রাজধানীতে গ্যাস সংকটে তীব্র দুর্ভোগে গ্রাহক-শিল্প খাত
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

বঙ্গোপসাগরের ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি এখনো পুরোপুরি মেরামত না হওয়ায় দেশজুড়ে চলমান তীব্র গ্যাসসংকট কাটার কোনো লক্ষণ নেই। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় মেরামতকাজ চললেও কবে টার্মিনালটি পুনরায় চালু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি পেট্রোবাংলা বা জ্বালানি মন্ত্রণালয়। ফলে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা ও সিএনজি খাতে ভোগান্তি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ নেমে এসেছে ২ হাজার ২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। অগ্নিকাণ্ডের আগে প্রতিদিন ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হলেও একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ভাসমান টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত করতে কত সময় লাগবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। বিদেশি প্রকৌশলীরা কাজ করছেন এবং অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আরপিজিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আনা বিশেষজ্ঞরা শুক্রবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরীক্ষা করে মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। তবে টার্মিনালটি কবে সচল হবে, সে বিষয়ে তারাও নিশ্চিত নন।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কারিগরি দল কাজ করছে, তবে এখনো টার্মিনাল চালুর উপযোগী অবস্থায় আনা যায়নি। আরও সময় লাগতে পারে। গত মঙ্গলবার এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ছোট একটি অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার স্বার্থে সেটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পেট্রোবাংলা জানায়, এর ফলে প্রতিদিন ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। সূত্র জানায়, টার্মিনালটিতে দুটি বয়লার রয়েছে। আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যটি চালু করা গেলে অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে।
রাজধানীর মগবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, কাফরুল, কলাবাগান, কাজীপাড়া ও পশ্চিম তেজতুরী বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না। কোথাও কোথাও একেবারেই গ্যাস মিলছে না। অনেক পরিবার গভীর রাতে রান্না করছেন। কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন, আবার নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ লাকড়ি দিয়ে মাটির চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক ছোট হোটেলও এলপিজি বা কাঠের চুলায় রান্নার ব্যবস্থা করেছে। গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না।
আবদুল্লাহপুরের একটি সিএনজি স্টেশনের মালিক রেজাবুদ্দৌজা চৌধুরী বলেন, দিনের বেলায় প্রায় কোনো গ্যাসই আসে না। রাতের দিকে অল্প চাপের গ্যাস দিয়ে সীমিত সংখ্যক গাড়িকে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
রাইড শেয়ারিং ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরা জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় আয় কমে যাচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন শিল্পকারখানার বয়লার চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হলেও উৎপাদন না থাকায় লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে। প্রয়োজনে সমুদ্রপথের পরিবর্তে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হতে পারে, এতে ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
অন্যদিকে গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট কমে গেছে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহেও চাপ সৃষ্টি করছে। দেশে বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কয়েক বছর ধরে কমতে থাকায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস খাত সীমিত সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর সেই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার মতে, বিকল্প হিসেবে স্থলভিত্তিক আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল থাকলে বর্তমান সংকট অনেকটাই এড়ানো যেত। এদিকে পেট্রোবাংলা গ্রাহকদের সাময়িক দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে, দেশি ও বিদেশি কারিগরি দল দ্রুততম সময়ে টার্মিনাল সচল করতে নিরলসভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাস গ্যাসের আওতাধীন এলাকায় সব শ্রেণির গ্রাহককে স্বল্পচাপের গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
