সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে : তথ্য উপদেষ্টা

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ডিপফেক, ভুয়া তথ্য (ডিসইনফরমেশন), মিথ্যাচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইনজীবী প্যানেল গঠনের সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি বাকি রয়েছে, যা আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই প্রকাশ করা হবে। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ডিপফেক, মিথ্যাচার ও সাইবার বুলিং কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। গতকাল মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. জাহেদ বলেন, সরকার শুরু থেকেই তথ্যের অপব্যবহার, বিশেষ করে ডিসইনফরমেশন এবং সাইবার বুলিংকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, মানুষের বিরুদ্ধে অপ-প্রচার চালানো, ছবি ও ভিডিও বিকৃত করে প্রচার করা এবং ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটাচ্ছে না, বরং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি এবং মানুষের নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বিশেষ করে নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। শুধু নারী হওয়ার কারণেই অনেককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপমান, হুমকি, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং মিথ্যা প্রচারণার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই আইনজীবী প্যানেল শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেবে না, প্রয়োজন হলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারবে। সরকার যেসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে, সেসব ক্ষেত্রেও প্যানেলটি সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা প্রদান করা।

তথ্য উপদেষ্টা নাগরিকদেরও আহ্বান জানান, কেউ যদি সাইবার বুলিং, ডিপফেক, মিথ্যা তথ্য বা অনলাইন হয়রানির শিকার হন, তাহলে যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন রয়েছে, তেমনি-এর দায়িত্বশীল ব্যবহারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডা. জাহেদ বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় যাচাই-বাছাইয়ের একটি প্রক্রিয়া থাকে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ব্যবস্থা নেই। ফলে যে কেউ যেকোনো তথ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে দিতে পারেন। এ কারণে ব্যবহারকারীদের আরও সচেতন হতে হবে এবং কোনো তথ্য বা ছবি যাচাই ছাড়া শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র যেমন নাগরিকদের সচেতন করার দায়িত্ব পালন করবে, তেমনই নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য তুলে ধরেন জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ২১৮ জন, সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১০ হাজার ৮৫৭ জন। একইভাবে মৃত্যুর সংখ্যাও কমেছে। গত বছর একই সময়ে ডেঙ্গুতে ৬২ জনের মৃত্যু হলেও এবার মৃত্যু হয়েছে ৩৭ জনের। যদিও প্রতিটি মৃত্যু দুঃখজনক, তারপরও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জ্বালানি খাতের অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য ৪০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনার মধ্যে এরইমধ্যে ২৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রায় ২৭০ দশমিক ৮ মিলিয়ন এমএমসিএফটি গ্যাস উৎপাদন নিশ্চিত হয়েছে এবং এর মধ্যে ১২৫ দশমিক ৩ এমএমসিএফটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাকি কূপগুলো খনন করে আরও প্রায় ১ হাজার ৪৯১ এমএমসিএফটি গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদ যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার ‘নিরাপদ খাদ্য প্রবিধানমালা-২০২৬’ জারি করেছে। নতুন এই বিধিমালা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং বাজার তদারকি অব্যাহত রয়েছে। খাদ্য মজুদও দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি। ব্রিফিংয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, আগামী আগস্টের মাঝামাঝি পরীক্ষামূলকভাবে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হবে। প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে এই ডেবিট কার্ড দেওয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ হাজার এবং আগামী বছরের জুনের মধ্যে দুই লাখ প্রবাসীর হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা অন্তত ১০ ধরনের সেবা সহজে পাবেন বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষায় সরকার পলিথিনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব পাটজাত ব্যাগ ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে। ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন বাজারে স্বল্পমূল্যে পাটের ব্যাগ বিতরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা আদায় এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

শিল্প খাত প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন ২৫টি মিলের মধ্যে ১৬টি মিল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ কমবে বলে সরকার আশা করছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কর্মসংস্থানও সুরক্ষিত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, খাদ্য, শিল্প, পরিবেশ ও প্রবাসী কল্যাণসহ বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো- প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া। সবাইকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একটি সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে সরকার যেমন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তেমনি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ডিপফেক, মিথ্যাচার ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।