিব। ওই যে দরজা আছে পেছনে ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যান। কোনো দরকার নেই (তাদের)। দেশ হিসেবে আমরা অনেক ‘সাফার’ করেছি। বাংলাদেশের মানুষের এখন চায় একটা সত্যিকার মুক্ত জীবন যাপন করতে।’ বাজেট বক্তৃতায় সাড়ে চার পৃষ্ঠা এ নিয়ে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী; সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনুমোদন ও লাইসেন্স নিতে যেসব বাধার শিকার হতে আমলাতান্ত্রিক কারণে সেসবের অনেককিছু কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয় সরকারের তরফে। একই সঙ্গে আমদানির ক্ষেত্রে নানান বাধা কমিয়ে আনারও কথা বলা হয়, যেসব নিয়ে দীর্ঘদিন অভিযোগ ছিল ব্যবসায়ীদের। এসব থাকায় ঘুষের লেনদেন এবং ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়। কালক্ষেপণও হয়ে থাকে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বিজনেস স্কুলের ডিন প্রফেসর এমএ বাকী খলিলী এবং সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ এর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। এমএ বাকী খলিলী আগামী করবর্ষের ব্যক্তিশ্রেণির করকাঠামোর সমালোচনায় বলেন, এরজন্য করের চাপ বেড়ে সীমিত আয়ের মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমে।
তার ভাষ্য, যদি সঞ্চয় না বাড়ে, সম্পদ তৈরি না হয়, তাইলে অর্থনীতির সুদিন ফিরবে না। কারণ তারা (সীমিত আয়ের মানুষ) তো ভোক্তাও বটে। তো সেই কনটেক্সটে আমার কাছে এইবারের যে আয়করের হারের কাঠামো যেটা সরকার দিয়েছে, তা কিছুটা ‘রিগ্রেসিভ’ মনে হয়েছে।
‘কারণ এর আগে ৫ শতাংশ হার একটা ছিল। আমরা যারা ঢাকায় থাকি অনেকের সীমিত আয় আছে। শহরের অন্যান্য প্রান্তেও অনেকে থাকে। আমার কাছে মনে হয় শতাংশ হার এটি রাখা উচিত ছিল সরকারের।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মোজিবুল হক বিশ্ববিদ্যালয় মুনাফা না করায় এখান থেকে কর্পোরেট করের হার কমানোর অনুরোধ করেন। অন্যথায় আইন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুনাফা করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন যাতে যাদের প্রয়োজন তারা মুনাফা করতে পারেন, যাদেএ প্রয়োজন না তারা ট্রাস্টিজের মাধ্যমে পরিচালনা করেন। আগামী করবর্ষের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্পোরেট করহার ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার; বিএনপি সরকারব বাজেটে সেটি অপরিবর্তিত রাখে। বর্তমানে এখানে ১৫ শতাংশ কর রয়েছে।
