হোলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণ

বাংলাদেশে যেন আবার সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া না দেয়

প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলাকারীরা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা-বিভাজন ছড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই অপচেষ্টায় বরং সংহতির বোধ, মানুষের মধ্যে সংলাপের মূল্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে যৌথ অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ যাতে আবার মাথাচাড়া না দেয়, সে ব্যাপারে সবাইকে সব সময় সজাগ থাকতে হবে। হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানে ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অতিথিরা এ কথা বলেন। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা হয়েছিল। গতকাল বুধবার সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো। এক দশক আগের ভয়াবহ সেই হামলায় সাহসী যে মানুষগুলো প্রাণ দিয়েছিলেন, তাদের মনে রাখার আহ্বান জানান অনুষ্ঠানের অতিথিরা।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে স্মরণ অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে অনুষ্ঠানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানস্থলে একটি নামফলকের সামনে ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকেরা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে ফারাজ আইয়াজ হোসেনের বড় ভাই যারেফ আয়াত হোসেন এবং বাংলাদেশ পুলিশ ও ঢাকায় অবস্থানকারী প্রবাসী ইতালীয়দের পক্ষ থেকেও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুধু তাদের (নিহত ব্যক্তিদের) স্মৃতির প্রতি নয়, তাদের পরিবারগুলোর সাহস, সহনশীলতা ও ঐক্যের প্রতিও শ্রদ্ধা জানাই। একজন মা ও অভিভাবক হিসেবে সন্তান ও পরিবারের সদস্য হারানো পরিবারগুলোর প্রতি আমার হৃদয়ের গভীর সহমর্মিতা রইল। তাদের স্মৃতি যেন ঘৃণা ও সংঘাতের বিরুদ্ধে আমাদের পথ দেখায়। মানবতা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতার মূল্যবোধ আমরা যেন সব সময় ধরে রাখি।’ সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে সরকার অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের শক্তির বাংলাদেশে কোনো স্থান নেই। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার সুযোগ তাদের দেওয়া হবে না।’ এক দশক আগের এই জঙ্গি হামলায় নির্মমভাবে নিহত ইতালি ও জাপানের নাগরিকদের প্রসঙ্গ টানেন ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো। তিনি বলেন, নিহত ব্যক্তিরা এসেছিলেন বিভিন্ন পটভূমি থেকে। তাদের অধিকাংশই তরুণ, মেধাবী ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখা মানুষ ছিলেন। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে বাংলাদেশের উন্নত সমাজ গঠনে তরুণদের ভূমিকার কথাও স্মরণ করা। হামলার সময় সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতিও তার শ্রদ্ধা। তারা মনে করিয়ে দেন, অন্যের নিরাপত্তা ও দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে দায়িত্ববোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ইতালির রাষ্ট্রদূত তার বক্তৃতায় হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ১০ বছরপূর্তিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লাকে উদ্ধৃত করেন।

সার্জিও মাত্তারেল্লা বলেন, সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা ও বিভাজন ছড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু এর পরিবর্তে আরও শক্তিশালী হয়েছে সংহতির বোধ, মানুষের মধ্যে সংলাপের মূল্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে যৌথ অঙ্গীকার। সভ্যতার মূলনীতি রক্ষার জন্য সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন, যাতে নিরাপদ, উন্মুক্ত ও পারস্পরিক সংহতিতে গড়ে ওঠা সমাজ নির্মাণ করা যায়। এই আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন- নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মা ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, নিহত ইতালি ও জাপানের নাগরিকদের পরিবারের সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত উপরাষ্ট্রদূত আলবার্ট সিয়া, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ রামাদান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা।