ভূমিকম্প মোকাবিলায় জনসচেতনতা জরুরি
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি, দ্রুত জরুরি সাড়া প্রদান এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি ঢাকায় একটি ‘বিশেষ সেল’ গঠন ও ১ লাখ প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক তৈরির সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতি সভায় এসব দিকনির্দেশনা ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন গণমাধ্যমকে এসব তথ্য অবহিত করেন।
উপ-প্রেস সচিব জানান, সভায় মূলত ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি সাড়া প্রদান এবং সরকারের সার্বিক প্রস্তুতি জোরদার করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সভায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কেবল সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করার জোরালো আহ্বান জানানো হয়।
জাতীয় টাস্কফোর্স ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘বিশেষ সেল’ : ভূমিকম্পের মতো দ্রুত ও আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার করতে সভায় একটি ‘জাতীয় টাস্কফোর্স’ গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই টাস্কফোর্স দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি, মহড়া, সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। এর পাশাপাশি, দ্রুত তদারকি এবং কার্যকর সার্বক্ষণিক নজরদারির সুবিধার্থে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) একটি ‘বিশেষ সেল’ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই বিশেষ সেলটি সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, উদ্ধারকারী সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম প্রতিনিয়ত তদারক করবে এবং দুর্যোগের সময় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।
প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক ও আধুনিক সরঞ্জাম : রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা ও উদ্ধারকাজে গতি আনতে ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবীকে প্রস্তুত করার বিশাল কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, ‘এরই মধ্যে ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করা সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক বাছাই ও নিবন্ধনের কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করা হবে।’
তিনি আরও জানান, শুধু স্বেচ্ছাসেবক তালিকাবদ্ধ করাই শেষ কথা নয়; তাদের উদ্ধারকাজে দক্ষ করে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে মানুষকে উদ্ধার করা, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান এবং ত্রাণ বিতরণের মতো স্পর্শকাতর কাজে এই স্বেচ্ছাসেবকরা মূল ভূমিকা পালন করবেন।
স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় ও আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। রানা প্লাজা বা অন্যান্য দুর্যোগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কীভাবে আধুনিক ভারী ও হালকা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং তা সঠিক স্থানে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকায় ‘হিউম্যানিটারিয়ান স্ট্যাগিং এরিয়া’ (এইচএসএ) স্থাপন : জরুরি দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ত্রাণসামগ্রী, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং চিকিৎসাসামগ্রী দ্রুত পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঢাকার মতো যানজটপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরে তা আরও জটিল। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঢাকা শহরে ‘হিউম্যানিটারিয়ান স্ট্যাগিং এরিয়া’ (এইচএসএ) বা বিশেষ লজিস্টিক হাব স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এইচএসএ মূলত এমন একটি কৌশলগত কেন্দ্র বা গুদামজাতকরণ ব্যবস্থা, যেখানে দুর্যোগের আগেই পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ পানি, জরুরি ওষুধ, তাবু ও উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হবে। দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার পরপরই যেন কোনো বিলম্ব ছাড়াই উদ্ধারকারী দল ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করবে এই লজিস্টিক হাব।
সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় ও ব্যাপক জনসচেতনতা : ভূমিকম্প মোকাবিলার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর। সভায় সম্ভাব্য দুর্যোগের সময় সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), উন্নয়ন সহযোগী, ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী ও রেড ক্রিসেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কীভাবে আরও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বলেন, ‘ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে আতঙ্কই অনেক সময় বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি কমাতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি জানান, সভায় দেশের সব পর্যায়ে- বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পোশাক কারখানা ও বহুতল ভবনের অধিবাসীদের জন্য নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া এবং সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পোস্টার-লিফলেটের মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
সভায় দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম. ইকবাল হোসেইন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম. এ. মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপস্থিত মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা দুর্যোগ প্রস্তুতি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নিজ নিজ বিভাগের পরিকল্পনা ও সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেন যে, গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো যেন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে অনতিবিলম্বে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু করা হয়। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোধ করা সম্ভব নয়, তবে সঠিক প্রস্তুতি, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন- সাধারণ মানুষের সচেতনতাই পারে এর ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভাটি বাংলাদেশের দুর্যোগব্যবস্থাপনা নীতিতে এক নতুন গতি আনবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
