ভিনিসিয়ুসের আলোয় নকআউটে ব্রাজিল

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া ডেস্ক

গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের শেষ ম্যাচে সবার নজর যখন নেইমারের দিকে। তখন রঙ ছড়ালেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র! এবারের বিশ্বকাপে শুরু থেকেই আলো ছড়িয়ে আসছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা। মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দলের হয়ে একমাত্র গোল করেন তিনি, পরের ম্যাচে হাইতির বিপক্ষেও ভিনিসিয়ুস পান গোল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগিয়েও জোড়া গোলে মাঠ ছাড়েন চলতি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সেরা পারফর্মার। তার গোলে বিরতির আগেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় ব্রাজিল। উপায় খুঁজে না পাওয়া স্কটল্যান্ডের জালে দ্বিতীয়ার্ধে বল পাঠিয়ে ব্যবধান বাড়ালেন মাথেউস কুনিয়া। শেষদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার পালা ঘুচিয়ে হলুদ জার্সিতে বহুল আকাঙ্ক্ষিত প্রত্যাবর্তন ঘটল নেইমারের। সব মিলিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি স্বস্তি নিয়ে নকআউটের টিকিট নিশ্চিত করল কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। বাংলাদেশ সময় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মায়ামিতে বিশ্বকাপের ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলের সহজ জয় পেয়েছে ব্রাজিল। এতে তিন ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকে গ্রুপ পর্ব শেষ করল তারা। একই সময়ে শুরু হওয়া এই গ্রুপের আরেক ম্যাচে আটলান্টায় হাইতিকে ৪-২ গোলে হারিয়েছে মরক্কো। তারাও তিন ম্যাচে ৭ পয়েন্ট পেলেও গোল পার্থক্যে পিছিয়ে থাকায় হয়েছে গ্রুপ রানার্সআপ।

শুরু থেকেই ছন্দ দেখিয়ে প্রথমার্ধে ১১টি শট নিয়ে চারটি লক্ষ্যে রাখে ব্রাজিল। এর মধ্যে দুটি থেকে তারা গোল আদায় করে নেয়। ফলে বিরতির আগেই চালকের আসনে বসে পড়ে রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। সপ্তম মিনিটেই স্কটল্যান্ডের বাজে ভুলে গোল পেয়ে যায় সেলেসাওরা। সতীর্থকে খুঁজে নিতে অনেক সময় নিয়ে ফেলা ডিফেন্ডার স্কট ম্যাককেনাকে চাপে ফেলেন চোটগ্রস্ত রাফিনিয়ার বদলে একাদশে ঢোকা রায়ান। ম্যাককেনা তড়িঘড়ি করে বল বাড়াতে গেলে তা তরুণ উইঙ্গার রায়ানের পায়ে লেগে পৌঁছায় ডি-বক্সে বিপজ্জনক জায়গায় থাকা ভিনিসিয়ুসের কাছে। প্রথম স্পর্শে গোলরক্ষককে কাটিয়ে এরপর একদম ফাঁকা জালে বল পাঠান ভিনিসিয়ুস।

এগিয়ে গিয়ে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে ব্রাজিল। ২২তম মিনিটে আরেক ডিফেন্ডার জ্যাক হেনড্রির কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে ফের জাল কাঁপান ভিনিসিয়ুস। কিন্তু ভিএআরের সাহায্য নিয়ে ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করেন রেফারি। যদিও হেনড্রির পায়ে ভিনিসিয়ুসের আঘাত ফাউল হওয়ার মতো ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। ৪৫তম মিনিটে অল্পের জন্য ব্যবধান বাড়েনি। ভিনিসিয়ুসের পাসে কুনিয়ার শট জালের দিকেই যাচ্ছিল। কোনোমতে গোললাইন থেকে বল ফিরিয়ে দেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা। তবে যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে আর পারেনি স্কটিশরা। পাল্টা আক্রমণে উঠে ডানপ্রান্ত থেকে মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারায়েস করেন মাপা ক্রস। হেডে দূরের পোস্ট দিয়ে অ্যাঙ্গাস গানকে পরাস্ত করে ব্রাজিলের ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ফাঁকায় থাকা ভিনিসিয়ুস। এবারের আসরে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই লক্ষ্যভেদ করা এই তারকা ফরোয়ার্ডের গোল হলো চারটি। বিরতির পর গা ঝাড়া দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায় স্কটল্যান্ডের। ম্যাচের ৪৯তম মিনিটে প্রথমবারের মতো কোনো প্রচেষ্টা লক্ষ্যে রাখতে পারে তারা। তবে স্কট ম্যাকটমিনের হেড সহজেই লুফে নেন ব্রাজিলের গোলরক্ষক আলিসন।

দুই মিনিট পর হ্যাটট্রিকের সুযোগ আসে ভিনিসিয়ুসের সামনে। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেদ করে দ্রুতগতিতে বল নিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ঠিকমতো শট নিতে না পারায় গানকে পরীক্ষায় পড়তে হয়নি। ৬০তম মিনিটে জয় একরকম নিশ্চিত করে ফেলে সেলেসাওরা। কাসেমিরোর কাছ থেকে বল পেয়ে দারুণ দক্ষতায় স্কটল্যান্ডের দুই খেলোয়াড়কে ফাঁকি দিয়ে গিমারায়েস ডি-বক্সে খুঁজে নেন কুনিয়াকে। পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসা গোলরক্ষককে পরাস্ত করতে ভুল হয়নি ফরোয়ার্ড কুনিয়ার। পাঁচ মিনিট পর জোড়া সেভে ব্রাজিলের জাল অক্ষত রাখেন আলিসন। লুইস ফার্গুসনের ফ্রি-কিক ঠেকানোর পর কর্নার থেকে ম্যাকটমিনের আরেকটি হেড ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিরিয়ে দেন তিনি। ৭৬তম মিনিটে দর্শকদের তুমুল উল্লাসের মধ্য কুনিয়ার বদলি হিসেবে মাঠে নামেন নেইমার। ব্রাজিলের বর্ণাঢ্য ফুটবল ইতিহাসের এই সর্বোচ্চ গোলদাতা শেষবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে খেলেছিলেন ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর। এরপর নানা ধরনের ছোট-বড় চোটের কারণে পেরিয়ে গেছে লম্বা সময়।

চার মিনিট পর ভিনিসিয়ুসের হ্যাটট্রিক পূরণের আরেকটি প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেন গান। আর যোগ করা সময়ে ম্যাকটমিনেকে ফের আলিসন হতাশ করলে ব্যবধান কমাতে পারেনি স্কটল্যান্ড। ব্রাজিল ও মরক্কোর নকআউট নিশ্চিত হলেও অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে স্কটল্যান্ডকে। তিন ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়েছে তারা। যেহেতু ১২টি গ্রুপের প্রথম দুটি করে দলের পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় দলও নকআউটে জায়গা পাবে, তাই স্কটিশদের সম্ভাবনা টিকে রইল। তবে তিন ম্যাচেই হারায় বিদায় নিয়েছে হাইতি।

ম্যাচসেরা হয়ে এসে হেডে গোল করার পর ভিনিসিয়ুস মজার গল্প শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কার্লো আনচেলত্তিকে কথা দিয়েছিলাম যে আমি হেডে একটি গোল করব। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে এটা প্রায় অসম্ভব এবং যদি আমি এটা করতে পারি, তবে তিনি আমাকে একটি উপহার দেবেন। আমি এখন সেটার (উপহার) জন্যই অপেক্ষা করছি।’

গ্রুপের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলকে দেখা গেল আরও শাণিত, মিলল চেনা ছন্দের আভা। তবু কোচ কার্লো আনচেলত্তি মনে করেন, এখনও কিছু জায়গায় উন্নতি করতে হবে তাদের। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, বল দখলে নিয়ে আরেকটু গতি আনা দরকার ছিল তাদের। নকআউটে এসব জায়গায় দেখতে চান উন্নতি, ‘আমরা একটা দল হয়ে খেলতে পারছি, এটাই লক্ষ্য ছিল। তবে আমরা এখনও নিখুঁত নই, অল্প কিছু ব্যাপারে উন্নতি প্রয়োজন-বল দখলে থাকার সময় আমরা আরও গতিময় হতে পারি। দলের পারফরম্যান্সে আমি খুশি, কারণ প্রথম ম্যাচের পর থেকে দল উন্নতি করছে। আমরা এখন নকআউট পর্বে পৌঁছেছি, এখন একদম নিখুঁত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।’

ব্রাজিল যখনই বিশ্বকাপে খেলে, দলটির সমর্থকরা আশা করেন শিরোপা। তবে আনচেলত্তি এগোতে চান ধাপে ধাপে। এখনও তাই সেভাবেই চিন্তা করার কথা বললেন তিনি, ‘কত দূর যাব সেই লক্ষ্য এখনও ঠিক করিনি। শুধু ভালো খেলা নয়, জিততে চাই। একজন কোচকে যাচাই করা হয় জয় দিয়ে, ভালো বা মন্দ খেলা দিয়ে নয়।’