করের আওতায় আসছে মুদি দোকানসহ ১৬ খাত

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

মুদি দোকান, বিউটি পার্লার, রেস্তোরাঁসহ ১৬ ধরনের ব্যবসায়িক খাতকে নতুন অর্থবছরে ভ্যাটের সুনির্দিষ্ট করের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়। নতুন প্রতিষ্ঠান বা উৎসকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে কি না- সেলিনা সুলতানার এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জি।’ তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যেসব ব্যবসায়িক খাতকে ভ্যাটের সুনির্দিষ্ট করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলো হল- মুদি দোকান, তৈরি পোশাক বা কাপড় বিক্রেতা, কনফেকশনারি, কসমেটিক্সের দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালী পণ্য এবং জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার পণ্যের বিক্রেতা, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বিক্রেতা। এছাড়া পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার এবং স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলসের দোকান, ঢেউটিনের দোকান, রড ও সিমেন্ট, ফার্নিচার, বিউটি পার্লার, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং রেস্তোরাঁকেও এ পরিকল্পনার আওতায় রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করেন।

খুচরা দোকানিদের কাছ থেকে ভ্যাট নিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর নেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয় তার প্রস্তাবিত অর্থবিলে। তবে এর পরিমাণ এখনও স্পষ্ট হয়নি। এছাড়া খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে দুই টাকা কর কেটে রাখার বিধান প্রস্তাব করা হয় বাজেটে।

মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ : আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল বুধবার বিকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৪তম দিনে লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন লিখিত প্রশ্ন টেবিলে উত্থাপিত হয়। বিকাল তিনটায় শুরু হওয়া জাতীয় সংসদের বৈঠকে এ পর্যায়ে সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। প্রসঙ্গত, বিবিএস এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।

নওগাঁ-৩ আসনের এমপি মো. ফজলে হুদা তার প্রশ্নে জানতে চান- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত এলাকাগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ কোনো বরাদ্দ রাখা হয়েছে কিনা?

জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে বর্তমান সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। সেই লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় সরকার লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে মাসে ২,৫০০ টাকা করে সহায়তা প্রদানের জন্য ১৪,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় ১০০ উপজেলায় ৪২ দশমিক ৫ লাখ কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা এবং এ বাবদ ১,০৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিয়ে তাদের ভোগক্ষমতা ও জীবিকা সুরক্ষা বজায় রাখা।’

খাদ্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখার জন্যও সরকার একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে ৫৫ লাখ উপকারভোগী পরিবারকে কর্মাভাবকালীন ৬ মাসে ১৫ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল প্রদান করা হচ্ছে। সারা দেশে ১ হাজারের বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে চাল ও আটা সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ৪১৯ উপজেলায় অতিরিক্ত ওএমএস কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যার আওতায় প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া সরকারি খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৩ দশমিক ১৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে ২৪ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীতকরণের উদ্যোগ এবং খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ দশমিক ১৯ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে ৪১ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত এলাকাগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। বাজেটে উত্তরাঞ্চলের জন্য আলাদা অংকভিত্তিক বরাদ্দ নির্দিষ্ট করা না হলেও সামগ্রিকভাবে ভৌত অবকাঠামো খাতে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের আওতায় দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, বিশেষায়িত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কোল্ড-চেইন, সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও লজিস্টিকস উন্নয়নের বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদল ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ সরকার মনে করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়ন-এই সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সমীক্ষায় বরাদ্দ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা : পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে চলতি বাজেটে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য নুরুন্নিসা সিদ্দীকার এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নুরুন্নিসা সিদ্দীকা বলেন, রাজবাড়ী জেলার দৌলতদিয়া এবং মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটের মধ্যবর্তী স্থানে বহুল প্রতীক্ষিত ‘দ্বিতীয় পদ্মা সেতু’ নির্মাণের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছি কি না, না থাকলে কারণ কী?

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিশ্রুত উল্লেখযোগ্য প্রকল্প। বর্তমানে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে সেতু বিভাগের আওতাধীন সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় (সবুজ পাতা) ‘পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্তকরণের সুপারিশ করা হয়েছে।’

দ্বিতীয় পদ্মা সেতু গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দ্বিতীয় পদ্মা সেতু’ নির্মাণের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে প্রকল্প নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার লক্ষ্যে সেতু বিভাগের আওতাধীন সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে (নিজস্ব অর্থায়ন) ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাজেটে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় বিশেষ প্রস্তুতি : বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং বহিঃখাতের সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার কয়েকটি বিশেষ প্রস্তুতির ব্যবস্থা রেখেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল বুধবার সংসদে চাঁদপুর-২ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো: জালাল উদ্দিনের টেবিলে উপস্থাপিত এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রফতানি বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ সম্প্রসারণ এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের কারণে জ্বালানি, এলএনজি ও সারের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভর্তুকি সহায়তা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বহিঃখাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ‘থ্রি-আর স্ট্র্যাটেজি’ অনুসরণ করছে বলেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। এ কৌশলের আওতায় পুনরুদ্ধার পর্যায়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, উত্তরণ পর্যায়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বহিঃখাতকে শক্তিশালী করা এবং পুনর্গঠন পর্যায়ে উৎপাদনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের প্রধান গন্তব্য হওয়ায় সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস, সার্বিয়া এবং নর্থ মেসিডোনিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখতে বৈধ চ্যানেলে পাঠানো অর্থের ওপর বিদ্যমান ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হবে এবং বহিঃখাতের সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় সতর্কতামূলক পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

মার্চ পর্যন্ত মোট বৈদেশিক ঋণ ৭৮.২২ বিলিয়ন ডলার : গত মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ৮২২ কোটি মার্কিন ডলার। গতকাল বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান। দিনের কার্যসূচির শুরুতেই প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উত্থাপিত হয়। লিখিত জবাবে মন্ত্রী জানান, বৈদেশিক ঋণের মধ্যে ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ সহজ শর্তের এবং ৩৯ দশমিক ০৩ শতাংশ কঠিন বা বাণিজ্যিক শর্তের ঋণ। মন্ত্রী বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী বাংলাদেশ নিম্ন-আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণে দেশের বৈদেশিক ঋণের সহজ শর্তের সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসছে।

এছাড়া, ওই সময় থেকে সরকারের নেওয়া বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে সামনের বছরগুলোতে সরকারের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বা দায় আরও বাড়বে। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে বিএনপি সরকার বেশ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, নতুন বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঋণের প্রস্তাব ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাবগুলো নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে, যেন উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণ নিয়ে কোনো অপ্রয়োজনীয় বা কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা না হয়। মন্ত্রী বলেন, ‘শুধু আর্থিকভাবে লাভজনক প্রকল্পগুলোর জন্যই বৈদেশিক ঋণ বিবেচনা করা হচ্ছে।

৪ মোবাইল কোম্পানির কাছে সরকারের বকেয়া ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা : দেশের চারটি মোবাইল কোম্পানির কাছে সরকারের মোট রাজস্ব বকেয়া ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। গতকাল বুধবার সংসদ অধিবেশনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত জবাবে মন্ত্রী জানান, লাইসেন্স ফি, রেভিনিউ শেয়ারিং, তরঙ্গ ফি, জরিমানা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল বাবদ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিটকের কাছে বকেয়া ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী বলেন, ‘টেলিটকের বকেয়ার মধ্যে ৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা ইকুইটিতে (শেয়ারে) রূপান্তরের একটি আবেদন বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন।’ তিনি জানান, শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের কাছে মোট বকেয়া ৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা। মন্ত্রী আরও জানান, ইনফরমেশন সিস্টেম অডিট আপত্তি বাবদ গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির পাওনা ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকার মধ্যে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই কিস্তিতে মোট ২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। পরে ভ্যাট মামলায় এই মোবাইল ফোন অপারেটর আরও ৩৯২ কোটি ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করে। অর্থাৎ, বর্তমানে গ্রামীণফোনের কাছে নিট বকেয়া ৬ হাজার ১০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে হাইকোর্টে মামলা চলছে বলেও জানান মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।

একইভাবে ইনফরমেশন সিস্টেম অডিট আপত্তি বাবদ রবি আজিয়াটা লিমিটেডের কাছে বিটিআরসির পাওনা ৬৭৮ কোটি টাকার মধ্যে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা ৫ কিস্তিতে মোট ১৩৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে, যার মধ্যে ভ্যাট মামলার রায়ের ৫০ কোটি টাকাও অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমানে রবির কাছে বকেয়া পাওনা ৪৯০ কোটি টাকা। এই বিষয়টি নিয়েও হাইকোর্টে মামলা বিচারাধীন বলে মন্ত্রী জানান।

এছাড়া, পরিশোধিত রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর রবির কাছে আরও ১২৫ কোটি টাকার ভ্যাট বকেয়া আছে। এ নিয়ে কোম্পানির দায়ের করা মামলা চলমান।

বাংলালিংকের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, ইনফরমেশন সিস্টেম অডিট আপত্তি বাবদ বিটিআরসির পাওনা ৮১১ কোটি টাকার মধ্যে কোম্পানিটি ১৬৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এছাড়া ভ্যাট মামলার রায়ের ২১৫ কোটি টাকাসহ মোট ৩৮১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ, বর্তমানে বাংলালিংকের মোট বকেয়া ৪৩০ কোটি টাকা। এই বিষয়েও আদালতে মামলা চলছে। মন্ত্রী জানান, পরিশোধিত রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট বাবদ বাংলালিংকের আরও ১২৫ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বিটিআরসি বিষয়টি নিয়ে মামলা করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।