বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশ
* দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা ও ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি সংশোধন * ওষুধ, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে সহায়তার নতুন দিগন্ত * ২৫টি শীর্ষ মার্কিন কোম্পানির প্রতিনিধিদল আসছে ঢাকায়
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে এবং দেশটি এখন যেকোনো ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত-এমনটাই বার্তা দিয়েছেন সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। মার্কিন সরকারের এ অবস্থানের প্রতিধ্বনি ঘটিয়ে বাংলাদেশে বিপুল মার্কিন বিনিয়োগের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। এই বাস্তবতার ইতিবাচক প্রতিফলন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য তাদের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি সংশোধন করেছে, যা বিশ্বজুড়ে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে এক ইতিবাচক ও শক্তিশালী বার্তা পৌঁছাবে।
গতকাল শনিবার সকালে তেজগাঁওস্থ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের সৌজন্য সাক্ষাৎকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গর এসব কথা বলেন। বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন মার্কিন প্রতিনিধিদল এবং দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত আলোচনার বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা ও ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি সংশোধন : প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এবং বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ দূত সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, নতুন নির্বাচিত সরকারের সুদৃঢ় পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন বিশেষ দূত জানান, বাংলাদেশে ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও পরিবেশ তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের ভ্রমণ সতর্কতা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি ইতিবাচকভাবে সংশোধন করেছে।
সার্জিও গর জোর দিয়ে বলেন, ট্রাভেল অ্যাডভাইজরির এই পরিবর্তন মার্কিন ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট খাতের কাছে একটি পরিষ্কার সংকেত দেবে যে, বাংলাদেশ এখন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচনের জন্য প্রস্তুত। বৈঠকে আগামী মাসে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের গৃহীত নীতি ও পদক্ষেপ বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি শিথিল হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য শতভাগ নিরাপদ।’
ওষুধ, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে সহায়তার নতুন দিগন্ত : বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতে আলোচনার ঝড় ওঠে:
এফডিএ ও মান নিয়ন্ত্রণ: যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসনের (FDA) সঙ্গে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে কথা বলেন দুই নেতা। মার্কিন বিশেষ দূত আশ্বাস দেন যে, বাংলাদেশে এফডিএ-এর মান যাচাই ও পরীক্ষাকার্য পুনরায় চালু করতে তিনি ব্যক্তিপর্যায়ে তদারকি ও সহায়তা করবেন।
ডিএফসি বিনিয়োগ : যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন কর্পোরেশনের (DFC) মাধ্যমে বাংলাদেশে বৃহৎ অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়। বাংলাদেশে ডিএফসির বিনিয়োগ সহযোগিতা সহজ ও সম্প্রসারিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
ইউএস ইনভেস্টমেন্ট সামিট: মার্কিন বিনিয়োগকারীরা খুব শিগগিরই ঢাকায় একটি বড় মাপের ‘ইউএস ইনভেস্টমেন্ট সামিট’ আয়োজন করতে চরম আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সার্জিও গর জানান, তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে এই অর্থনৈতিক সামিট বাস্তবায়নে কাজ করছেন।
কৃষি ও সাপ্লাই চেইন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের কৃষি খাতের আধুনিকায়নে ওয়্যারহাউজিং, সয়াবিন, তুলা, গমসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যে মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এসব খাতে বিদেশি টেকনোলজি ও পুঁজি এলে একটি আন্তর্জাতিক মানের, শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও ‘প্যাক্স সিলিকা’: বাংলাদেশের উদীয়মান তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাত নিয়ে বিশেষ আগ্রহের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। মার্কিন বিশেষ দূত এই খাতের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে আইটি খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ফ্রেমওয়ার্ক ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগের অংশীদার করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাজ করবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
রোহিঙ্গা সংকট, টেকসই সমাধানের তাগিদ : দ্বিপাক্ষিক আলোচনার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট। সার্জিও গর আগের দিন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া এবং বছরের পর বছর ধরে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকার ও এ দেশের আপামর সাধারণ মানুষের মানবিকতার প্রশংসা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে যে মানবিক সহায়তা আসে, তার অর্ধেকেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল থেকে। এই অসামান্য সহায়তার জন্য তিনি মার্কিন সরকার ও সে দেশের জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এর জবাবে মার্কিন বিশেষ দূত বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একটি দ্রুত, স্থায়ী ও রাজনৈতিক সমাধান অত্যন্ত জরুরি। শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি আসিয়ান (ASEAN) জোট এবং প্রতিবেশী দেশগুলোসহ সব আন্তর্জাতিক পক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেন।
২৫টি শীর্ষ মার্কিন কোম্পানির প্রতিনিধিদল আসছে ঢাকায় : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কোম্পানির প্রায় ৪৫ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধি বাংলাদেশ সফরে আসছেন। মাহদী আমিন বলেন, ‘এই সফরটি বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বহুগুণ বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিনিধিদল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, নীতি-নির্ধারক ও বাণিজ্য সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন। সফরকালে তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হবেন।’ তিনি আরও জানান, বিগত পাঁচ মাসে বর্তমান নির্বাচিত সরকার যেসব বাণিজ্যবান্ধব নীতি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে, মার্কিন সরকার ও সেখানকার কর্পোরেট খাত তাকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। গ্লোবাল ইনভেস্টরদের কাছে বাংলাদেশের এই মর্যাদা বৃদ্ধি দেশে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি অবদান রাখবে।
দেশীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক : মার্কিন বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠকের পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের স্থানীয় বিজনেস কমিউনিটির প্রথম সারির উদ্যোক্তা, শিল্পপতি ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠকে বসেন। বৈঠকে অর্থ, বাণিজ্য ও জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত স্বৈরাচারী শাসনের কারণে দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে যে চরম বিশৃঙ্খলা ও জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান বিএনপি সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। বৈঠকে স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা দেশের সার্বিক শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি দূর করা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর ও শুল্ক কাঠামো সংস্কার এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (যেমন BEZA ও BEPZA) বিনিয়োগের লালফিতার দৌরাত্ম্য বা প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের জোর দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্রো-বিজনেস’ (ব্যবসাবান্ধব) ও ‘প্রো-ইনভেস্টমেন্ট’ (বিনিয়োগবান্ধব) পরিবেশ তৈরি করার দৃঢ় আশ্বাস দেন।
ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে দ্রুততর, সহজ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সকল সমুদ্র ও স্থলবন্দরে কমার্শিয়াল অ্যাক্টিভিটি সচল রাখতে ২৪ ঘণ্টা (২৪/৭) নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে দ্রুত প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করেন।
‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ : সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন পুনর্ব্যক্ত করেন যে, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো দেশের বিশাল ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা তরুণ জনশক্তিকে প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ ও আত্মকর্মসংস্থানে উপযোগী করে গড়ে তোলা। তিনি সরকারের মূল নীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’- এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করেই বর্তমান সরকার একগুচ্ছ জনবান্ধব বাজেট ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করছে। দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমেই দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হবে।
