মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মোজাফফর গ্রেপ্তার
২ দিনের রিমান্ড
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মানবতাবিরোধী অপরাধের যে মামলায় কারাগারে আছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে আলোচিত মোজাফফর হোসেনকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল এই অবসরপ্রাপ্ত মেজরকে দুদিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ শুনানি নিয়ে এই আদেশ দিয়েছে। এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখানোর পাশাপাশি তদন্ত সংস্থাকে পরপর দুই দিন বা সুবিধা অনুযায়ী এক এক দিন করে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মোজাফফর হোসেনকে সেনা হেফাজতে রাখার আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
সাবেক সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে চলতি বছরের ২৩ মার্চ গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রথমে তাকে অর্থ আত্মসাৎ ও মানব পাচারের মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হলেও পরে মে মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ফেনীতে হত্যার ঘটনায় এ মামলা ট্রাইব্যুনালে আসে। আর সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। এদিকে গত ১৫ জুলাই রাতে বনানী ডিওএইচএসের এক বাড়ি থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়; পরে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর ব্রিফিংয়ে আসেন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।
ফেনীতে হত্যার ঘটনায় করা মানবতবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফরকে জড়ানোর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে তদন্ত কর্মকর্তা কাজ শুরু করেন। তখন ‘ঝন্ডু’ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র পাওয়া যায়। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, সেই ঝন্ডু আর কেউ নন, তিনি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন।’ তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং মোজাফফরের মধ্যে অনেকবার কথোপকথন হয়েছে।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘আমরা তথ্য পাচ্ছি যে তিনি (মোজাফফর) ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বহুবার পার্শ্ববর্তী দেশে যাতায়াত করেছেন। বাংলাদেশে আত্মগোপনে থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ সরকারের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী যেসব অপরাধ হয়েছে, সেখানে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।’
সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তারের পদ্ধতিগত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে কাউকে সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার করার বিধান নেই। সন্দেহভাজন কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রসিকিউশন একটি ‘মিসকেস’ (বিবিধ মামলা) দায়ের করে। সেই প্রক্রিয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
‘জিজ্ঞাসাবাদের পর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।’ এদিন সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে মোজাফফর হোসেনকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেলের অফিস থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এছাড়া সকালে এ মামলার অপর আসামি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল।
মোজাফফর হোসেনের বর্তমান হেফাজত সম্পর্কে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন এবং সেনা আইনেই তার বিরুদ্ধে অন্য একটি কার্যক্রম চলছে।
‘জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে পুনরায় সেনা হেফাজতেই ফেরত পাঠানো হবে।’
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিলেন তখনকার মেজর মোজাফফর হোসেন। সে সময় তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় পুলিশ যে মামলা করেছিল, তাতে ছয় নম্বর আসামি ছিলেন মেজর মোজাফফর। এজাহারে বলা হয়েছিল, হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রপতির কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালে সিআইডি মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থতা স্বীকার করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন মোজাফফর হোসেন এবং সেনাবাহিনী থেকে তিনি পলাতক ছিলেন। প্রায় ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরদিন তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মোজাফফর হোসেনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য গত মঙ্গলবার আবেদন করেছিল প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনাল সে আবেদন মঞ্জুর করে।
