যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা আলোচনা এবার কাতারে
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর গত মঙ্গলবার দোহায় কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। কাতার এ তথ্য জানিয়েছে। তবে ইরান জানিয়েছে, তাদের একটি প্রতিনিধিদল দোহায় যাবে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি আলোচনা হওয়ার দাবি নাকচ করে দিয়েছে। দোহা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। কাতার জানায়, দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের মধ্যে কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বা সরাসরি আলোচনার পরিকল্পনা নেই।
কারা অংশ নিচ্ছেন, কবে হচ্ছে- ট্রাম্প সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন, ইরান পরদিন কাতারে নতুন করে আলোচনার অনুরোধ জানিয়েছে। তিনি লিখেন, ‘এটি আগামীকাল দোহায় অনুষ্ঠিত হবে।’ ট্রাম্পের ওই পোস্টের পর তার মুখপাত্র ফক্স নিউজকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এ সপ্তাহে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে দোহায় যাচ্ছেন। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি মঙ্গলবার নিশ্চিত করেন যে উইটকফ ও কুশনার দোহায় রয়েছেন। তবে তিনি বলেন, ‘তারা এখানে ইরানিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য আসেননি।’ তিনি জানান, তারা কাতারের মধ্যস্থতাকারী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনায় আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় থাকবে। এর মধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা ও লেবাননের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই জানান, দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে বুধবার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ইরানের প্রথম বৈঠক হবে।
আলোচনার মূল বিষয় : যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ। উভয়পক্ষের সমঝোতায় এ নৌপথ পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও আলোচনা বাকি। গত শনিবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের সময় একটি জাহাজে হামলার পর সপ্তাহের শেষে এ নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, সমঝোতা স্মারকের সব বিষয় নিয়েই আলোচনা চলবে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ‘ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা’ নিয়েও সম্প্রতি ওমানের সঙ্গে আলোচনা করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে জব্দ হয়ে থাকা ইরানের অর্থও আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার বলেন, এ অর্থ ছাড়ের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে। তিনি জানান, মোট ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের মধ্যে ৬০০ কোটি ডলার দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। বাকায়ি গত মঙ্গলবার বলেন, কাতারের পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ ছাড়ের বিষয়টিও থাকবে।
সংঘাত কিছুটা কমেছে : যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্বাক্ষরের পরও উপসাগরীয় অঞ্চলে দুই পক্ষের মধ্যে বিক্ষিপ্ত হামলা-পাল্টা হামলা হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের দাবি কার্যকর করতে গিয়ে ইরানের পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে কয়েক দফা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
সবশেষ রোববার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে ইরানের ধারাবাহিক আগ্রাসনের জবাবে তারা ইরানের ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইরান জানায়, এর জবাবে তারা কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইন উভয় দেশই তেহরানের এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে।
গরিবাবাদি মঙ্গলবার টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এ ধরনের বড় যুদ্ধের অবসান হতে হলে, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ, বিভিন্ন ঘটনা ও মতপার্থক্য থাকবেই। বিশেষ করে ইসরায়েলি শাসনের মতো পক্ষ জড়িত থাকলে।’ তিনি বলেন, ইরানের প্রতিনিধিদল লেবানন ও হরমুজ প্রণালী-সংক্রান্ত ধারাগুলোর বাস্তবায়নের বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দেবে।
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র এ চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শত্রুপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরও তাদের অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে।’ তবে কাতারের আলোচনা শুরুর আগে কয়েক দিনে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে। লেবাননেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে।
তেহরান বরাবরই বলে আসছে, যেকোনো সমঝোতার অংশ হিসেবে সমান্তরাল এ সংঘাতের অবসান এবং দক্ষিণ লেবাননের দখল করা এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে হবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কায় বিশ্ব বাজারে বাড়ল তেলের দাম : মধ্যপ্রাচ্যে তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে- এমন আশঙ্কায় গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আলোচনা প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত লেনদেনে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৩ সেন্ট বা ০ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ২৮ ডলারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩৪ সেন্ট বা ০ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে হয় ব্যারেলপ্রতি ৬৯ দশমিক ৮৪ ডলার। খবর দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের।
তেলবাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভান্ডা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হারি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল বা পূর্বানুমানযোগ্য নয়। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন কোনো সমঝোতা না হলে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণেই থাকবে এবং তেলের দামে বড় ধরনের পতন আপাতত নাও দেখা যেতে পারে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় পৌঁছান। হোয়াইট হাউস একে ‘উচ্চপর্যায়ের’ আলোচনা বলে উল্লেখ করলেও ইরান ও কাতার জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধিদল সরাসরি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নয়, বরং মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানিও এসব আলোচনায় অংশ নেন।
এদিকে বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪৫ ডলার কমেছে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক পতন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম প্রায় ৩১ ডলার কমেছে, যা ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের পর সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক পতন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রশমনের অগ্রগতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ বিঘেœর আশঙ্কা কমেছে। ফলে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো ২০২৬ সালের তেলের মূল্য পূর্বাভাস কমিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্সের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ইরানকে কোনো ধরনের টোল আদায় করতে দেওয়া হবে না। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে প্রণালিটি দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে গত সপ্তাহেও অপরিশোধিত তেলের মজুত কমেছে। বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ জুন শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ৬১ লাখ ব্যারেল কমেছে। একই সময়ে পেট্রোলের মজুতও হ্রাস পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বুধবার সরকারি মজুতের সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করবে।
সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে গুঁড়িয়ে দিলেন ট্রাম্পের প্রথম দিনের স্বপ্ন : যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট দেশটিতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার বহাল রেখেছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় সব মানুষই দেশটির নাগরিকত্ব পাবেন। আদালতের এ রায়ের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী প্রধান একটি এজেন্ডা বড় ধাক্কা খেল।
এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প একে ‘আমাদের দেশের জন্য খুবই খারাপ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে বিষয়টি জিইয়ে রাখতে এখন নতুন পথের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন কংগ্রেসের এখন এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কোনো দীর্ঘ ও জটিল সংবিধান সংশোধনীর প্রয়োজন নেই! আমাদের দেশের জন্য ব্যয়বহুল এবং অন্যায্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রথা বন্ধ করতে কংগ্রেসের আজই কাজ শুরু করা উচিত।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে তাদের প্রতি আমার পূর্ণ ও সামগ্রিক সমর্থন থাকবে!’
ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনই একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার বাতিল করা। আদেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যা করার এখতিয়ার নির্বাহী আদেশের নেই। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছিল, এ নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মূলত সংবিধানেরই সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার বহাল রেখে এটাই নিশ্চিত করেছেন, মার্কিন ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া প্রায় সব মানুষই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এর মাধ্যমে ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতির মূল ভিত্তিই খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনই যে নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন সেটির উদ্দেশ্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে নথিপত্রহীন বা অবৈধ অভিবাসী এবং সাময়িকভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের সন্তানদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।তবে আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের পক্ষে রায় লিখতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, এ নির্বাহী আদেশটি মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর পরিপন্থি।
রবার্টস লিখেছেন, ‘তখন এবং এখন- সব সময়ই নাগরিকত্ব হলো- অধিকার পাওয়ার অধিকার, যার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক কমিউনিটিতে স্বাধীনভাবে অংশ নেওয়া যায়। চতুর্দশ সংশোধনীর প্রণেতারা এই ভূখণ্ডে প্রত্যেক জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তির জন্য সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আজ আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।’
রায়ে প্রধান বিচারপতি রবার্টসের সঙ্গে যোগ দেন উদারপন্থি বিচারক সোনিয়া সোতোমেওর, এলেনা কাগান ও কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন এবং রক্ষণশীল বিচারক অ্যামি কোনি ব্যারেট। আরেক রক্ষণশীল বিচারক ব্রেট কাভানো রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও আংশিক ভিন্নমত দিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেখান যে নির্বাহী আদেশটি ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছে, তবে সংবিধান লঙ্ঘন করেনি।
অন্যদিকে রক্ষণশীল বিচারক ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো ও নিল গোরসাচ এ রায়ের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দেন। আদালতের এ পূর্ণাঙ্গ রায়টি ১৯৪ পৃষ্ঠাজুড়ে বিস্তৃত, যার মধ্যে প্রায় ৯০ পৃষ্ঠাই লিখেছেন ভিন্নমত পোষণকারী বিচারক থমাস।
সিভিল রাইটস গ্রুপ ও ডেমোক্র্যাটরা আদালতের এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা এটিকে আধুনিক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। পাশাপাশি, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা করেছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন এ রায়কে এক ‘মহাবিজয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সংগঠনটির জাতীয় আইনি পরিচালক সিসিলিয়া ওয়াং সুপ্রিম কোর্টে এই মামলায় লড়েন।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত, এমন শিশুদের অভিভাবকদের পক্ষে একটি যৌথ মামলার অংশ হিসেবে সিসিলিয়া ওয়াং আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেন। রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আদালতের এ সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের একটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি পুনর্নিশ্চিত করেছে। সেটি হলো, আপনি যদি এখানে জন্মগ্রহণ করেন, তবে আপনি নাগরিক। একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারেন না। আমাদের সাহসী মক্কেল ও আইনি দল দেশের সেই লাখ লাখ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যারা আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা অটুট রয়েছে।’
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার এ নীতিটি বাতিল করার চেষ্টা করে আসছেন। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কেনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য অযোগ্য ছিলেন বলে একটি বর্ণবাদী মিথ্যা প্রচার করেন। এ ছাড়া ট্রাম্প কমলা হ্যারিসের জন্মের সময় তার মা-বাবার অভিবাসন মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়া ও পরে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতার বিষয়েও ভিত্তিহীন প্রশ্ন তুলেছিলেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সামগ্রিক অভিবাসন পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল, কারা মার্কিন নাগরিকত্ব দাবি করতে পারবেন, সে বিষয়ে আমূল পরিবর্তন করা। এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে আদালত যখন এ মামলার শুনানি করছিলেন, তখন ব্যক্তিগতভাবে মৌখিক যুক্তিতর্কের সময় উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্প। একজন দায়িত্বরত প্রেসিডেন্টের এভাবে শুনানিতে উপস্থিত থাকার ঘটনা এটিই প্রথম।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর একটি বিশেষ বাক্যাংশের অর্থ হলো- যারা বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে নেই, তাদের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুরা মার্কিন নাগরিক নয়। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছিল, যদি কোনো শিশুর মা-বাবার কেউই মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা (গ্রিন কার্ডধারী) না হন অথবা তাদের শুধু সাময়িক বা অস্থায়ী ভিসা থাকে, তবে সেই শিশু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাবে না। ট্রাম্প প্রশাসন ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে এ নিয়ম চালু করতে চেয়েছিল। এটি কার্যকর হলে প্রতিবছর লাখ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
প্রেসিডেন্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো নিয়ে আদালত ১ বছরের বেশি সময় ধরে বিচার-বিবেচনা করেন। এ দীর্ঘ সময়ে স্থায়ী আইনি মর্যাদা না থাকা মা-বাবার ঘরে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া হাজারও শিশুর ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল।
এ রায় নিয়ে মার্কিন পার্লামেন্টে বড় বিভেদ দেখা দিয়েছে। নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি সভার ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিজ মন্তব্য করেন, সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার চাটুকার ও অভিবাসীবিদ্বেষী সহযোগীদের অসাংবিধানিক আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছে।’
জেফ্রিজ আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রাক্কালে, উগ্রপন্থি মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) রক্ষণশীলরা যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের মতো করে বদলে ফেলার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল আদর্শের জয় হয়েছে।’
অন্যদিকে বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা রায়ে হতাশা প্রকাশ করেন। প্রতিনিধি সভার রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমি মনে করি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ নিয়মের চরম অপব্যবহার হয়েছে। আপনি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রেখে একটি সন্তানের জন্ম দেবেন, আর তারপরই সে এ দেশের সমাজকল্যাণমূলক সুযোগ-সুবিধাসহ অন্য সবকিছু ভোগ করতে পারবে- এটা ঠিক নয়।’ গত মঙ্গলবার দেওয়া রায়ে বিচারকরা নাগরিকত্ব বলতে আসলে কী বোঝায়, তা পরিষ্কার করতে ইতিহাসের উদাহরণ টেনেছেন। তারা দেখিয়েছেন কীভাবে ইংল্যান্ডের পুরোনো আইন থেকে শুরু করে দাসপ্রথার অবসান এবং পরে চীনাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার চেষ্টার মতো ঘটনাগুলো ঘটেছিল।
প্রধান বিচারপতি রবার্টস লিখেছেন, ১৮৫৭ সালের ‘ড্রেড স্কট’ মামলার রায়টি ছিল অত্যন্ত ঘৃণ্য। কারণ, সেই রায়ে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে বলা হয়েছিল, নাগরিকত্ব ঠিক হবে রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে, দেশের মাটির ভিত্তিতে নয় (অর্থাৎ মা-বাবা যে দেশের নাগরিক, সন্তান শুধু সে দেশেরই নাগরিক হবে, জন্ম যেখানেই হোক না কেন)। পরে সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী এনে ওই ভুল নিয়মটি বদলে দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া ও ‘যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া সবার’ নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকেরা রায়ে পরিষ্কার করে বলেছেন, ‘কোনো মা-বাবা যদি অবৈধভাবে বা সাময়িক সময়ের জন্য (যেমন ট্যুরিস্ট বা স্টুডেন্ট ভিসায়) যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, আর সেই সময়ে তাদের কোনো সন্তান এ দেশে জন্ম নেয়, তবে সেই শিশুও জন্মসূত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নাগরিক হবে।’
এ রায়ের সঙ্গে একমত হয়ে বিচারপতি জ্যাকসন বলেছেন, সংবিধানের এ ধারার মূল লক্ষ্যই হলো, রক্তের সম্পর্ককে নাগরিকত্বের মাপকাঠি করার যেকোনো অপচেষ্টাকে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া।
বিচারপতি জ্যাকসন তাঁর মন্তব্যে লিখেছেন, ‘গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে যে নতুন যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তা কোনোভাবেই এমন বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারে না। সৌভাগ্যবশত, আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকেরা আজ এই কথাটি মনে রেখেছেন। তাঁরা আমাদের দেশ গড়ার সবচেয়ে মূল আদর্শটিকে আবারও দায়িত্বের সঙ্গে রক্ষা করেছেন—তা হলো, সব মানুষ সমান অধিকার নিয়ে জন্মায়।’
তবে এর তীব্র বিরোধিতা করে বিচারপতি থমাস তার দীর্ঘ দ্বিমত পোষণকারী নোটে লিখেছেন, কৃষ্ণাঙ্গরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। কারণ, তারা মার্কিন এবং তাদের ‘অন্য কোনো মাতৃভূমি’ বা দেশের প্রতি আনুগত্য ছিল না। কিন্তু তার মতে, ‘বিদেশি সাময়িক দর্শনার্থীদের (যেমন ট্যুরিস্ট বা সাময়িক বাসিন্দা) সন্তানদের ক্ষেত্রে এ কথা সত্য নয়।’
ট্রাম্প যা করতে পারেন : এদিকে সংবিধানের কোনো সংশোধনী বাতিল বা পরিবর্তন করতে হলে মার্কিন পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয় অথবা দুই-তৃতীয়াংশ অঙ্গরাজ্যের আইনসভার পক্ষ থেকে একটি সম্মেলন ডাকার অনুরোধ করতে হয়। সাধারণ কোনো নতুন আইন পাস করার চেয়ে এটি করা অনেক বেশি কঠিন। তবে গত মঙ্গলবার সকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ মাধ্যমে একটি নিবন্ধ শেয়ার করেন। সেখানে সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়মটি বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের আইনি যুক্তি ও বিতর্কিত সমর্থক : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু রক্ষণশীল নেতাদের মধ্যে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের এই নিয়ম বাতিল করার চেষ্টা বেড়েছে। যদিও বেশির ভাগ আইনি বিশেষজ্ঞ এখনও মনে করেন যে সংবিধানের এ ধারাটির বর্তমান ব্যাখ্যাই সঠিক।
ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন এ মামলার ক্ষেত্রে আংশিকভাবে উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদীদের ১৮ শতকের শেষের দিকের কিছু আইনি যুক্তির ওপর নির্ভর করেছিল। পলিটিকো পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবী জন ইস্টম্যান (যিনি ২০২০ সালের নির্বাচনি ফলাফল পাল্টানোর চেষ্টার কারণে ক্যালিফোর্নিয়ায় ওকালতি করার লাইসেন্স হারিয়েছেন) জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের এ চেষ্টার অন্যতম প্রধান সমর্থক।
‘স্থায়ী বাসস্থান’ নিয়ে বিতর্ক : সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে ‘স্থায়ী বাসস্থান’ শব্দটি কোথাও লেখা নেই। তবু ট্রাম্প প্রশাসন তাদের যুক্তিতে এই শব্দটির ওপর খুব বেশি জোর দিয়েছিল। এর আগে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে ১৮৯৮ সালের ঐতিহাসিক ‘যুক্তরাষ্ট্র বনাম অং কিম আরক’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন যে চীনা বংশোদ্ভূত যেসব মা-বাবার যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বাসস্থান ছিল, তাদের সন্তানরা জন্মসূত্রেই নাগরিক হবে। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, এ নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ‘স্থায়ী বাসস্থান’ থাকাটা একটি বাধ্যতামূলক শর্ত।
আদালতের সন্দেহ ও ট্রাম্পের যুক্তি প্রত্যাখ্যান : মামলার শুনানির সময় বিচারকরা সরকারের এ যুক্তির তীব্র সমালোচনা এবং এটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। রক্ষণশীল প্রধান বিচারপতি রবার্টস একপর্যায়ে সরকারের এ যুক্তিকে ‘খুবই অদ্ভুত’ বলে উল্লেখ করেন।
উদারপন্থী বিচারপতি কেগান বলেন, সরকার নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য খুবই ‘অস্পষ্ট ও অজানা কিছু উৎস’ ব্যবহার করছে। চূড়ান্ত রায়ে প্রধান বিচারপতি রবার্টস স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘আদালত নাগরিকত্ব ধারার প্রতিটি শব্দ এবং এর ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখেছেন। সংবিধান প্রণেতারা নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থায়ী বাসস্থানের কোনো শর্ত বা সীমাবদ্ধতা রাখতে চেয়েছিলেন- এমন কোনো প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি।’
সরকার যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে থাকা এবং দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা নাগরিকত্বের অন্যতম শর্ত। কিন্তু প্রধান বিচারপতি সরকারের এ দাবি নাকচ করে লিখেছেন, ‘ইতিহাসের পাতা উল্টে এ নিয়ম পুরোপুরি বদলে ফেলার যে চেষ্টা সরকার করছে, তার পক্ষে আসলে কোনো প্রমাণই নেই।’
