মাশহাদে সমাহিত হলেন খামেনি
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে সমাহিত হলেন দেশটির নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের সবচেয়ে পবিত্র মাজার শরীফে তাকে দাফন করা হয়। তবে এই দাফন অনুষ্ঠানেও জনসম্মুখে দেখা যায়নি খামেনির ছেলে ও তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিকে। যে হামলায় আলী খামেনি নিহত হয়েছিলেন, সেই একই হামলায় মোজতবা মারাত্মকভাবে আহত ও বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তিনি এখনও লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছেন।
মাশহাদের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াটি ছিল সপ্তাহব্যাপী চলমান শোক মিছিল, সমাবেশ এবং শোকাতুর অনুষ্ঠানের সমাপনী। এই শোকের আবহ এমন এক সময়ে চলছে যখন আমেরিকার সঙ্গে ইরানের কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘাত শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে মাশহাদে সোনালি গম্বুজ বিশিষ্ট ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজারের সামনে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। তারা ইরানের পতাকা, প্রয়াত খামেনির ছবি এবং বিপ্লবের স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে শোক মিছিলে অংশ নেন।
গত এক সপ্তাহ ধরে খামেনির লাশ ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ইরানের ধর্মীয় নেতারা এই বিশাল গণজমায়েতকে তাদের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি ও আদর্শিক দৃঢ়তা প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে আমেরিকা ও ইসরায়েলের কয়েক মাসের হামলা সত্ত্বেও টিকে থাকা ইরান এখন অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। খামেনির ৩৭ বছরের দীর্ঘ শাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে দেশটিতে রয়েছে অমীমাংসিত বিতর্ক।
বাবার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর ক্লেরিকাল অ্যাসেম্বলি কর্তৃক নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষিত মোজতবা খামেনির অবস্থান এখনও ইরানিদের কাছে রহস্যময়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে মোজতবাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তিনি কিছু লিখিত বিবৃতি দিলেও তার কোনো ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠস্বর রেকর্ড এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। ওই হামলায় তিনি গুরুতর জখম হয়েছেন; তার মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে এবং হাত-পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরানের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন, কিন্তু এখনও জনসমক্ষে আসার মতো শারীরিক অবস্থায় নেই। এছাড়া মার্কিন হামলা থেকে তাকে রক্ষা করতে নিরাপত্তা বাহিনীও তার অবস্থান গোপন রাখছে।
জানাজায় ‘ট্রাম্পকে হত্যা কর’ স্লোগান : মাশহাদে খামেনির লাশবাহী শোক যাত্রার অপেক্ষায় থাকা জনতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে।
‘আমরা সর্বোচ্চ নেতার রক্তের কসম খেয়ে বলছি, ট্রাম্প, আমরা তোমাকে হত্যা করব!’ বলে তারা চিৎকার করে। নারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘কিল ট্রাম্প’ (ট্রাম্পকে হত্যা করো)। মাজার অভিমুখে যাওয়া রাস্তাগুলো কালো পোশাক পরিহিত শোকার্ত মানুষের সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। তারা খামেনির প্রশংসা এবং ইরানের শত্রুদের বিরুদ্ধে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ স্লোগান দিচ্ছিলেন। তীব্র গরমে শোকার্তদের ঠান্ডা রাখতে ওপর থেকে পানি ছিটানো হয়।
খামেনি এবং তার সঙ্গে নিহত পরিবারের অন্য চার সদস্যের লাশ এরইমধ্যে তেহরান, শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র কোম এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরের মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রতিটি স্থানেই বিশাল জনসমাবেশ শোক গাথা ও বিপ্লবী স্লোগানের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানায়। শিয়া ধর্মতত্ত্বে ‘শাহাদাত’ একটি কেন্দ্রীয় বিষয় এবং বিদেশি শত্রুর হাতে খামেনির মৃত্যু ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রভাব ফেলেছে।
খামেনির দীর্ঘ শাসন ও বিতর্কিত উত্তরাধিকার : খামেনির এই বিদায় ইরানের জন্য অত্যন্ত সংকটময় একটি মুহূর্ত।
প্রায় চার দশকের খামেনি শাসনের অবসান এমন এক সময়ে ঘটল যখন কয়েক মাস আগে দেশটিতে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। যদিও সেই বিক্ষোভ দমন করা হয়েছে, তবে নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এখনও বহাল।
খামেনি ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিযুক্ত হন এবং কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা নিজের দপ্তরে কেন্দ্রীভূত করেন।
এতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের ক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হয়। মোজতবা খামেনিকে মূলত রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)-এর সমর্থনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা বর্তমানে ইরানের রাজনীতি ও কৌশলী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি।
