গণ-অভ্যুত্থানে শহিদদের স্মরণে প্রধানমন্ত্রী

জুলাইয়ের অর্জন একক কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, সবার

প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত জুলাই শহিদের স্বজনরা

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জন একক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়, এই অর্জন দেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদদের স্মরণে গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত জুলাই জাতীয় সম্মেলনে তিনি এ এ মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সকল সময় বলে থাকি, ৫ অগাস্ট যে অর্জন আমরা করেছি, এই অর্জন কোনো একক ব্যক্তি, কোনো একক রাজনৈতিক দলের অর্জন নয়; বরং এই অর্জন দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামী শান্তিপ্রিয় মানুষের এটি অর্জন।

তিনি বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে হতাহত সবাইকে রাষ্ট্র অবশ্যই মূল্যায়ন করবে। স্বৈরাচারের যথার্থ বিচার করা হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কোনো বিভক্তি নয়, সবাইকে ঐকবদ্ধ থেকে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’ শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।’ তারেক রহমান আরও বলেন, ‘শহিদদের সর্বোচ্চ সম্মান ও স্বীকৃতি, আহতদের জীবনমান নিশ্চিত করতে এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান চলাকালে আমি বারবার ভাবছিলাম এই মূহুর্তে যদি আমি আমার মা’কে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, আপনার ওপর যে অবিচার ও অন্যায় হয়েছে আপনি কি চান আমি এসবের প্রতিশোধ নেই? আমার বিশ্বাস মা বলতেন, এই মূহূর্তে তোমার কাজ সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি জানি আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও আমাকে একই উত্তর দিতেন।’

জুলাই শহিদদের বিচার এদেশের মাটিতেই হবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘তবে বিচারের নামে কারো প্রতি যেনো অবিচার না হয়। এ বিষয়ে অবশ্যই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। একটু বিলম্ব হোক তবুও অন্যায়কারীর যেনো সঠিক বিচার হয়। আমরা সেই চেষ্টাই করবো।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়া যায় না উল্লেখ করে উপস্থিত জুলাই পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেই মানুষই ত্যাগ করতে পারে যার সাহস আছে। আপনারা আপনজনকে হারিয়েছেন, কেউ কেউ অঙ্গ হারিয়েছেন। যে অঙ্গ হারিয়েছেন তা ঠিক হয়ে যাবে? না, ঠিক হয়ে যাবে না। তবে সবাই মিলে আমরা যদি দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, তবে একদিন গর্ব করে বলতে পারবেন আপনার আপন জনের ত্যাগের বিনিময়ে দেশের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে। তাই আসুন দেশ, মাটি এবং মানুষের কল্যাণে সবাই ঐক্যবদ্ধ হই।’ তিনি আরো বলেন, ‘স্বৈরাচারের সময় থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট জুলাই আন্দোলনে অনেকেই, বহু, হাজারো লক্ষ মানুষ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সেই নির্যাতনের যে কষ্ট আপনাদের এখনো ভোগ করে বেড়াতে হচ্ছে। সেরকম শারীরিক কষ্ট, মানসিক কষ্ট প্রত্যেকটি কষ্ট আমাকেও ভোগ করতে, বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ কারণে আপনাদের সেই কষ্ট- সেটি মানসিক হোক, সেটি শারীরিক হোক, আমি কিছুটা হলেও অনুভব করতে সক্ষম।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, শহিদ হয়েছেন তার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন। তাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট যে অর্জন আমরা করেছি, তা একক কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। দেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের অর্জন। জনতার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল।’ তিনি বলেন, ‘আপনাদের ডান দিকে একটি ব্যানারের লেখা আছে জুলাইয়ের শহীদ হওয়া সর্বকনিষ্ঠ ফুলগুলোর নাম। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু শহীদ হয়েছিল। তাদের কি কোনো অপরাধ ছিল? তাদের অপরাধ ছিল না। কিন্তু দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করতে গিয়ে যেভাবেই হোক এই শিশুগুলো জীবন দিয়েছে।’

সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করে গেছেন যে, জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১৪’শ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। সেই উত্তাল দিনগুলোতে যতটুকু সম্ভব হয়েছে আমার পক্ষে, আমি যতটুকু বিভিন্নভাবে শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও খোঁজ করছিলাম আমার নেতাকর্মীদের মাধ্যমে। অনেকে অনেক হিসাব দিয়েছে। কিন্তু আমার হিসাবের মতে শুধু জুলাই আন্দোলনে শহীদ হয়েছে ২ হাজারের মতো মানুষ, ৩০ হাজারের মতো মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সার্বিকভাবে।’

ফ্যাসিস্ট শাসনামলে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা-হামলার ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে আপনাদের সকলের কাছে একটু সহযোগিতা চাই আমি। যে আপনজনকে আপনারা হারিয়েছেন তারও তো লক্ষ্য ছিল এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, তারও তো লক্ষ্য ছিল এই দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিকে এগিয়ে নিতে ত্যাগ স্বীকার করার মতো শক্তি এবং সাহস বিএনপির আছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল, বাংলাদেশের অস্তিত্বে যারা বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রে যারা বিশ্বাস করে আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বিশ্বাস করি এইরকম প্রত্যেকটি মানুষের সেই সাহস এবং সেই শক্তি আছে।’

জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে উপস্থিত জুলাই পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেই মানুষই ত্যাগ করতে পারে যার সাহস আছে। আপনজনকে আপনারা হারিয়েছেন, যে অঙ্গ হারিয়েছেন তা ঠিক হয়ে যাবে? না... ঠিক হয়ে যাবে না। তবে, সবাই মিলে আমরা যদি এ দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, তবে একদিন গর্ব করে বলতে পারবেন আপনার আপনজনের ত্যাগের বিনিময়ে দেশের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে। এখন একমাত্র কাজ শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য, মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই দেশ, এই দেশের জনগণ, এই দেশের মাটি। তাই আসুন আমরা চেষ্টা করি- যাতে আর কোনোকিছু, আর কোনো শক্তি আমাদের এই লক্ষ্য অর্জন থেকে কোনোভাবেই বিচ্যুত করতে না পারে। আজকের এই দিনে জুলাই অভ্যুত্থানে, জুলাই শহীদ, জুলাই যোদ্ধা এবং বিগত ১৭ বছরের যতজন শহীদ হয়েছে- তাদের প্রতি যদি সম্পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে হয়, তাহলে যার জন্য তারা ত্যাগ করেছেন সেই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা। এটি হোক আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের গৃহীত শপথ, এটি হোক আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের গৃহীত প্রতিজ্ঞা।’ জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ জাতীয় সম্মেলনে যোগ দেয়া শত জুলাই যোদ্ধা পরিবারের সদস্য সরকার প্রধানের সামনে নিজেদের বুকের যন্ত্রণা, মনের ভাব তুলে ধরেন। এ সময় সন্তান ও স্বজন হারানো শোকাতুর স্বজনদের চোখের পানি আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্যালারি। সকাল সোয়া ১০ টায় পবিত্র কোরআন থেকে তেলোয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত এবং জাতীয় সংগীতের পর জুলাই আন্দোলনের ওপর প্রামান্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। জাতীয় এই সম্মেলনের মূলমন্ত্র ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত জুলাই শহীদের স্বজনেরা : অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে জুলাই স্মৃতি স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় শহীদ মিরাজের বাবা রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত আল মিরাজ, জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্মারক গ্রহণ করেন। এ সময় শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুল রব মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জুলাই এলেই চোখের পানির বাঁধ ভাঙে। ৫ আগস্ট আমার ছেলের বুক গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পুলিশ। আমি এক হতভাগা বাবা এই অন্যায়ের বিচার চাই, প্রতিটি জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।’

চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, ‘আমার ছেলে আর ফিরে আসবে না। কিন্তু আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়। এখন সরকারের কাছে দাবি, জুলাই যোদ্ধা যারা হাত পা হারিয়েছে তাদের সহায়তা করুন। তারা যেনো কষ্টে না থাকে।’ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ভাই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন দিয়েছে। তার অনুপ্রেরণায় আরও অনেকে শহীদ হয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তাদের পাশে সরকারের দাঁড়াতে হবে। আমার ভাই হত্যার দ্রুত বিচার চাই। পাশাপাশি সারা দেশে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণেরও দাবি করছি।’ শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ‘আমার বড় ছেলে জাহিদ মারা যাওয়ার পরে আমার ছোট ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়ে। আমি অসহায় অবস্থায়, ওই সময় এমন কোনো দরজায় নেই যেখানে যাইনি, কিন্তু সহায়তা পাইনি। তবে ‘আমারা বিএনপি পরিবার’-এর প্রত্যেকটি সদস্য আমাদের পাশে ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থেকে আমাদের খোঁজ নিয়েছেন, সহায়তা করেছেন। এখন বিএনপি সরকারের কাছে একটাই দাবি- সকল জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার চাই। আমি যেভাবে বিএনপির কাছে সহায়তা পেয়েছি অন্য জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরাও যেনো সহায়তা পায়। আমার সন্তানকে তো আর ফিরে পাবো না, তবে সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন।’ পরে উপস্থিত সকলের জন্যে রাখা স্মৃতি স্মারক তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। পরে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেও স্মৃতি স্মারক তুলে দেয়া হয়। জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে জুলাই সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। এ ছাড়াও সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।