ঢাকা সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হাসিনাসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

হাসিনাসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

২০১৮ সালে কক্সবাজারের টেকনাফে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ পলাতক আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। একইসঙ্গে এই ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকা তিন আসামিকে এই মামলায় গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখিয়ে আগামী ২৫ অগাস্ট ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেয়। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন-

বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এদিন সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এই অভিযোগ দাখিল করা হয়। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। তিনি এই মামলায় আনা অভিযোগ তুলে ধরার পাশাপাশি ফরমাল চার্জ আমলে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতকদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেন এবং পরবর্তী শুনানির জন্য ২৫ অগাস্ট দিন ধার্য করেছেন। পরে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের কাছে মামলার বিস্তারিত তুলে ধরেন। একরাম হত্যাকে বিগত সরকারের গুম-খুনের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন চিফ প্রসিকিউটর। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আপনারা জানেন তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার, তারা যে মতের মানুষই হোক না কেন, যখনই তাদের মতের বিরুদ্ধে আচরণ করত, তখনই তাদের বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে টার্গেট করে অপহরণ করা হতো। পরবর্তীতে তাদের কাউকে আয়নাঘরে বন্দি করা হতো অথবা ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হতো। এরকমই একটি ঘটনা হচ্ছে আমাদের তৎকালীন কাউন্সিলর একরাম হত্যা মামলা।

একরাম হত্যার বিচারকে ‘বহুল প্রতীক্ষিত’ ও ‘হৃদয়বিদারক’ আখ্যা দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় একরামের মোবাইল ফোন চালু থাকায় পুরো ঘটনার অডিও প্রমাণ হিসেবে রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একরামের মোবাইল ফোনটা সুইচ অন ছিল এবং সেই সুইচ অন থাকা অবস্থায় তার মেয়েরা এবং তার স্ত্রী এই হত্যাকাণ্ডের গুলি, মানে ফায়ারিংয়ের আওয়াজ, তারপরে একরামের সঙ্গে যে কথোপকথন— এগুলো সব শুনতে পাচ্ছিল। এসব নিয়ে তখন কালের কণ্ঠ পত্রিকা একটা নিউজও করেছিল। এই সমস্ত কিছু আলামত হিসেবে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই মামলার মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীসহ বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক প্রমাণের (সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স) ভিত্তিতে এই অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রসিকিউশনের আইনজীবী বলেন, বদির নিখুঁত পরিকল্পনায় (মেটিকুলাস ডিজাইন) এই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি আরও বলেন, আব্দুর রহমান বদি- সেখানকার একজন কুখ্যাত, আমরা সংসদ সদস্য বলতে লজ্জাবোধ করছি, যিনি মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। এই বদির পরিকল্পনায় এই ঘটনাটা ঘটেছিল, কারণ এই একরাম ছিল তার প্রতিপক্ষ।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই বিষয়ে পরবর্তীকালে হয়তো আরও সাক্ষ্য-প্রমাণে আসবে, তখন দেখবেন— যে একরামকে হত্যা করার পর তার সম্পত্তি কিন্তু এই বদি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করেছিল এবং নেপথ্যের নায়ক ছিল সেই আব্দুর রহমান বদি।

আসামি যারা : এই মামলার ১১ জন আসামির তালিকা তুলে ধরেছেন প্রসিকিউশন। তারা হলেন— ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি (তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক) বেনজীর আহমেদ ও সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি। এ ছাড়া সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন— ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম (মিনু), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মীর তাওহীদুর রহমান, কর্নেল (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে) মোহাম্মদ আনোয়ার লতিফ খান (তুষার), মেজর (অব.) রুহুল আমিন (রাজন), স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব (মাহমুদ/রাজু) এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. আশিকুর রহমান (সৈকত)।

এদের মধ্যে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন আবদুর রহমান বদি, আনোয়ার লতিফ ও মাহাবুব আলম। শেখ হাসিনাসহ বাকি আটজন পলাতক রয়েছেন।

সরাসরি গুলি করেন দুজন : সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম জানান, দুজন সরাসরি গুলি করেছিলেন। এ ছাড়া ডিজিএফআইয়ের একজন ইনফর্মারও ছিলেন। সরাসরি কারা গুলি করেছেন, সে বিষয়ে তিনি দুজন সামরিক কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে বলেন, মেজর (অব.) রুহুল আমিন রাজন এবং আরেকজন হচ্ছে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান সৈকত সরাসরি গুলি করেছে। আর মীর তাওহীদসহ অন্যান্য যারা র‌্যাব কর্মকর্তা, তখন ওই জায়গায় তারা উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের তত্ত্বাবধানে, তাদের পরিকল্পনায় ওখানে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর তা ধামাচাপা দিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করেছেন চিফ প্রসিকিউটর।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শুধু তাই না, এই ঘটনার পরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল এবং শেখ হাসিনা এই ঘটনা নিয়ে যাতে আর বাড়াবাড়ি না হয়। সাংবাদিকরা যাতে নিউজ না করে সেই কারণে একরামের স্ত্রীকে শেখ হাসিনা ডেকে নিয়ে এসে তাকে বলেছিলেন যে এটা নিয়ে যাতে আর বাড়াবাড়ি না করে, তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এই কাজে ওবায়দুল কাদেরের যুক্ত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের নিজে এই দায়িত্ব নিয়েছিল এবং ওবায়দুল কাদের এই ঘটনার মধ্যে তার একটা স্বীকারোক্তি আছে।

সাক্ষীরা, বিশেষ করে আমাদের যে একরামের স্ত্রী, তার বক্তব্যের মধ্যে বিস্তারিত ঘটনা আসছে এবং তিনি বলেছেন যে, ওবায়দুল কাদের তাকে নিয়ে এসে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিয়েছে এবং এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই সমস্ত কিছু বিচার-বিশ্লেষণ এবং তদন্ত পর্যালোচনা করে যাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধেই আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের টানা তিনবারের কাউন্সিলর ও উপজেলা যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি একরামুল হক। নিহতের পরপরই স্ত্রী আয়েশা বেগম সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, তার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। সেই সময় নিহত হওয়ার মুহূর্তের একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই অডিওতে একরামুলের মেয়েকে বলতে শোনা যায়, ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে...।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত