ভূমিকম্প মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন জরুরি
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন ও ভূ-অভ্যন্তরের প্লেটগুলোর নড়াচড়া আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত মানবসভ্যতাকে নতুন করে এক চরম ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা একটি প্রলয়ঙ্করী ও ভয়াবহ ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রায় একই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত জাপান এবং ইন্দোনেশিয়াতেও শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছে। ঘন ঘন এই বৈশ্বিক দুর্যোগের বার্তাটি পরিষ্কার- প্রকৃতির এই আকস্মিক আঘাতের বিরুদ্ধে কোনো দেশই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিক এই ভয়াবহতার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এখন সময় এসেছে আমাদের নিজেদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার। ভূমিকম্পকে রোধ করার কোনো প্রযুক্তি মানুষের হাতে নেই, তবে সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি, দক্ষ উদ্ধার তৎপরতা এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং প্রাণহানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক চিত্র: ভেনেজুয়েলা, জাপান ও ইন্দোনেশিয়াভূমিকম্পের সাম্প্রতিক তাণ্ডবলীলা বিশ্বের একাধিক অঞ্চলে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এই দুর্যোগগুলোর গভীরতা এবং প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কেন একটি দেশের জন্য সক্ষমতা অর্জন কতটা জরুরি। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা রিখটার স্কেলে উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পটিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। বহুতল ভবন ধসে পড়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং উদ্ধারকাজের আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালগুলো আহত মানুষের চাপে ভেঙে পড়েছে এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভূমিকম্পের দেশ হিসেবে পরিচিত জাপানেও সম্প্রতি শক্তিশালী ভূ-কম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে জাপানের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা তাদের কঠোর ‘আর্থকোয়াক-রেজিসট্যান্ট’ বা ভূমিকম্প-সহনীয় নির্মাণশৈলী এবং স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থার কারণে এত বড় কম্পনেও প্রাণহানি অত্যন্ত সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। দেশটির নাগরিকেরা ছোটবেলা থেকেই দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ পেয়ে অভ্যস্ত।
ইন্দোনেশিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতা: একাধিক সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এবং ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি সুনামি আতঙ্ক তৈরি করেছিল। দেশটি বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোয় উপকূলীয় অঞ্চলে সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করলেও প্রত্যন্ত দ্বীপগুলোতে এখনও জানমালের বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো কঠিন হচ্ছে। এই তিনটি দেশের চিত্র আমাদের সামনে দুটি ভিন্ন বার্তা দেয়- প্রস্তুতিহীনতা কীভাবে ধ্বংস ডেকে আনে (ভেনেজুয়েলা) এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কীভাবে জীবন বাঁচাতে পারে (জাপান)।
বাংলাদেশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে
বৈশ্বিক এই পরিস্থিতির আলোকে বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে ঝুঁকির তুলনায় এই পদক্ষেপগুলো কতটা পর্যাপ্ত, তা নিয়ে বিশদ পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
১. আইনি ও কাঠামোগত নীতিমালা (BNBC) বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (Bangladesh National Building Code - BNBC) সংশোধন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনীয় নকশা বাধ্যকতামূলক করা হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ভবন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সয়েল টেস্ট (মাটি পরীক্ষা) এবং কাঠামোগত নকশাকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনার দাবি করছে।
২. উদ্ধার সরঞ্জাম ও ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়নবিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সক্ষমতা বাড়াতে কয়েকশত কোটি টাকার আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রিমোট কন্ট্রোলড কাটার, লাইফ ডিটেক্টর, ভারী ক্রেন এবং কংক্রিট ভাঙার আধুনিক যন্ত্রপাতি। এছাড়া সশস্ত্র বাহিনী এবং ফায়ার সার্ভিসের যৌথ মহড়ার মাধ্যমে উদ্ধারকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে।
৩. আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট (Urban Resilience Project) বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশে ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিগুলোর দুর্যোগ মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো। এর অধীনে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (EOC) স্থাপনের কাজ চলছে।
৪. মহড়া ও সচেতনতা বৃদ্ধিস্কুল, কলেজ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বিরতিতে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ড বিষয়ক মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে লিফলেট বিতরণ এবং গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত ও উদ্বেগ বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি এবং বর্তমান সক্ষমতা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভূতাত্ত্বিক, প্রকৌশলী এবং নগর পরিকল্পনাবিদেরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।’
ঢাকা শহরের জরাজীর্ণ ভবনগুলো একেকটি জীবন্ত কবরস্থান। ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলে নগরের অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ ভবন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। আমাদের উদ্ধারকাজের আধুনিক সরঞ্জাম আছে, কিন্তু ঢাকার সরু গলিতে সেই সরঞ্জাম নিয়ে ঢোকার কোনো রাস্তা নেই।’
নগর পরিকল্পনাবিদ ও গবেষক বিশেষজ্ঞদের প্রধান মতামত ও পর্যবেক্ষণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
ভূতাত্ত্বিক অবস্থান ও বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা: ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মা প্লেট) সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত। বিশেষ করে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল (সিলেট ও চট্টগ্রাম) এবং ডাউকি ফল্ট লাইন অত্যন্ত সক্রিয়। দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলে কোনো বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় ভূ-অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হয়ে আছে, যা যেকোনো সময় ৭ থেকে ৮ মাত্রার মহাবিপর্যয়কারী ভূমিকম্পের রূপ নিতে পারে।
পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের আধিক্য: বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহরের অর্ধেকেরও বেশি ভবন নিয়মনীতি না মেনে তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ভবনগুলো সামান্য কম্পনেই ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
উদ্ধার কাজের সীমাবদ্ধতা: বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রথম ৭২ ঘণ্টা (গোল্ডেন আওয়ার্স)। ঢাকার রাস্তাগুলো এতই সরু যে বড় কোনো দুর্যোগে ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি বা ক্রেন দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারবে না। এছাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অভাব: জাপানের মতো দেশে পাড়ায় পাড়ায় প্রশিক্ষিত নাগরিক বা স্বেচ্ছাসেবক থাকে। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্য সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাই বিশেষজ্ঞদের মতেই, পাড়া-মহল্লায় লাখ লাখ সাধারণ নাগরিককে প্রাথমিক উদ্ধারকাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
সক্ষমতা অর্জনে করণীয়: একটি সমন্বিত রোডম্যাপভেনেজুয়েলার বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মাথায় রেখে বাংলাদেশকে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে ভূমিকম্প মোকাবিলা সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন:
ক্রমিকেপদক্ষেপের ক্ষেত্রসুনির্দিষ্ট করণীয় ও বাস্তবায়ন কৌশল
১. রেট্রোফিটিং (Retrofitting) পুরানো ও দুর্বল কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোকে রেট্রোফিটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত ভেঙে ফেলতে হবে।
২. কঠোর আইন প্রয়োগই NBC কোড অমান্য করে ভবন নির্মাণ করলে নির্মাতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও জেল-জরিমানার বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ইউটিলিটি লাইনের স্বয়ংক্রিয়তাভূমিকম্পের প্রথম ৫ সেকেন্ডের মধ্যে যেন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়, এমন শাট-অফ ভালভ (Shut-off Valve) প্রযুক্তি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হবে।
৪. স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনপ্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লায় যুবসমাজকে নিয়ে ‘কমিউনিটি ভলান্টিয়ার’ দল গঠন করতে হবে এবং তাদের নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে প্রস্তুত রাখতে হবে।
৫. উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণশহরের পার্ক, খেলার মাঠ ও জলাশয় রক্ষা করতে হবে, যেন ভূমিকম্পের পর মানুষ সেখানে আশ্রয় নিতে পারে এবং অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করা যায়।
উপসংহার ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা দেয় না। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক কান্না আর জাপানের সুরক্ষাকবচণ্ডএই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে বেছে নিতে হবে সে কোন পথে হাঁটবে। শুধু কাগজে-কলমে আইন বা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, জাতীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের স্বার্থেই ভূমিকম্প মোকাবিলায় বাস্তবমুখী সক্ষমতা অর্জন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আজ যদি আমরা অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ এবং কাঠামোগত প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী দিনের কোনো এক সেকেন্ডের কম্পন আমাদের কয়েক দশকের উন্নয়ন ও কোটি মানুষের জীবনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। সরকারের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই বিষয়ে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
