শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
* কোনো শিশু যেন নির্দয় হয়ে বেড়ে না ওঠে * দেশটাকে আরও সবুজ করে গড়ে তুলতে হবে * শিশুদের গাছ লাগানোর তাগিদ
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষকদের প্রতি শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুদের মানুষ করার কারিগর আপনারা। তাই খেয়াল রাখতে হবে কোনো শিশু যেন নির্দয় হয়ে বেড়ে না ওঠে। সেটি প্রাণী হোক বা পশু-পাখির প্রতি হোক। কারও প্রতি যেন তারা নির্দয় না হয়। তাই শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তুলবেন আপনারা। তিনি বলেন, ‘দেশ গড়তে মানবিক সৈনিক দরকার। আর এই মানবিক সৈনিক আপনারা গড়ে তুলবেন। আর শিশুরা মানবিক মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠলে মানবিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।’ গতকাল সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, গীতা ও ত্রিপিটক এবং বাইবেল থেকে কিছু অংশ পাঠ করা হয়।
এ সময় প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও শিক্ষার উন্নয়নে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার অবদান নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে প্রাথমিক শিক্ষা পদক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ এই অনুষ্ঠানে এসে মনে হচ্ছে আমি একটি কারখানায় ঢুকে পড়েছি। যেখানে সবাই মানুষ গড়ার কারিগর।’
সারাদেশ থেকে আসা প্রাথমিক শিক্ষকদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়তে আপনাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আপনারাই পারেন শিশুদের মধ্যে পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে।’ তিনি বলেন, ‘জানি, আপনাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, কিছু সংকট আছে। সেগুলো আমরা সমাধানের চেষ্ট করবো। তবে আপনাদের জন্য ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আমরা করবো। যেন আপনারা অর্জিত সেই জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সঠিকভাবে ছড়িয়েছে দিতে পারেন।’
শিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার উপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া তাদের প্রতিবছর একটি করে গাছ রোপণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তোমরা প্রতিবছর বর্ষাকালে একটি করে গাছ লাগাবে। গাছটাও বড় হবে, সঙ্গে তোমরাও বড় হবে। গাছই হবে তোমাদের বন্ধু। গাছের নিচে বসে ক্লান্তি দূর হবে, শান্তি পাবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। সূচনা বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন। সারাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য শিশু শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
এ সময় দেশজুড়ে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে নির্বাচিত সেরা শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদক দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের মধ্যেই খুদে শিক্ষার্থীদের দুটি গ্রুপের মধ্যে ‘মোবাইল শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক’ এর পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শুরু হয় শিশুদের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একের পর এক চলতে থাকে গান, কবিতা আবৃত্তি, নাচ ও নাটক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতিথি সারিতে বসে এসব আয়োজন উপভোগ করেন।
দেশটাকে আরও সবুজ করে গড়ে তুলতে হবে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশকে আরও সবুজ করে গড়ে তুলতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি শিশুদের প্রতি বছর অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর অনুরোধ করেছেন। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দেশব্যাপী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানের আগে প্রধানমন্ত্রী এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সারাদেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সূচনা হিসেবে তিনি একটি নিমগাছের চারা রোপণ করেন। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে আজ দেশজুড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একযোগে প্রায় ২ লাখ চারা রোপণ করা হচ্ছে।
উপস্থিত শিশুদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা চেষ্টা করবে প্রতি বছর একটি করে গাছ রোপণ করতে। সেটি তোমাদের স্কুলে হোক বা বাসার আশপাশে। যেখানে মনে করবে সেখানেই একটি করে গাছ রোপণ করবে।’ তিনি বলেন, ‘গাছটি কি পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন করে, ওই গাছটি মানুষের কী কী উপকারে আসে এই বিষয়গুলো তোমরা ইন্টারনেট ঘেটে বিভিন্নভাবে রিসার্চ করবে।’ তারেক রহমান বলেন, ‘এভাবে প্রতি বছর তোমরা একটি করে গাছ সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পারবে। স্কুলে লাগানো গাছ বড় হলে সেটি তোমাদের ছায়া দেবে। ক্লান্ত হলে তোমরা সেই গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে পারবে।’ তিনি বলেন, একইভাবে বাসায় যদি গাছ রোপণ কর, গাছটা যখন বড় হবে, সুন্দর বাতাস বইবে। ঘরে বসে তুমি বাতাস উপভোগ করতে পারবে। আবার পরিবেশটা অনেক ঠান্ডা হবে। আজকের দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ একটি স্মরণীয় দিন। আজ আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশের মাটিতে একসঙ্গে অনেকগুলো গাছ রোপণ করলাম।’
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ক শিশু শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে ঘুরে দেখেন।
এ সময় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্কুল পরিষ্কার রাখতে শিশুদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর : শিশুদের নিজেদের স্কুল পরিষ্কার রাখতে ও ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে একে অপরকে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার ‘সবুজ বিদ্যালয়’ কর্মসূচির অধীনে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর স্থাপিত স্টল পরিদর্শনকালে তিনি এ আহ্বান জানান। এর আগে সেখানে একটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ‘গ্রিন স্কুল’ বা সবুজ বিদ্যালয় কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখেন তিনি। প্রদর্শনীটিতে ৬০টি জেলার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা উদ্ভাবনী শিক্ষামূলক কার্যক্রম, স্থানীয় ঐতিহ্য, হস্তশিল্প, পরিবেশগত উদ্যোগ এবং সৃজনশীল শিক্ষণ প্রকল্প প্রদর্শন করেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এসব কর্মসূচির আয়োজন করে। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬ প্রদান, দেশব্যাপী ‘সবুজ বিদ্যালয়’ বৃক্ষরোপণ অভিযানের উদ্বোধন এবং সারাদেশ থেকে আসা প্রাথমিক শিক্ষার উদ্ভাবনী উদ্যোগসমূহের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশু, শিক্ষক এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মতবিনিময় করেন। তাদের সৃজনশীলতার প্রশংসা করেন এবং তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করেন। বিভিন্ন স্টলে প্রধানমন্ত্রী প্রবেশ করা মাত্র শিক্ষার্থীরা তাদের তৈরি করা হস্তশিল্প, মডেল এবং শিক্ষা উপকরণ প্রদর্শন করে আনন্দের সঙ্গে।
শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, খেলার মাঠের সুবিধা এবং ‘আনন্দময় শিক্ষা’ ও ‘ডিজিটাল শিক্ষা’ কর্মসূচির অধীনে বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে তাদের প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খেলাধুলার বিষয়েও আলাপ করেন। খুদে শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান তারা কী কী ধরনের খেলাধুলা করে। তাদের শিক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে তাদের ব্যাখ্যা মনোযোগ দিয়ে শোনেন তিনি। এর মধ্যে একটি স্টলে শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীকে জানায়, তারা সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সহপাঠীদের সাহায্য করতে এবং একসঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়ার জন্য নিয়মিত টিফিনের টাকার একটি অংশ জমায়।
এ কথা শুনে তারেক রহমান অনেক খুশি হন। ‘তোমরা খুব ভালো কাজ করছো’ বলে তাদের উৎসাহিত করেন। শিক্ষার্থীরা তাদের দৈনন্দিন ক্লাসের রুটিন, টিফিনের বিরতি এবং পাঠ্যক্রমের বাইরের কার্যক্রম সম্পর্কেও জানায়। অন্য একটি স্টল পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী শিশু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে করমর্দন করেন। এ সময় তাদের স্কুল সব সময় পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন।
তিনি বলেছেন, তোমাদের স্কুল পরিষ্কার রাখবে। যখনই কোনো ময়লা দেখবে, তা তুলে সঠিক ডাস্টবিনে ফেলবে। শিক্ষার্থীদের তৈরি করা প্রদর্শনীগুলো দেখে প্রধানমন্ত্রী তাদের কাজের প্রশংসা করেন। তিনি প্রত্যেক শিশুকে অন্তত একটি গাছ লাগাতে ও তার যত্ন নিতে আহ্বান জানান। একটি স্টলে শিশুরা তাকে একটি ফুলের টবে চারাগাছ লাগিয়ে দিতে বলে, যাতে তার এই সফরের একটি স্থায়ী স্মৃতি হিসেবে পরে সেটি তাদের স্কুলে রোপণ করা যায়। প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান। শিশুরা দ্রুত একটি ফুলের টব ও চারাগাছ এনে দিলে তিনি নিজেই সেটি রোপণ করেন। এ সময় ছাত্রছাত্রীরা তার সঙ্গে ছবি তোলার অনুরোধ করলে তিনি হাসিমুখে স্টলের ভেতরে ঢুকে শিশুদের সঙ্গে পোজ দেন। এর আগে সারাদেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির শুরু হিসেবে প্রধানমন্ত্রী একটি নিম গাছের চারা সেখানে রোপণ করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশজুড়ে আজ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একযোগে প্রায় ২ লাখ চারা রোপণ হচ্ছে। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস-সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।
