শুক্রবারের বিশেষ খবর

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করেও থামেনি মিজানের সবুজ অভিযাত্রা

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি গভীর ভালোবাসা নিয়ে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন এস এম মিজান। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কুমিল্লার দাউদকান্দি ও আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের আঙিনা এবং সড়ক-মহাসড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন। পরিবেশ দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ও প্রকৃতি ধ্বংসের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন তিনি। তার লাগানো অসংখ্য গাছ আজ বড় হয়ে ফল, ফুল ও ছায়া দিয়ে মানুষ ও পরিবেশের উপকার করছে। সম্প্রতি ক্যান্সারের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের চিকিৎসা সম্পন্ন করে তিনি চীন থেকে দেশে ফিরেছেন। খুব শিঘ্রই তৃতীয় ধাপের চিকিৎসার জন্য আবারও চীনে যাবেন। তবে এ কঠিন অসুস্থতাও তার বৃক্ষ প্রেম ও পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকারকে থামাতে পারেনি। শারীরিক কষ্টকে জয় করেই তিনি শুরু করেছেন ১০ হাজার গাছের চারা রোপণ কর্মসূচি। দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন দুইবার এভারেস্টজয়ী বাংলাদেশি অভিযাত্রী এম এ মুহিত, ইলিয়টগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আবুল কালাম আজাদ, সহকারী শিক্ষক লোকমান হোসেন ও মঞ্জুরুল ইসলাম, সাংবাদিক শরীফ প্রধান এবং বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ফাউন্ডেশনের সদস্য সোহাগ পাটোয়ারী।

এম এ মুহিত শিক্ষার্থীদের তার এভারেস্ট জয়ের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা শোনান এবং পরিবেশ সংরক্ষণে তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব সম্পর্কে বক্তব্য দেন। তিনি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাদাম ও নিমগাছের চারা রোপণ করেন এবং শিক্ষার্থীদের হাতে বাদাম, কাঁঠাল, নিমসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছের চারা তুলে দেন।

বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে মিজান দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনি নিয়মিত সভা, সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও র‌্যালির আয়োজন করেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করেন। পাশাপাশি মহাসড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ এবং প্লাস্টিক দূষণ রোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরইমধ্যে তিনি দেশের ৪৫টি জেলায় পরিবেশ সচেতনতাবিষয়ক ক্যাম্পেইন করেছেন। এসব কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ফাউন্ডেশন।

স্থানীয়দের মতে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশ ও বৃক্ষরোপণ নিয়ে তার কাজ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগের সঙ্গে লড়াই করেও পরিবেশ রক্ষায় তার নিরলস প্রচেষ্টা সমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

গাছ লাগানোর অভিযান ও পরিবেশ সচেতনতা কার্যক্রম তিনি নিজ গ্রাম থেকেই শুরু করেছেন। লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় তার লাগানো ঔষধি গাছের উপকার ভোগ করছেন অনেকেই। নিজ গ্রামের মসজিদের আঙিনা ও সড়কের পাশে তার লাগানো গাছও দিচ্ছে সবুজ শোভা। তার লাগানো গাছ রয়েছে চান্দিনার কুটুম্বপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ উচ্চ বিদ্যালয়, ড. মোশাররফ ফাউন্ডেশন ডিগ্রি কলেজ, মুরাদনগর উপজেলার গোমতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোমতা ইসহাকিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, লাকসাম ক্রিসেন্ট মডেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় সড়ক, মসজিদ, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের আঙিনা, ঐতিহাসিক স্থাপনা কিংবা হাটবাজারের যেখানেই খালি জায়গা পেয়েছেন, সেখানেই তিনি গাছ লাগিয়েছেন। তার লাগানো গাছ রয়েছে দাউদকান্দির বানিয়াপাড়া মাদ্রাসা ও দরবার শরিফে যাওয়ার পথে, পুটিয়া থেকে আদমপুর যাওয়ার পথে এবং শিসউক অফিস সড়ক, শিসউক অফিস প্রাঙ্গণ, পুটিয়া অপূর্ব ট্যুরিজম পার্ক ও ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ থানা ভবন, ইলিয়টগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইলিয়টগঞ্জ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, লক্ষ্মীপুর বড়বাড়ী মসজিদ, লক্ষ্মীপুর গ্রামের সিনএনবি সড়ক, মোবারকপুর জামে মসজিদ, দাউদকান্দি হাইওয়ে পুলিশ থানা পুরোনো ভবন, নিমসার মাঈন কোচিং সেন্টার, দেবিদ্বার, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার সামাজিক প্রতিষ্ঠানের আঙিনা ও সড়কের পাশে। এস এম মিজান বলেন, পথের পাশে কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় যখন নিজের লাগানো গাছ দেখি, তখন এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যখন সেই গাছের ছায়াতলে বসে গল্প করে, কোনো পথিক গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয় কিংবা দূর থেকে আমার লাগানো কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলে পুরো এলাকা রঙিন হয়ে ওঠে, তখন সত্যিই অনেক আনন্দ লাগে। এসব দৃশ্যই আমাকে আরও বেশি করে গাছ লাগাতে অনুপ্রাণিত করে।