২৬ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক
তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আবদুল্লাহ আল মামুন এ রিট দায়ের করেন।
রিটে স্বাস্থ্য সচিব, পরিবেশ সচিব, বাণিজ্য সচিব, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনের ভিত্তি হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, পরীক্ষার জন্য নেওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতেও এ ধরনের কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়, যা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তাদের দাবি, টুথপেস্টে কোনো অবস্থাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা উচিত নয়।
‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন টুথপেস্ট: সায়েন্টিফিক এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি গত রোববার রাজধানীর লালমাটিয়ায় ইএসডিওর কার্যালয়ে প্রকাশ করা হয়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে উৎপাদিত ১৯টি ব্র্যান্ডের মোট ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে উৎপাদিত ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এছাড়া ভারতের পাঁচটি নমুনার একটিতে, থাইল্যান্ডের দুটি নমুনার একটিতে এবং ভিয়েতনামে উৎপাদিত দুটি নমুনার দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষা করা ছয়টি শিশুদের টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে ইএসডিওর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি অ্যাসোসিয়েট ড. ফয়জুন নাহার জানান, খুচরা দোকান, সুপারমার্কেট ও পাইকারি বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজিতে পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা করা নমুনার ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে, আর আটটি নমুনায় শনাক্তযোগ্য মাত্রায় কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় সর্বোচ্চ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে ‘মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেল’ টুথপেস্টে, যেখানে প্রতি ১০০ গ্রামে ৩২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ এই ব্র্যান্ড ব্যবহার করেন বলে জানা গেছে। এছাড়া ‘ক্লোজ আপ রেড হট’ ও ‘ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ’-এ ১৬০টি, ‘কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা (স্ট্রবেরি)’-তে ১৪০টি, ‘সিগন্যাল গ্রিন টি’-তে ১২০টি এবং ‘পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট’ ও ‘হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ার’-এ ১০০টি করে কণা পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ‘সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্ট’-এ ৮০টি, ‘পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্ট’, ‘হোয়াইট প্লাস রেড’, ‘হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ জেল’, ‘সিগন্যাল হোয়াইটেনিং’, ‘মেরিল বেবি (স্ট্রবেরি)’ এবং ‘মেডিপ্লাস টিজিপি ফর্মুলা’-তে ৬০টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এছাড়া আরও কয়েকটি টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ৪০ বা ২০টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। এসবের মধ্যে ‘কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা (স্ট্রবেরি)’, ‘মেরিল বেবি (স্ট্রবেরি)’, ‘মেরিল বেবি (অরেঞ্জ)’ এবং ‘পেপসোডেন্ট কিডস অরেঞ্জ’ শিশুদের জন্য তৈরি টুথপেস্ট। অন্যদিকে গবেষণায় আটটি টুথপেস্টে শনাক্তযোগ্য মাত্রায় কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এগুলো হলো ‘প্যারোডন্ট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার’, ‘জেনফ্রেশ’, ‘প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো)’, ‘সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল’, ‘কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ’, ‘ক্লোজআপ রেড হট জিঙ্ক ফ্রেশ টেকনোলজি’, ‘কোডোমো (অরেঞ্জ)’ এবং ‘কোলগেট অ্যাকটিভ সল্ট’। এর মধ্যে ‘কোডোমো (অরেঞ্জ)’ ও ‘প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো)’ শিশুদের জন্য তৈরি টুথপেস্ট।
টুথপেস্ট থেকে শরীরে ঢুকছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা : বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতেই মিলেছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা। এর মধ্যে শিশুদের জন্য তৈরি ৬টির মধ্যে ৪টি টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) নতুন এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। নতুন করে প্রশ্ন উঠছে সকালে দাঁত মাজতে গিয়ে শরীরে প্রবেশ করা এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা আমাদের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? ইএসডিওর গবেষণায় পরীক্ষা করা টুথপেস্টের ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে পাওয়া গেছে ২০ থেকে ৩২০টি কণা।
সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এটি মূলত দুইভাবে তৈরি হয়। কোনো নির্দিষ্ট পণ্যে ব্যবহারের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে যখন প্লাস্টিককে কণা আকারে তৈরি করা হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক’। অন্যদিকে পানির বোতল, প্যাকেট বা বড় কোনো প্লাস্টিক ক্ষয়ে বা ভেঙে গিয়ে যে ক্ষুদ্র কণা তৈরি হয়, তাকে ‘সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বলা হয়।মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধু সমুদ্র বা মাটিতে সীমাবদ্ধ নেই। পানি, খাবার ও বাতাসের মাধ্যমে মানুষ নিয়মিত এর সংস্পর্শে আসছে। মানুষের রক্ত, ফুসফুস, মস্তিষ্ক এবং গর্ভফুলের (প্লাসেন্টা) মতো সংবেদনশীল অঙ্গেও এসব প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি মিলেছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত দক্ষিণ কোরিয়ার এক গবেষণায় বলা হয়, মানুষ মূলত খাবার, পানি, শ্বাসপ্রশ্বাস ও সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করে। দেশটির ২৪টি পানি শোধনাগারের প্রতি লিটার পানিতে গড়ে শূন্য দশমিক ০৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গিয়েছিল। এমনকি সামুদ্রিক খাবারেও এর উপস্থিতি মিলেছে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। তবে প্রাণী ও কোষের ওপর করা গবেষণায় উদ্বেগজনক কিছু ফল পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ওই গবেষণায় দেখা যায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের পরিপাকতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, হরমোনজনিত, প্রজননতন্ত্র এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় ক্ষতি করতে পারে। এটি পরিপাকতন্ত্রে ক্ষতির পাশাপাশি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
গত বছর জুলাইয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে কয়েকটি গবেষণার ফল তুলে ধরা হয়। ২০২৪ সালে ইতালিতে হওয়া এক গবেষণায় হৃদ্?রোগীদের ঘাড়ের প্রধান রক্তনালিতে (ক্যারোটিড ধমনি) জমা হওয়া চর্বিতে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিকের কণা পাওয়া যায়। যেসব রোগীর রক্তনালিতে প্লাস্টিক কণা ছিল, পরবর্তী প্রায় তিন বছরে তাদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে। তবে শুধু মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণেই এমনটা হয়েছে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় মৃত মানুষের মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে অন্যদের তুলনায় বেশি প্লাস্টিক পাওয়া গেলেও গবেষকেরা স্মৃতিভ্রমের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিককে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেননি।
