এলএনজি সরবরাহ শুরু স্বাভাবিক হচ্ছে গ্যাস-বিদ্যুৎ

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রান্নাঘরের চুলা জ্বালানোর লড়াই আর তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের হাঁসফাঁস অবস্থা থেকে অবশেষে মিলতে চলেছে মুক্তির স্বস্তি। গত দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষকে চরম দুর্ভোগে ফেলে সচল হওয়া মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক পশলা বৃষ্টির মতো। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর ৩টা ১০ মিনিট থেকে এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে মোট এলএনজি সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬২ এমএমএসসিএফডি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের পরিমাণ আরো বাড়বে। আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারে। এতে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর প্রাথমিক অবস্থায় টার্মিনালটি থেকে ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে মোট এলএনজির সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬২ মিলিয়ন ঘনফুট। সংশ্লিষ্টদের আশা, বিকেল নাগাদ সরবরাহ আরও বৃদ্ধি পেয়ে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হতে পারে। তবে টার্মিনালটি তার পূর্ণ সক্ষমতা অর্থাৎ দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের স্তরে পৌঁছাতে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগবে। পুরোপুরি সচল হলে দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যেভাবে ঘটেছিল দুর্ঘটনা ও পেছনের প্রেক্ষাপট : কক্সবাজারের মহেশখালীর সাগরে থাকা এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল জাহাজটির নাম ‘এক্সিলেন্স’। ২০০৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্মিত ২১ বছরের পুরনো এই ভাসমান জাহাজটি ২০১৮ সালে দেশের প্রথম এলএনজি টার্মিনাল হিসেবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছিল। তবে যাত্রা শুরুর পর এটি বিভিন্ন সময়ে পাঁচবার বন্ধ হওয়ার রেকর্ড গড়ে, যা এর বয়সজনিত কারিগরি দুর্বলতার কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। গত ২১ জুলাই জাহাজ থেকে ভাসমান টার্মিনালে এলএনজি সরবরাহ করার সময় হঠাৎ এর বয়লারে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও ক্রুদের দ্রুত পদক্ষেপে ১০ মিনিটের মধ্যেই এলএনজি বহনকারী জাহাজটিকে ভাসমান টার্মিনাল থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। ফলে বড় ধরনের এক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায় পুরো স্থাপনাটি। তবে এই আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ফলে টার্মিনালটির গ্যাস সরবরাহ অনির্দিষ্টকালের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষজ্ঞ আমেরিকান প্রকৌশলীদের উড়িয়ে এনে দীর্ঘ ১৫ দিনের নিবিড় চেষ্টার পর অবশেষে এটিকে সচল করা সম্ভব হলো।

জনজীবনে দুর্ভোগ ও বহুমুখী প্রভাব : এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর দেশের আমদানি করা এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এর ফলে বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক খাতে ভয়াবহ ধস নামে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের তীব্র চাপ সংকট দেখা দেওয়ায় আবাসিক গ্রাহকরা চরম বিপাকে পড়েন। দিনের বেশিরভাগ সময় চুলার আগুন না জ্বলায় সাধারণ মানুষকে বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা, রাইস কুকার ব্যবহার করতে হয়েছে কিংবা হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হয়েছে। গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে চালকদের, অনেক স্থানে স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলস্বরূপ, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেড়ে যায় অসহনীয় লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বাস্তবতা : ঘটনার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছিলেন, বয়লার বিস্ফোরণের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য যন্ত্রাংশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত পূর্বভিজ্ঞতা এক্সিলারেট, সামিট কিংবা বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ছিল না, যা তাদের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।

এদিকে, পাশে থাকা দেশীয় সামিট গ্রুপের অপর এলএনজি টার্মিনালটির দৈনিক রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও, এক্সিলারেট বন্ধ থাকায় সেটির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৪৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে কোনোমতে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও ঘাটতি থেকে যাওয়ায় পুরো দেশে ত্রাহি অবস্থা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে তিতাস গ্যাসসহ অন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোর আওতাধীন অঞ্চলে গ্যাসের চাপ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। আগামী ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে এলে রান্নাঘর থেকে শুরু করে কলকারখানা ও বিদ্যুৎ খাতে চিরতরে এই সংকট দূর হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।