খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির চির বিদায়ের প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইসলামি বিপ্লবের এই নেতার জন্য ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে তেহরান। সেখানে ইরানি জনগণের বিপুল সমাবেশ ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি চ্যালেঞ্জের বার্তা দিচ্ছে তেহরান। দুটি দেশের পাঁচটি শহরজুড়ে ছয় দিনব্যাপী বিশাল এই শোকানুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, এসব কর্মসূচিতে সব মিলিয়ে এক থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবফ জনগণকে ব্যাপকভাবে জানাজায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই উপস্থিতিই হবে দেশের প্রতিশোধের বার্তা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ। সিএনএন লিখেছে, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দুটি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধ এবং কয়েক দশকের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও তেহরান খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে কোনো কমতি রাখছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের সমান্তরালে বিশাল এ শোকের আয়োজন করে বিশ্বমঞ্চ ও শত্রুদের, বিশেষ করে ডনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের অজেয় থাকার একটি কড়া বার্তা দিতে চাইছে তারা।

এই বিশাল আয়োজন শুধু শোক প্রকাশের জন্য নয়; বরং সাম্প্রতিক যুদ্ধ, নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, খামেনির কফিন তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠান ঘিরে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা, সড়ক নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশসীমায় বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ কর্মসূচির মূল আনুষ্ঠানিকতা শনিবার শুরু হলেও তেহরানের রাস্তায় রাস্তায় এরই মধ্যে সাধারণ মানুষকে শোক প্রকাশ করতে যাচ্ছে। কোমের মসজিদের খতিব আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাইদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শহীদ নেতা এবং অন্য শহীদদের জানাজায় জনগণের এই বিশাল উপস্থিতি কার্যত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষে আরেকটি গণভোট হিসেবে গণ্য হবে।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। জবাবে ইসরায়েল এবং প্রতিবেশী অন্যান্য দেশে মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এরপর সেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে পুরো পশ্চিম এশিয়ায়, জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে পুরো বিশ্বে তার প্রভাব পড়ে। খামেনির ছেলে মুজতাবাকে খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। তবে বাবার সঙ্গে একই হামলায় গুরুতর আহত হওয়া মুজতাবাকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নতুন কোনো ছবিতে দেখা যায়নি।

বাবার শেষ বিদায়ে থাকবেন না মুজতাবা খামেনি

নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না। এ খবর জানিয়েছেন ভারতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ হাকিম এলাহি। ‘ইন্ডিয়া টুডে’ সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, মুজতাবা খামেনি ব্যক্তিগতভাবে বাবার জানাজায় যাওয়া এবং শোকার্ত মানুষের মাঝে সামিল হতে চাইলেও তার নিরাপত্তার দিক বিবেচনা সে সম্ভাবনা খুবই কম। এলাহি আরও জানান, মুজতাবা খামেনির ঘনিষ্ঠজনরা এই আভাস দিয়েছেন যে তিনি বাইরে বেরোতে চান এবং সমর্থকদের সঙ্গেও দেখা করতে চান। কিন্তু নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাকে সেটি না করারই পরামর্শ দিয়েছে।

তিনি বলেন, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের এই সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা এখনও অনেক বেশি। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বলছে, সময় খুবই বিপজ্জনক। মুজতাবাকে তারা নিরাপত্তা দিতে পারবে না। ‘আমার মনে হয় তিনি (মুজতাবা) বাইরে আসবেন না। হুমকির পরিবেশ বিরাজ করার কারণেই মূলত এই সিদ্ধান্ত’, বলেন এলাহি।

এদিকে, শিয়া মুসলমানদের দ্বাদশ ইমামের (যিনি নবম শতাব্দীতে নিখোঁজ হয়েছিলেন) প্রতিনিধি খামেনির এই মৃত্যুকে শিয়া শাহাদাত ও শোকের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন তার সমর্থকরা। সিএনএন লিখেছে, শুক্রবার রাশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তা ও বিদেশি প্রতিনিধিরা এই শোক প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তেহরানে পৌঁছাবেন।

আজ ও আগামীকাল রোববার ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় বিদায় অনুষ্ঠান হবে, এর মধ্যে প্রথম দিন জানাজার কর্মসূচি রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। আগামী সোমবার তেহরানে হবে প্রধান শোকযাত্রা। এ সময় খামেনির কফিনের পাশাপাশি একই হামলায় নিহত তার মেয়ে, জামাতা ও পুত্রবধূ (বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী) ও নাতনির মরদেহ বহন করা হবে। শোকযাত্রার পর প্রয়াত নেতার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরানের শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রধান কেন্দ্র ও ধর্মীয় শিক্ষানগরী কোমে, যেখানে মঙ্গলবার জানাজা ও শোক অনুষ্ঠান হবে। এরপর আগামী বুধবার খামেনির কফিন নেওয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকে। সেখানকার নাজাফ ও কারবালা শহরে শোকযাত্রা ও জানাজা হবে। ইরানের সমমনা ও মিত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন সেখানে।

এরপর আগামী বৃহস্পতিবার ইরানের মাশহাদ শহরে আরেকটি শোভাযাত্রার পর হযরত ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে। এসব আয়োজনে যত বেশি সম্ভব মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হোটেলগুলোতে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। স্কুল, মসজিদ ও স্পোর্টস হলগুলোকে শোকগ্রস্ত মানুষদের আবাসন হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে তেহরানসহ অন্যান্য শহরের আকাশসীমায় সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন কোনও হামলা চালালে কঠোর জবাবের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

তেহরানে খামেনির পোস্টারের নিচে দাঁড়িয়ে ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের ৬৩ বছর বয়সী প্রবীণ যোদ্ধা হোসেন খেইরি বলেন, ‘আমরা আমাদের নিজস্ব উপায়ে আমেরিকা ও অন্যদের কাছে আমাদের শক্তি প্রদর্শন করছি।’ আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ বলেন, আমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে এবং বিশ্ববাসীর কাছে এই রক্তের দাবি তুলতে হবে, যেন বিশ্ব জানতে পারে যে ইরানের সম্মানিত ও মহৎ জাতি নিপীড়নের মুখে নীরব থাকে না। ‘এটি একটি মহাকাব্যিক কীর্তি যা বিশ্বের কাছে একটি জাতির আত্মার মহানুভবতা প্রদর্শন করবে।’

বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল আসছে : খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে আসা প্রথম বিদেশি অতিথিদের মধ্যে আছেন ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ইসলামি আলেম এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। ইরানে স্বীকৃত বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আজ বলেছেন, খামেনির দাফনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতায় প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদল, বিভিন্ন খ্যাতিমান ব্যক্তি ও নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

ইসমাইল বাঘাই বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসছে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ অন্তত ৮ জন সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেবেন। এ ছাড়া আরও অনেক দেশ তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী অথবা বিশেষ দূতের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল পাঠাবে। বাঘাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

বাঘাই আরও বলেন, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পার্লামেন্টের সদস্যরা শেষবিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। তবে ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানানো ইউরোপের দেশগুলোকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সরকারিভাবে শেষশ্রদ্ধা নিবেদনের এই আয়োজনের আগে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি ব্যক্তিগত বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কর্মীদের স্বজনেরা সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রয়াত নেতাকে শেষবিদায় জানান।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সব শ্রেণি-পেশা ও মতের ইরানিদের শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘বীরত্বপূর্ণ ইরান যখন ইসলাম ও বিপ্লবের একনিষ্ঠ সেবককে শেষবিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমি জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক মত, আদর্শ বা ধর্মনির্বিশেষে দেশের সব মানুষকে স্বতঃস্ফূর্ত, মর্যাদাপূর্ণ এবং ইতিহাসে স্মরণীয় সংখ্যায় এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার উচ্চ আদর্শের প্রতি আনুগত্যের এক স্থায়ী চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হবে।’ ইরানের কর্মকর্তাদের ধারণা, দাফন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কয়েক দিনের এ আনুষ্ঠানিকতায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন।

খামেনি হত্যার নিন্দা স্পিকার হাফিজের : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তেহরান পৌঁছেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। গতকাল শুক্রবার তিনি ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দুই স্পিকারের বৈঠকের ছবি প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ আজ তেহরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ইসলামী পরামর্শ পরিষদের (ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলি) স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

এতে আরও বলা হয়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মরহুম আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ উপলক্ষে ইরান সফররত বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান স্পিকার গালিবাফ। মাননীয় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি জাতীয় শোকের এ সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে ইরান সরকার এবং ভ্রাতৃপ্রতিম ইরানের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। স্পিকার আরও উল্লেখ করেন, ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যে শতাব্দীপ্রাচীন বন্ধুত্ব, গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের নিবিড় যোগাযোগের ঐতিহ্য বিদ্যমান। তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক শান্তি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সম্পাদনে স্পিকার গালিবাফের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সমঝোতা ইরানের জনগণ এবং বৃহত্তর অঞ্চলের জন্য দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথ সুগম করবে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশে সফরের জন্য স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।

এর আগে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে তেহরানে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছালে বিমানবন্দরে তাকে এবং বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান ইরানের ইসলামী পরামর্শ পরিষদের ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজি বাবায়েই।

খামেনির শেষ বিদায়ে আসেননি সৌদির কেউ : ইরানের সাবেক সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের প্রতিনিধিদের পাঠিয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি দেশের প্রেসিডেন্টও অংশ নিচ্ছেন। তবে সৌদির কেউ ইরানে যাননি। সংবাদমাধ্যম হাউজ অব সৌদ জানিয়েছে, ১৪ মাস আগে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে নিহত হওয়ার পর সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু খামেনির মৃত্যুর পর দেশটি থেকে কেউ আসছেন না। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সৌদি তাদের কোনো প্রতিনিধিকে চূড়ান্ত করেনি। এছাড়া গালফ অঞ্চলের দেশগুলোও খামেনির শেষ বিদায়ে নিজেদের প্রতিনিধিদের পাঠায়নি। যারমধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন। গালফ অঞ্চলের দেশগুলো এখন পর্যন্ত তার মৃত্যুতে আনুষ্ঠানিক শোক জানায়নি। এরমাধ্যমে তারা মূলত মোজতবা খামেনিকে নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে অস্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকছে।

খামেনির দাফন প্রক্রিয়া কেন বিলম্বিত : খামেনির মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর তার দাফন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইসলামী সংস্কৃতি অনুযায়ী এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। এই বিলম্ব তার মৃত্যুর পর ইরানের সম্মুখীন হওয়া অসাধারণ পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, খামেনির মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে ইরানের কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের তীব্র ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণেই দাফন বিলম্বিত হয়েছে।

খামেনির লাশ ধর্মীয় বিধান মেনেই সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সন্ত্রাসবাদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডক্টর মোহাম্মদ ওমর ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, খামেনির লাশ প্রায় নিশ্চিতভাবেই হিমায়িত শীতল সংরক্ষণাগারে রাখা হয়েছিল। এতে কোনো ধরনের এমবামিং করা হয়নি, কারণ ইসলাম ধর্মে রাসায়নিক এমবামিং নিষিদ্ধ।

তিনি আরও বলেন, শিয়া আইন ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে দাফনে বিলম্ব এবং শীতলীকরণের মাধ্যমে মরদেহ সংরক্ষণের অনুমতি দেয়।

ইরানের ফরেনসিক মর্গে এমনিতেই লাশ কয়েক মাস পর্যন্ত রাখা হয়। তাই চার মাস সংরক্ষণ করে রাখাটা অস্বাভাবিক নয়।

গণরায়ের প্রতীক : খামেনির মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত এই দাফন প্রক্রিয়ার একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। ইরানের শাসকগোষ্ঠী এটিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থন ও প্রকাশ্য আনুগত্যের প্রদর্শন হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে তারা এটিকে দেশটির বিপ্লবী চেতনা এখনও অটুট থাকার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছে। কোম শহরের জুমার নামাজের ইমাম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাইদি বলেন, শহীদ নেতা ও অন্যান্য শহীদদের জানাজায় বিপুল জনসমাগম ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের আরেকটি গণরায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

আয়াতুল্লাহ খামেনি শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রভাবশালী শিয়া ধর্মগুরুও। ইরাক, পাকিস্তান, লেবাননসহ বিভিন্ন দেশের বহু শিয়া মুসলমান তাকে অনুসরণ করতেন। এসব দেশের শিয়া সমাবেশে প্রায়ই তার প্রতিকৃতি দেখা যেত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ খামেনির জানাজা নিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের উপস্থিতির মাধ্যমে ইরানের ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় রচিত হবে। এর মাধ্যমে জাতির প্রতিশোধের স্পৃহা সমগ্র বিশ্বের কাছে প্রতিধ্বনিত হবে।’