পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়ার কিছু নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সাবেক রাষ্ট্রপতি লন্ডনে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন, এমন তথ্য নেই
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিরোধী দল যেসব অভিযোগ তুলেছে তাতে আমলে নেওয়ার মত কোনো বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ। অভ্যুত্থানের পরবর্তী এই পরিস্থিতিতে কোনো দল বা ব্যক্তির প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমরা গণঅভ্যুত্থানের পরে প্রত্যাশা করি রাজনৈতিকভাবে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে। প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা থাকবে। সেটা আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এনসিপি এবং অন্যান্যরা তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উত্থাপন করছেন। সেটা করতে পারে। কিন্তু আমলে নেওয়ার মত কোনো বক্তব্য ওখানে নেই।’ সচিবালয়ে পুলিশের সাহসিকতা ও প্রশংসনীয় কাজের পুরস্কার অনুষ্ঠান শেষে গতকাল রোববার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে শুক্রবার রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
পদত্যাগপত্রে সাহাবুদ্দিন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনির জটিলতায় ভোগার কথা জানিয়েছেন। তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে এবং সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ শনাক্ত হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এসব অসুস্থতার কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না এবং তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন বলে পদত্যাগপত্রে লিখেছেন সাহাবুদ্দিন।
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইনকিলাব মঞ্চ। তবে পদত্যাগের পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথনে এ ধরনের দাবি উড়িয়ে দিয়ে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের কথা সামনে এনেছেন সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দুই ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করা বা না করা কোনো কাজের জন্য তাকে আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা চালু রাখা এবং তাকে গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্য পরোয়ানা জারি করা যাবে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত সাহাবুদ্দিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পুরোটা এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর এই সময়ে তার সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ বিষয়টি উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘তিনি বিধিবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। এখন সেই সময়টায় সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজ পাবেন এবং ফৌজদারি বিষয় কোনো আলাপ আলোচনা করা যায় না। এর বহির্ভূত সময় কেউ যদি কোনো বক্তব্য দিয়ে থাকে সেটা তাদের স্বাধীনতা আছে দিতে পারবে। তবে আমরা আমলে নেওয়ার মত কোনো বিষয় এখানে দেখি না।
“তিনি আইনানুগ যা সুবিধা পাবেন অবশ্যই পাবেন এবং তার প্রটেকশনের জন্য এসএসএফ- পিজিআর সুবিধা পাওয়ার ৬ মাসের বিধান আছে। এছাড়া পুলিশ এবং অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে তার নিরাপত্তার বিষয় গ্রহণ করা হবে।’ এদিকে গত মে মাসে অনুষ্ঠিত পুলিশ সপ্তাহের পদক দেওয়ার আগ মুহূর্তে বাতিল করা হলো এখনো তা দেওয়া হয়নি
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশ সপ্তাহে পুলিশ পদকের যে তালিকাটা খুব তাড়াহুড়া করে করা হয়েছিল। সেই তালিকা পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখি কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। সাথে কিছু অনিয়মের ধরা পড়েছে।’ যাচাই-বাছাই করে সেটা ‘বিশুদ্ধ করে’ দ্রুততার সময়ে পদক প্রদান করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া ‘তিন নেতা যদি একসাথে হয় তাহলে এ সরকার এক সপ্তাহ টিকবে না’ এলডিপি সভাপতি অলি আহমেদের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘উনার বক্তব্য এক সপ্তাহ পর কি দেয় অপেক্ষা করি।’
সাবেক রাষ্ট্রপতি লন্ডনে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন, এমন তথ্য নেই : সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিষয়টি পত্রিকায় দেখেছেন। তবে সরকারের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। গতকাল রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সভাকক্ষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। ইন্টারনেটের এই যুগে কথা বলতে চাইলে লন্ডনে যেতে হয় না, এখান থেকেই বলা যায় বলে জানান তিনি।
লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে পলাতক শেখ হাসিনার সঙ্গে মো. সাহাবুদ্দিন ফোনে আলাপ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা তিনি পত্রিকায় দেখেছেন। কী তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কোনো পত্রিকা এমন একটি সংবাদ দিল, সেটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। সরকারের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই বলেও জানান মন্ত্রী।
বিরোধী দল মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছেন। এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীপক্ষকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তারা রাষ্ট্রপতির গ্রেপ্তার চায়। এখন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যাঁরা গালি দিচ্ছেন, সেই অধিকার তাঁদের আছে।’ গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকভাবে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে বলে প্রত্যাশার কথা জানান মন্ত্রী। প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় স্বৈরাচারের শেষ দিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা এবং বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময়ে তিনি বিধিবিধান ও সংবিধান অনুসারে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজড; তাঁর (ইনডেমনিটি) দায়মুক্তি আছে।
ফৌজদারি অপরাধ বা অন্য বিষয়ে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। এর বাইরে যদি কেউ বক্তব্য দিয়ে থাকেন, সেই স্বাধীনতা তাঁদের আছে। দিতে পারেন। কিন্তু আমলে নেওয়ার মতো কিছু দেখি না।’
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘সেই সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা সেই সময়কার বিষয়। সেটা আইন অনুসারে চলবে।’
মো. সাহাবুদ্দিন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আইন অনুসারে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার, সেটা তিনি পাবেন। তাঁর সুরক্ষার জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টসহ (পিজিআর) অন্যান্য সুবিধা ছয় মাসের জন্য পাবেন। পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তাসুবিধা পাবেন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনার বিষয় জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে সরকার জোর চেষ্টা করছে। তাঁদের রয়্যাল কোর্ট আরও কিছু তথ্য চেয়েছে। সেসব তথ্য পাঠানো হবে।
মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেদিন রথযাত্রা ও উল্টোরথ- দুটি অনুষ্ঠানই অত্যন্ত সুচারুভাবে শেষ হয়েছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে না হয়, সে জন্য সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওই আয়োজনের সঙ্গে বোমা পাওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন না মন্ত্রী।
