স্থানীয় সরকার নির্বাচন
নির্দলীয় ভোটে দলগুলো কতটা প্রস্তুত?
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আলোকিত ডেস্ক

স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন এবার দলীয় প্রতীকে না হলেও রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তুতি শুরু করেছে। প্রার্থী নির্ধারণ, মাঠ যাচাইসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তারা। সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বছর না পেরোতেই আসন্ন স্থানীয় সরকারের ভোটে জনপ্রিয়তার পরীক্ষা দিতে হবে ক্ষমতাসীন বিএনপিকে, যারা প্রায় দুই দশক পর আবার সরকার গঠন করেছে। ফলে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নকেন্দ্রিক বিভাজন, দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব দৃশ্যমান হওয়ার আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করে ফেলা যায় কি না, সে আলোচনা সরকারি দল বিএনপির মধ্যে আছে। প্রশাসনকে কতটা নিরপেক্ষ রাখা যাবে- এমন আলোচনার পাশাপাশি সংঘাতহীন সুষ্ঠু নির্বাচন ও সবার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে বিএনপির মধ্যে আলোচনা চলছে।
ক্ষমতাসীনদের মধ্যে একাধিক প্রার্থী হওয়া নিয়ে আলোচনা থাকলেও সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি তাদের প্রার্থী নির্ধারণের কাজ গুছিয়ে আনার কাজ করছে।
সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগ। কিন্তু নির্দলীয় স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী দলের আসনে থাকা জাতীয় পার্টি এখনও নির্বাচন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি, যদিও তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি কর্পোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে ওয়ার্ড ও সীমানা বিন্যাসের কাজে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। আগামী অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে ধাপে ধাপে নির্বাচন শুরু করতে চায় সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি। আইন সংশোধনের ফলে এবার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে। গেল বছরের আগস্টে স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের জন্য ত্রয়োদশ সংসদে বিল পাস করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদণ্ডইউপিতে দলীয় প্রতীকে ভোটের বিধান রেখে আইন সংশোধন করে। সেই আইন সংশোধন করে এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোটের উদ্যোগ নেওয়া হল।
জামায়াতে ইসলামী কী করছে : সংসদে নানা বিষয়ে সরকারের সমালোচনা ও বিরোধিতার পাশাপাশি মাঠের আন্দোলনেও রয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তার জোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় কার্যকর করতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য বিক্ষোভ সমাবেশ করছে। অর্থাৎ তারা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা বলেছেন, এরইমধ্যে স্থানীয় সরকারের প্রস্তুতি নিতে সকল কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, জামায়াতের স্থানীয় নেতারাও নির্বাচনি কার্যক্রম শুরু করেছেন। ভোটার তালিকা যাচাই, নতুন-পুরোনো ভোটার টানা, নারী ও তরুণ ভোটারদের নিশানা করে দলের নেতারা কাজ করছেন। বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোটারদের মন কাড়তে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্নভাবে গণসংযোগ করছেন। তাদের নেতাকর্মীরাও প্রার্থীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচার। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হলেও পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়েও প্রার্থী ঠিক করে রাখছে জামায়াতে ইসলামী। তবে দলটি জোটবদ্ধ নির্বাচন করছে না। জামায়াত বলছে, স্থানীয় সরকারের সকল পর্যায়েই সারাদেশে দলসমর্থিত এককপ্রার্থী নির্ধারণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘১১ দলীয় ঐক্যের কোনো বিষয় নেই। নিজেরা আলাপ করে স্ব-স্ব দলীয় প্রার্থীই নির্ধারিত হচ্ছে।’ জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান এই নেতা বলেন, ইতিহাস তো আমাদের কাছে সুখকর না। দলীয় সরকারের অধীনে যদি নির্লজ্জভাবে নির্বাচন হয়; নির্বাচনের সময় যদি সরকার নিজেদের লোককেই বিজয়ী করার প্রয়াস চালায়, তাহলে তো নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।
নির্বাচন প্রভাবিত হলে কী করবে জামায়াতে ইসলামী? জবাবে এহসানুল মাহবুব বলেন, ‘এখনই আমরা এটা বলবো না। আমরা মনে করি অতীতের পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তারা (সরকার) উপহার দেবে।’
‘কোনো অবস্থাতেই যেন বৈষম্য, দলীয়করণ না হয়। সবাই যেন সমান সুযোগ পান, এটাই প্রত্যাশা জামায়াতে ইসলামীর,’ বলেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
এনসিপিও ভোট করবে ‘একা’ : জুলাই অভ্যুত্থানে বর্ষপূতি ঘিরে এনসিপির ছত্রিশ দিনের কর্মসূচি চলছে। এই কর্মসূচি শেষ হলে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন নেতারা। ইতোমধ্যে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণে এনসিপির স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি কাজ করছে। এনসিপির একাধিক নেতা বলেন, ইতোমধ্যে একশটি পৌরসভা ও উপজেলায় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। আরো একশ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছে এনসিপি। উপজেলা ও পৌরসভার প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রার্থীদের নাম কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হবে না, বলেন তারা। উপজেলা ও পৌরসভা মিলিয়ে অন্তত চারশ জায়গায় প্রার্থী দেওয়ার কথা বলছে এনসিপি।
রাজধানীর বাংলামোটরে গেল ১০ মে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থী ঘোষণা করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। রাজধানীর বাংলামোটরে গেল ১০ মে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থী ঘোষণা করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্তর ‘রাজনৈতিক পর্ষদ’ এর সদস্য আকরাম হোসাইন বলেন, ‘আমরাও একাই নির্বাচন করব।’ তিনি বলেন, ‘সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেবেন এনসিপি সমর্থিত প্রার্থীরা। আমাদের এখন প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। সারাদেশে চলমান পদযাত্রার মাধ্যমেও প্রার্থীদের পরিচিত করাচ্ছি।’ এনসিপি এরইমধ্যে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জুলাইয়ের কর্মসূচি শেষে বাকিদের নামও পর্যায়ক্রমে সামনে আনবে তারা। দলের কেন্দ্রীয় একজন নেতা বলছেন, এনসিপি কয়েক ধরনের প্রার্থীর খোঁজে রয়েছে। ‘মধ্যবয়সি বা তার চেয়ে কিছু বেশি বয়সি আর সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা মজবুত, তা বিবেচনা করা হচ্ছে,’ বলছিলেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দলে পদবঞ্চিত, নির্বাচন করার মতো সক্ষমতা আছে, তাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।’
কী করবে বামপন্থি দলগুলো: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদসহ বামপন্থি দলগুলোও তাদের তৃণমূল নেতৃত্বকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছে।
সিপিবির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বলছেন, ‘স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হোক, আমরা অবশ্যই অংশ নেব।’ স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ কীভাবে হবে সেই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘সংবিধানে স্থানীয় সরকারের কথা আছে। কিন্তু স্থানীয় এমপি বা ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা যেভাবে মাতবরি করে, তাতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হয় না।’ সিপিবির এই নেতার পরামর্শ, নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে আলোচনা করতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচনে টাকার লড়াই, পেশিশক্তির ব্যবহারসহ নির্বাচনবিরোধী কার্যক্রম বন্ধে যা যা দরকার, তার ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনকে করতে হবে, বলেন তিনি। ইউনিয়ন পর্যায়ে এককভাবে ভোট করার কথা বললেও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঐক্যবদ্ধভাবে করার পক্ষে তারা। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরও সময় প্রয়োজন বলে মনে করেন সিপিবি ও বাসদসহ ছয় দলের বামজোটের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ।
আলোচনায় আওয়ামী লীগ : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতারা অংশ নিতে পারবেন কিনা, এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। এ প্রশ্নে গেল ৯ জুন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন যেহেতু নির্দলীয় প্রতীকে হয়, নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করলে আওয়ামী লীগসহ যে কোনো দলের যে কেউ তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, এখানে কোনো বাধা তিনি দেখছেন না। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ গত সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির নেতাকর্মীরা অংশ নিতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল উপদেষ্টার সামনে। জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো রকম কোনো সমস্যা নেই। মানে একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগের...কারণ এটা নির্দলীয়, এখানে কেউই দলের কথা বলবেন না। ‘একজন নির্দলীয় ব্যক্তি আসলেন কিন্তু তিনি তার ক্যাম্পেইনে আওয়ামী লীগ বা তাদের যা যা বলার সেগুলো বললেন- সেটা প্রবলেম হবে। এর বাইরে নির্দলীয় ব্যক্তি, তার যে ক্রাইটেরিয়া আছে নির্বাচনটা করার জন্য, সেটা যদি তিনি ফুলফিল করতে পারেন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন। নিশ্চয় পারেন।’ যদি নির্বাচনে আসা কারো আওয়ামী লীগের পদণ্ডপদবি থাকে, তাহলে কী হবে? এই প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী লীগের পোস্ট পজিশন... আসলে যেটা হয় আরকি, সংগঠনের কর্মসূচি যেহেতু নিষিদ্ধ আছে, এই পোস্ট পজিশন তিনি তো আসলে ব্যবহার করছেন না, তিনি করতে পারেন না। ‘ব্যক্তি হিসেবে যে কেউ যদি ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করতে পারেন, তিনি যদি মনে করেন নির্বাচন করবেন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন। সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ নেই এই ব্যাপারে।’ তবে সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করতে জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে প্রস্তাব দেওয়ার খবর সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। কার্যাক্রম নিষিদ্ধ কেনো রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতা বা সক্রিয় কর্মীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিতে যুক্ত করার কথা বলেছে তারা।
সিদ্ধান্ত নেয়নি জাতীয় পার্টি : জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এখনও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। দলের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর আমাদের আস্থা নেই।’ জিএম কাদের বলছেন, তারা দলের ফোরামে আলাপ-আলোচনা করে সংবাদমাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘কেমন নির্বাচন হবে, এটা এখনও বুঝতে পারছি না। আমরা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব।’
