এলএনজি টার্মিনাল সচল হতে আরও চার-পাঁচ দিন

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চার দিনের ব্যবধানে দেশের ছয় বিতরণ কোম্পানির দৈনিক গ্যাস বিতরণ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমেছে। এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান টার্মিনালটি (এফএসআরইউ) মেরামত করে আবার চালু করতে আরও চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে। এতে করে রাজধানীসহ দেশজুড়ে গ্যাসের সংকটের ভোগান্তি আরও কয়েকদিন চলবে। যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে স্থানীয় কারিগরি দল গত ২১ জুলাই বন্ধ হয়ে যাওয়া ওই টার্মিনাল মেরামতে কাজ করছে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের স্থাপনাপ্রধান ও উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞরা টার্মিনালটি পরীক্ষা করে মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। প্রাথমিক হিসাবে কাজ শেষ করতে চার থেকে পাঁচ দিন লাগতে পারে। তবে টার্মিনালের কোন অংশে কী সমস্যা হয়েছে, কী কী যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কাজ কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি এই কর্মকর্তা। এদিন তেল ও গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণকারী সংস্থা বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। চলমান মেরামতের কাজ দ্রুত শেষ হওয়ার আশা প্রকাশ করলেও টার্মিনালটি থেকে কবে নাগাদ জাতীয় গ্রিডে আবার গ্যাস সরবরাহ করা শুরু করা যাবে সে বিষয়ে কিছু বলেনি সংস্থাটি।

সমুদ্রপথে আনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে গ্রহণ ও সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেটি আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়। মহেশখালীতে এলএনজি গ্রহণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনাল দুটি থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৯৫ কোটি থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়। এর একটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমেছে। দেশে এলএনজি গ্রহণের বিকল্প অবকাঠামো না থাকায় দুটি এফএসআরইউর একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটেছিল। পেট্রোবাংলার দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ার আগে ১৮ থেকে ২০ জুলাই দেশের ছয় বিতরণ কোম্পানির দৈনিক গ্যাস বিতরণ ছিল মোট ২ হাজার ৫৮৭ থেকে ২ হাজার ৬০৪ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন (২৬০ কোটি ৪৯ লাখ) ঘনফুটের মধ্যে। ২০ জুলাই বিতরণ হয়েছিল ২ হাজার ৫৮৭ মিলিয়ন (২৫৮ কোটি ৭০ লাখ) ঘনফুট। পরদিন তা নেমে আসে ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। পরের দুদিন তা আরও কমে ২৪ জুলাই নেমে আসে ২ হাজার ১৩৫ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। এ হিসাবে ২০ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে দৈনিক গ্যাস বিতরণ কমেছে ৪৫১ দশমিক ৮২ মিলিয়ন বা প্রায় ৪৫ কোটি ১৮ লাখ ঘনফুট। চার দিনের ব্যবধানে বিতরণ কমেছে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ। এই সময়ে দেশি গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট উৎপাদনে বড় পরিবর্তন হয়নি। সাত দিনের প্রতিবেদনে এসব ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬৪৩ থেকে ১ হাজার ৬৫৩ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে ছিল। ফলে মহেশখালীর টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা গেছে।

কারিগরি ত্রুটিতে ২১ জুলাই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধের পর সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য দিয়েছিল জ্বালানি বিভাগও। তিতাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর বাসাবাড়ির রান্নাঘরেও। অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। গভীর রাতে কিছুটা গ্যাস এলেও তা রান্নার জন্য পর্যাপ্ত নয়। গ্রিন রোডের পেছনে নর্থ রোড এলাকার বাসিন্দা সোনিয়া আক্তার বলেন, তাদের বাসায় দুই দিন ধরে দিনের বেলায় গ্যাস প্রায় ছিলই না। রাত ১১টা বা ১২টার পর কিছুটা গ্যাস এলেও চাপ এত কম ছিল যে রান্না করা যায়নি। তিনি বলেন, ইন্ডাকশন চুলায় কোনোভাবে খাবার রান্নার ব্যবস্থা করলেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপ তৈরি হচ্ছে। কিছুক্ষণ ইন্ডাকশন চালালে বাসার বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সকালের নাস্তার জন্য আগের রাতে খাবার তৈরি করে রাখতে হচ্ছে। সকালে ওভেনে গরম করে সন্তানদের খাওয়াচ্ছেন। সোনিয়া বলেন, বাচ্চাদের জন্য স্কুলের টিফিন তৈরি করে দেওয়া যাচ্ছে না। বাইরের খাবার প্রতিদিন দিয়েতো গ্যাস হয়ে যাচ্ছে বাচ্চাদের। শনিবার কিছু গ্যাস এলেও চাপ কেবল খাবার গরম করার মত ছিল; রান্নার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। মিরপুরের সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা লিপি আক্তার বলেন, চার-পাঁচ দিন ধরে তাদের বাসাসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাস নেই। পিয়ারিমুন এলাকার সব বাসাবাড়িতেও একই সমস্যা চলছে।

মিরপুর ১২ নম্বরের বাসিন্দা শরিফা বেগম গ্যাসের চাপ না থাকায় চুলা ব্যবহার বন্ধ রেখেছেন। কখন গ্যাস আসে আর কখন চলে যায়, তার ঠিক না থাকায় তিন বেলার রান্নার জন্য তাকে ইন্ডাকশন চুলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ইন্ডাকশন চুলায় রান্না চালানো গেলেও মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল কত আসবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও শিল্পকারখানাতেও। চাপ কম থাকায় অনেক সিএনজি স্টেশন চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস নিতে পারছে না। কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির আওতাধীন ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে।

পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষনে দেখা গেছে, ২০ জুলাই তিতাসের মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৪৮১ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বিতরণ হয়েছিল। ২৪ জুলাই তা নেমে আসে ১ হাজার ২১০ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ঘনফুটে। চার দিনের ব্যবধানে তিতাসের দৈনিক বিতরণ কমেছে ২৭১ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন বা প্রায় ২৭ কোটি ১৫ লাখ ঘনফুট। এ সময়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস বিতরণ ৯৩৪ দশমিক ২১ মিলিয়ন থেকে নেমে এসেছে ৭০৬ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ এ খাতে দৈনিক প্রায় ২২ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট কম গ্যাস গেছে।

পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে আবাসিক, বাণিজ্যিক, সিএনজি, চা-বাগান, শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ‘নন-বাল্ক’ গ্রাহক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ শ্রেণিতে বিতরণ ১ হাজার ৫০৬ দশমিক ৮২ মিলিয়ন থেকে কমে ১ হাজার ৩০৯ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে। অর্থাৎ নন-বাল্ক গ্রাহকরা দৈনিক প্রায় ১৯ কোটি ৭৬ লাখ ঘনফুট কম গ্যাস পেয়েছেন। বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি হলেও তিতাসের আওতাধীন এলাকায় এর আগেই দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি ছিল। কোম্পানিটির পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেছিলেন, তাদের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে তখনই সরবরাহ ১৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছিল।

পেট্রোবাংলার হিসাবেও ২০ জুলাই তিতাসের মোট বিতরণ ছিল প্রায় ১৪৮ কোটি ১৯ লাখ ঘনফুট। টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর তা আরও প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট কমে যায়। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় ঢাকার অবস্থান শেষের দিকে হওয়ায় রাজধানীতে সংকট তুলনামূলক বেশি বলে তিতাস কর্মকর্তাদের ভাষ্য। এর সঙ্গে পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে কিছু এলাকায় গ্যাস চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে।

তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, লাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেলে পাইপের বাইরের পানি ছিদ্র দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। দৃশ্যমান ছিদ্রগুলো শনাক্ত করে মেরামত করা গেলেও মাটির নিচে থাকা ছিদ্র খুঁজে বের করতে সময় লাগে। সংশ্লিষ্ট লাইন থেকে পানি বের না করা পর্যন্ত ওই এলাকার সরবরাহ স্বাভাবিক হয় না।

ঢাকার পুরোনো নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ বদলে নতুন লাইন বসানো, জিআইএস ম্যাপিং এবং স্বয়ংক্রিয় তদারকির ব্যবস্থা চালুর একটি প্রকল্প নিয়েছিল তিতাস। তবে ব্যয়, অর্থায়ন ও আর্থিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবটি সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠিয়েছে।