শান্তিমিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও জোরদারের আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে গত সোমবার জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনস (ডিওপি)-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ এ বৈঠকে উভয় পক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ বলা হয়, বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ পুলিশের অবদান, দ্রুত নিয়োজন সক্ষমতা যাচাই, কঙ্গো মিশন থেকে বাংলাদেশি নারী এফপিইউ এর প্রত্যাহারের প্রেক্ষিতে নতুন মিশনে প্রতিস্থাপন, জাতিসংঘ সদরদপ্তর ও মাঠপর্যায়ে নীতি-নির্ধারণী পদে বাংলাদেশিদের নিয়োগ, আইপিও ডেপ্লয়মেন্ট এবং ভবিষ্যৎ বিশেষায়িত সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের এক বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত অংশীদার। এ পর্যন্ত ২৬টি দেশের ২৭টি শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তিনি বলেন, অন্যতম শীর্ষ পুলিশ অবদানকারী দেশ (পিসিসি) হিসেবে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের যে কোনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা বাড়াতে নানামুখী বিনিয়োগ ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের দ্রুত সাড়াদানের সক্ষমতাকে আরও জোরদার করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দুটি ফর্মড পুলিশ ইউনিটের (এফপিইউ) র্যাপিড ডেপ্লয়মেন্ট লেভেল (আরডিএল) যাচাইকরণের প্রস্তাব এরইমধ্যে জাতিসংঘ পুলিশ বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে। ইউনিট দুটি জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম, নিজস্ব রসদ ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ জনবলে সম্পূর্ণ সুসজ্জিত। মন্ত্রী এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনস এর আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন। বৈঠকে মন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কঙ্গোর মোনুস্কো মিশন থেকে গত বছরের অক্টোবরে স্বল্প সময়ের নোটিশে ১৮০ সদস্যের বাংলাদেশি নারী এফপিইউ (বিএএনএফপিইই) প্রত্যাহারের বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, অন্যান্য মিশন যেমন সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক বা দক্ষিণ সুদানে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আনুপাতিক হারে কমানো হলেও, কঙ্গোতে কেবল বাংলাদেশের পুরো ইউনিটটি প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা সমতা ও ন্যায্যতার নীতি পরিপন্থী। বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দক্ষিণ সুদান, আবেয়ি বা সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে একটি নতুন বাংলাদেশি এফপিইউ মোতায়েনের জন্য তিনি আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলকে অনুরোধ জানান।
শান্তিরক্ষা মিশনের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশের অবদান বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সদরদপ্তর এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন মিশনসমূহের শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিশেষায়িত পেশাদার পদে (পি-লেভেল এবং ডি- লেভেল) যোগ্য ও দক্ষ বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শান্তি মিশনের পরিবর্তিত চাহিদাকে ধারণ করতে সক্ষম এমন অত্যন্ত যোগ্য পুরুষ ও নারী কর্মকর্তা প্রদানে সর্বদা প্রস্তুত।
বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৪ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সিলেকশন অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট টিম (এসএএটি) পরীক্ষায় ১০৭ জন কর্মকর্তা উত্তীর্ণ হলেও এখনো ৮৫ জন কর্মকর্তা নিয়োজনের অপেক্ষায় আছেন। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও কঙ্গোতে বাংলাদেশি ইন্ডিভিজুয়াল পুলিশ অফিসার (আইপিও)-এর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায়, সেখানে ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ এবং অপেক্ষমাণ কর্মকর্তাদের দ্রুত পদায়নের অনুরোধ জানানো হয়। একইসঙ্গে, বর্তমান তালিকার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলায়, আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে পরবর্তী ‘সাট’ পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলকে সময়োচিত সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ অবদান, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি কঙ্গো মিশনের ভারসাম্য ও সমতার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাস দেন এবং বাংলাদেশের উত্থাপিত যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলো পূরণে ও বিশেষায়িত পুলিশ দল গঠনে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের সাথে জাতিসংঘের অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার প্রত্যয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ’র সঙ্গে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব অপারেশনাল সাপোর্ট (ডিওএস)-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল (ইউএসজি) অতুল খারে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল বলা হয়, বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ কন্টিনজেন্টগুলোর পরিচালনাগত সহযোগিতা, আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা প্রতিপূরণ দ্রুতকরণ, পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন, ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ (ডব্লিউ পিএস) এজেন্ডা এবং হাইতিতে বাংলাদেশের বিশেষায়িত পুলিশ কন্টিনজেন্ট মোতায়েনের প্রস্তুতিসহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকের শুরুতে পারস্পরিক কুশল বিনিময়ের পর মন্ত্রী শান্তিরক্ষা মিশনে মোতায়েনকৃত বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর প্রতিপূরণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো সহজতর করার ক্ষেত্রে ডিপার্টমেন্ট অব অপারেশনাল সাপোর্ট এর ধারাবাহিক ও কার্যকর সহায়তার জন্য আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য ডিওএস-এর পরিবেশ বিভাগকেও ধন্যবাদ জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা পরিবেশগত ক্ষতি হ্রাস করতে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৌর প্যানেল স্থাপন করেছে। এই খাতে বাংলাদেশের যে বিশেষায়িত অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে, তা ব্যবহার করে জাতিসংঘের সহযোগিতায় ভবিষ্যতে মিশন এলাকাগুলোতে আরও ব্যাপকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌর প্যানেল স্থাপনে বাংলাদেশ কাজ করতে আগ্রহী।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ (ডব্লিউ পিএস) এজেন্ডা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি মিশন এলাকায় নারী শান্তিরক্ষীদের জন্য নিরাপদ, উপযুক্ত এবং অনুকূল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব ও নারী-বান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রতিকূল বা শত্রুভাবাপন্ন আক্রমণাত্মক পরিস্থিতিতে শান্তিরক্ষীরা যাতে আরও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেজন্য তাদের পর্যাপ্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উন্নত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, হাইতির বর্তমান অস্থিতিশীল ও জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত আধুনিক ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ৩টি বিশেষায়িত ফর্মড পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। মন্ত্রী জানান, প্রচলিত এফপিইউ-এর তুলনায় এই ইউনিটগুলো সোয়াত, র্যাপিড রেসপন্স প্ল্যাটুন, বিস্ফোরক অর্ডন্যান্স নিষ্ক্রিয়করণ, ফরেনসিক ও ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্ট, সংগঠিত অপরাধ ও সাইবার ক্রাইম তদন্ত, নৌ-কার্যক্রম এবং মাদকবিরোধী অভিযানে বিশেষভাবে পারদর্শী।
হাইতিতে এই বিশেষায়িত সক্ষমতার সর্বোত্তম ব্যবহারের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি জানান, এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য আগামী ১৫-১৭ জুলাই ২০২৬ জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ৩ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এমওইউ আলোচনায় অংশ নেবে। এই আলোচনা সফল করতে এবং প্রস্তাবিত সরঞ্জামগুলো অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পূর্ণ সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন মন্ত্রী। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পূর্ণাঙ্গ এফপিইউ মোতায়েনের পাশাপাশি অন্যান্য পুলিশ অবদানকারী দেশের (পিসিসি) স্বনির্ভর ইউনিটের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশের বিশেষায়িত পুলিশ টিম বা প্ল্যাটুন মোতায়েন করতেও বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে। আলোচনাকালে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীল পতাকাতলে বাংলাদেশের অবিচল ও দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের পেশাদারিত্ব এবং জাতিসংঘের লজিস্টিক সাপোর্টের সমন্বয়ে বিশ্ব শান্তিরক্ষা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
