তালাকের অজুহাতে বন্ধ হবে না স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয়- এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের ডিক্রি বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না বলে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কোনোভাবেই মা-বাবার তালাক সংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি শিশুর একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার।

এক ব্যক্তির সিভিল রিভিশন আবেদন খারিজ করে গত ২২ জুন বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চের দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে এ কথা বলা হয়েছে। রায়ে আবেদনকারী নজরুল ইসলামকে গত ১০ বছরের বকেয়া দেনমোহর, সন্তানের ভরণপোষণসহ সমুদয় অর্থ আইন অনুযায়ী পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রায়ের সার্টিফায়েড কপি হাতে পাওয়ার পর বিবাদীর আইনজীবী ইশরাত হাসান আদালতের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও আইনগত অধিকার। পিতা-মাতার মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, সন্তান যার কাছেই যেভাবে থাকুক না কেন, তাকে সবসময় ভরণপোষণ দিতে বাবা আইনত বাধ্য। সন্তানের এ ভরণপোষণের আর্থিক দায়িত্ব শুধু বাবার ওপরই বর্তায়।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর শেখ নজরুল ইসলামের সঙ্গে হালিমা খাতুনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর নজরুল ইসলাম স্ত্রীর কাছে দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এ নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে হালিমা খাতুন বাবার বাড়িতে চলে যান। সেখানে ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাদের কন্যাসন্তান সায়রা আক্তারের জন্ম হয়। পরবর্তীতে কোনো ভরণপোষণ না পেয়ে হালিমা খাতুন দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণ চেয়ে বাগেরহাটের পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলার শুনানিতে স্বামী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি কোনো যৌতুক চাননি, নিয়মিত ভরণপোষণ দিয়েছেন এবং ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্ত্রীকে চূড়ান্ত তালাক দিয়েছেন।

তবে সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে পারিবারিক আদালত দেখে, স্বামী আইন অনুযায়ী তালাক দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে রায় দিয়ে ডিক্রি জারি করেন।

এ রায়ের বিরুদ্ধে নজরুল বাগেরহাটের জেলা জজ আদালতে আপিল করলে তা খারিজ হয়ে যায়। পরে হাই কোর্টেও সিভিল রিভিশন আবেদন করা হলে ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর তাও খারিজ করে বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্তই বহাল রাখা হয়। এর পরও স্ত্রী যাতে ডিক্রি জারি মামলার পাওনা না পান, সেজন্য নজরুল ইসলাম ২০২২ সালে বাগেরহাটের সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে নতুন করে একটি ঘোষণামূলক দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন, যেখানে তিনি পুনরায় দাবি করেন যে-তার দেওয়া তালাক কার্যকর হয়েছে।

এদিকে হালিমা খাতুন তার প্রাপ্য বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালেই ডিক্রি জারি মামলা করেন। নজরুল আবেদন করেন, তার দায়ের করা নতুন ঘোষণামূলক মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যেন ডিক্রি জারি মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়। ২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জারি আদালত নজরুলের এ আবেদন নামঞ্জুর করেন এবং পরবর্তীতে আপিলেও বাগেরহাটের জেলা জজ আদালত এ সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে নজরুল ইসলাম হাই কোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করলে আদালত তা খারিজ করে দেন।

হাই কোর্ট রিভিশন আবেদনটি খারিজ করার পাশাপাশি আবেদনকারী নজরুল ইসলামকে গত ১০ বছরের বকেয়া দেনমোহর, সন্তানের ভরণপোষণসহ সমুদয় অর্থ আইন অনুযায়ী পরিশোধের নির্দেশ দেন।

তবে তিনি যদি জারি আদালতে তার প্রকৃত আর্থিক সংকটের প্রমাণ দিতে পারেন, তবে আদালত বিবেচনা অনুযায়ী তাকে কিস্তিতে টাকা পরিশোধের সুযোগ দিতে পারে বলে রায়ে বলা হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় হাই কোর্ট বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেছে, ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদ, বৈবাহিক অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র ও একচ্ছত্র এখতিয়ার শুধু পারিবারিক আদালতের।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অন্য কোনো সাধারণ দেওয়ানি আদালত এ বিশেষ এখতিয়ার নিজের ওপর প্রয়োগ করতে পারে না। একই অধ্যাদেশের ১৬(৪) ধারা অনুযায়ী জারি আদালতের দায়িত্ব শুধু ডিক্রি কার্যকর করা; অন্য কোনো আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকার অজুহাতে সেই কার্যক্রম স্থগিত রাখার এখতিয়ার তার নেই। হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারায় নির্ধারিত লিখিত নোটিসসহ বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়া ও তার প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন না করলে তালাক কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করা যাবে না। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত না হওয়া কোনো তালাকের আইনি কার্যকারিতা থাকে না এবং তা দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটে না। একইভাবে শুধু একটি নতুন ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করার অর্থ এই নয় যে তা আগের কোনো মামলায় হওয়া চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়নকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত করতে পারবে।

পর্যবেক্ষণে এও বলা হয়, কথিত তালাকের প্রক্রিয়াটি আইনগতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় অকার্যকর হলেও স্বামী যদি প্রকৃতপক্ষে বিবাহবিচ্ছেদ চান, তবে সম্পূর্ণ আইনগত ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নতুন করে ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন, এ রায় তাতে কোনো আইনি বাধা সৃষ্টি করবে না। আইনজীবী ইশরাত জাহান বলেন, পারিবারিক আদালতের সিদ্ধান্ত ও ডিক্রি বাস্তবায়নের পথে এ ধরনের অপ্রমাণিত তালাকের দাবি কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। আইন অনুযায়ী কোনো স্বামীর ডকুমেন্টারি প্রমাণ ও নোটিস ছাড়া মুখে মুখে তালাকের অজুহাতে সন্তানের ভরণপোষণের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তবে পিটিশনার চাইলে নতুন করে আইনগত প্রক্রিয়ায় ডিভোর্স দিতে পারেন, সে ক্ষেত্রে এ রায় কোনো বাধা হবে না। এ আদেশের ফলে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরের বকেয়াসহ সন্তানের ভরণপোষণ পাওয়ার পথ সুগম হল।