উচ্চ আদালতের পদক্ষেপে পরিবেশগত ন্যায়বিচারে দৃষ্টান্ত
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

নদী দখল, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, বায়ু ও শব্দদূষণ কিংবা অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের বিচারিক পদক্ষেপে পরিবেশগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় ও নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গাছ কাটতে লাগবে অনুমতি : ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট এক রায়ে ঢাকা শহরসহ অন্যান্য জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে গাছ কাটার ক্ষেত্রে অনুমতি নিতে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। রায়ে হাইকোর্ট বলেন, কমিটির অনুমতি ছাড়া ঢাকা শহরসহ অন্যান্য জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে গাছ কাটা যাবে না। তবে গ্রামাঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাছ কাটার বিষয়টি এর আওতায় আসবে না।
নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা : ২০১৯ সালে হাইকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে বাংলাদেশের সকল নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা ‘লিভিং এনটিটি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর আইনি অভিভাবক ঘোষণা করে নদী দূষণ ও দখল রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ : দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবেশ ধ্বংস করে নির্বিচারে পাহাড় কাটা বন্ধে একাধিক আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় পাহাড় কাটা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে আরেক আদেশে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুরে পাহাড় কাটা এবং কুমিল্লার লালমাই পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এছাড়া ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
বায়ু দূষণ রোধে নির্দেশনা : রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ রোধে ৯ দফা নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনাগুলো হলো- ১. ঢাকা শহরের মধ্যে বালি বা মাটি বহনকারী ট্রাকগুলোকে বালি বা মাটি ঢেকে পরিবহন করতে হবে। ২. যেসব জায়গায় নির্মাণকাজ চলছে সেসব জায়গার নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখতে হবে।
৩. ঢাকার সড়কগুলোতে পানি ছিটানোর যে নির্দেশ ছিল, সে নির্দেশ অনুযায়ী যেসব জায়গায় পানি ছিটানো হচ্ছে না, সেসব এলাকায় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. সড়কের মেগা প্রজেক্টের নির্মাণকাজ এবং কার্পেটিংয়ের যেসব কাজ চলছে, যেসব কাজ যেন আইন-কানুন এবং চুক্তির টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন মেনে করা হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. যেসব গাড়ি কালো ধোঁয়া ছাড়ে সেগুলো জব্দ করতে হবে।
৬. সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির ইকোনমিক লাইফ নির্ধারণ এবং যেসব গাড়ি পুরাতন হয়ে গেছে, সেগুলো চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।
৭. যেসব ইটভাটা লাইসেন্সবিহীনভাবে চলছে, সেগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনও বন্ধ করা হয়নি, সেগুলো বন্ধ করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
৮. পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া টায়ার পোড়ানো এবং ব্যাটারি রিসাইকিলিং বন্ধ করতে হবে।
৯. মার্কেট এবং দোকানের বর্জ্য প্যাকেট করে রাখতে হবে এবং মার্কেট ও দোকান বন্ধের পরে সিটি করপোরেশনকে ওই বর্জ্য অপসারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তর : বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি-বেলা’র আনা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০০৯ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত রক্ষা : কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২০২২ সালের ৯ নভেম্বর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তার আগে হাইকোর্ট ২০১১ সালের ৭ জুন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ঝিলোঞ্জা, সুগন্ধা ও লাবনী পয়েন্ট এলাকা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন।
সুন্দরবন বাংলাদেশের ফুসফুস : ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট এক রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট সুন্দরবনকে দেশের ফুসফুস উল্লেখ করে বলেন, অ্যামাজন যেমন পৃথিবীর ফুসফুস। ঠিক তেমনই সুন্দরবন আমাদের ফুসফুস।
অন্যদিকে ২০২১ সালে দেওয়া এক রায়ে হাইকোর্ট বলেন, কোনো অবস্থাতেই সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত এলাকার খালের ভেতরে কোনো ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলার চলাচল করা যাবে না। কাঁকড়া জেলেরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সুন্দরবনের সংশ্লিষ্ট স্টেশন অফিসে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব দিয়ে পাস সংগ্রহ করে শুধু বৈঠাচালিত নৌকা এবং দোন দড়ির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ওজনের কাঁকড়া আহরণ করতে পারবেন।
পাস নিয়ে কাঁকড়া আহরণের জন্য সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশের সময় বন বিভাগের স্টেশন অফিস থেকে কঠোরভাবে সংশ্লিষ্ট নৌকা ও নৌকার লোকদের পরীক্ষা করতে হবে। যাতে কোনো প্রকার ‘চারু’ (কাঁকড়া ধরার জন্য বাঁশের শলা দিয়ে নির্মিত চাঁই) এবং ‘বিষ’ কিংবা অন্য কোনো বেআইনি জিনিস বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করাতে না পারে।
অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ : পরিবেশগত ছাড়পত্র, লাইসেন্স না থাকা কিংবা পরিবেশ দূষণের দায়ে বিভিন্ন সময় অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে অসংখ্য অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া, জরিমানা আদায় ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এদিকে দেশের আট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে থাকা অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম যাতে শুরু না হতে পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
