দেশে অপরাধের নব্বই শতাংশের উৎস মাদক

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

আধুনিক সিঙ্গাপুরের স্থপতি লি কুয়ান ইউ অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে অনুধাবন করেছিলেন- ‘মাদক হলো সব অপরাধের।’ এই এক বাক্যের গভীর উপলব্ধি থেকে ১৯৭৩ সালে সিঙ্গাপুরে প্রণীত হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘মিউজিস অব ড্রাগস অ্যাক্ট’। এই আইনের অধীনে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মাদক চোরাচালানের অপরাধে কঠোর মৃত্যুদণ্ড এবং দেশটির কেন্দ্রীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সেন্ট্রাল নারকোটিকস ব্যুরোকে (সিএনবি) সীমাহীন ক্ষমতা প্রদান করা হয়। লি কুয়ানের এই আপসহীন ‘শূন্য সহনশীলতা’ বা জিরো-টলারেন্স নীতির ফলেই সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ, সুশাসিত ও মাদকমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

শুধু সিঙ্গাপুরই নয়; মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া কিংবা সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে মাদক পাচার বা বিক্রির অপরাধে মৃত্যুদণ্ড, প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত এবং দীর্ঘমেয়াদী কঠোর কারাদণ্ডের বিধান প্রয়োগ করা হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে ‘এক নম্বর গণশত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করে বিশ্বব্যাপী এর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়ার সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। অন্যদিকে, ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে তার অতি-কঠোর ও বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মুখোমুখি হলেও, তার দেশের সাধারণ মানুষ আজও ফিলিপাইনকে মাদকের ভয়াল বিস্তার থেকে রক্ষা করার জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশ্বের যেসব দেশ মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে পেরেছে, তাদের মূল চাবিকাঠি ছিল আইনের সমান, কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ।

বাংলাদেশে মাদকের করাল গ্রাস ও অপরাধের মানচিত্র

বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যথাযথ প্রয়োগ, তদারকি ও সদিচ্ছার অভাবে দেশটি যেন মাদক কারবারিদের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আজ শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিক- সব বয়সের মানুষই মাদকের মরণ ছোবলে আক্রান্ত। পরিসংখ্যান ও অপরাধ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক আতঙ্কজনক চিত্র: বাংলাদেশে সংঘটিত মোট অপরাধের প্রায় ৯০ শতাংশেরই প্রধান অনুঘটক বা মূল উৎস এই মাদক। দেশে ক্রমবর্ধমান কিশোর গ্যাং কালচার, নৃশংস হত্যা, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ছিনতাই, ডাকাতি এবং অবৈধ অস্ত্রের অবাধ কারবারের নেপথ্যে কাজ করছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের অশুভ ছায়াতলেই বিস্তার লাভ করছে সীমান্ত অতিক্রমী চোরাচালান ও আন্তর্জাতিক মানব পাচারের মতো ভয়াবহ সব অপরাধ।

বর্তমান সরকারের চিরুনি অভিযান ও পরিসংখ্যান

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো-টলারেন্স’ বা কঠোর শূন্য সহনশীল অবস্থান ঘোষণা করেছেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেশব্যাপী বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের এই মাদকবিরোধী পদক্ষেপের সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরেন। তার প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৩০,৭৪৪টি সমন্বিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৯,৬৮৫ জন চিহ্নিত চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মোট ৯,২৫১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে জানা যায়, বর্তমানে ২৯২ জন মূল গডফাদারসহ ৪,০০০ শীর্ষ মাদক কারবারির একটি চূড়ান্ত সমন্বিত তালিকা তৈরি করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞদের মনে সংশয় কাটেনি; কারণ এর আগেও ২০২৩ সালে মহামান্য হাইকোর্টের সরাসরি নির্দেশের পর ৩,০০০ মাদক কারবারির একটি তালিকা তৈরি করা হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

নতুন প্রজন্মের মরণঘাতী ‘সিনথেটিক মাদক’

সরকারি কড়াকড়ি ও চিরুনি অভিযানের মুখেই গত ২২ জুন বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে এক নতুন ও মারাত্মক উদ্বেগের চিত্র- ‘নতুন মাদকের নীরব বিস্তার’। ঐতিহ্যবাহী ও প্রচলিত মাদক ইয়াবা, ফেনসিডিল, কিংবা গাজার স্থান দখল করে নিচ্ছে মারাত্মক সব কৃত্রিম বা সিনথেটিক ড্রাগস। বর্তমানে দেশে গোপনে ছড়িয়ে পড়েছে এমডিএমবি, ক্রিস্টাল আইস, এলএসডি, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, ম্যাজিক মাশরুম, কুশ এবং ট্যাপেন্টাডলের মতো মারাত্মক মরণঘাতী মাদক। এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কেমিক্যাল ড্রাগগুলো দেশের তরুণ ও সম্ভাবনাময় প্রজন্মকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রয়োগহীন আইন ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা

বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে মূল প্রতিবন্ধকতা দুটি— ত্রুটিপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রপ্রশয়। মাদক চোরাচালান ও বিক্রির জন্য আইনে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ বা দৃশ্যমান উদাহরণ নেই বললেই চলে। পুলিশ বাহিনীর দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন, প্রয়োজনীয় সাক্ষীর অভাব এবং তথ্যপ্রমাণের গলদের সুযোগ নিয়ে চিহ্নিত অপরাধীরা খুব সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় পুরোনো অপরাধ সাম্রাজ্যে ফিরে যায়।

এর চেয়েও নির্মম বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। অতীতে চিহ্নিত মাদক কারবারি ও গডফাদারদের জাতীয় সংসদে বসে আইন প্রণয়নের মতো পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই গডফাদাররা খোলস বদলে নতুন ক্ষমতাসীন দলের ছায়াতলে চলে যায়, যার ফলে তাদের গায়ে কখনও আইনের আঁচ লাগে না।

মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ

মাদকের এই অভিশাপ থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশকে এখনই কিছু বাস্তবমুখী, সাহসী ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে:

বাধ্যতামূলক ডোপ টেস্ট: শুধু গাড়িচালকদের মধ্যেই ডোপ টেস্ট সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সরকারি ও বেসরকারি চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং বিশেষ করে প্রতি বছর সব সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য নিয়মিত ডোপ টেস্ট আইনত বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সর্বদলীয় রাজনৈতিক অঙ্গীকার: দেশের সব রাজনৈতিক দলকে এক টেবিলে বসে সর্বসম্মত অঙ্গীকার করতে হবে যে, কোনো চিহ্নিত মাদক কারবারি বা গডফাদারকে কোনো রাজনৈতিক দলে আশ্রয়, পদণ্ডপদবি বা পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হবে না।

বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও দ্রুত বিচার: মাদকসংক্রান্ত স্পর্শকাতর মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়ায় সাক্ষীদের সর্বাত্মক সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিরোধ: পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পর্যায় থেকে মাদকের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সচেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি যুবসমাজকে খেলাধুলা ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে।

সীমান্তে নিচ্ছদ্র নজরদারি: আধুনিক প্রযুক্তি ও সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশপথ সম্পূর্ণ সিলগালা করতে হবে।

মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ বর্তমান সরকারের জন্য একটি ‘অ্যাসিড টেস্ট’ বা অস্তিত্ব রক্ষার অগ্নিপরীক্ষা। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলকে সব রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে এক হয়ে কাজ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে মুক্ত করা না যায়, তবে দেশের কোনো টেকসই অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোগত উন্নয়নই সার্থক হবে না। এই অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে বাংলাদেশের সামনে বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই।