সবার দৃষ্টি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রায় ৩৫ বছর পর আবার রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হতে যাচ্ছে। সংখ্যার হিসাবে ফলাফল অনেকটাই জানা জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিএনপির প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত। তারপরও বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়েছে। এই প্রার্থিতা তাই শুধু ভোটের লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক বার্তা ও কৌশল। এ কারণে সবার দৃষ্টি এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে। গতকাল মঙ্গলবার সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এক প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।

চিফ হুইপ বলেন, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যেহেতু সংশোধিত হয়নি, সুতরাং এটা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কার্যকর হবে।’

৭০ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে তিনি বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে এমপিরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। আগামী ২০ অগাস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। সংরক্ষিত আসনের ৫০ জন নারী এমপিসহ মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য এ নির্বাচনের ভোটার। ক্ষমতাসীন বিএনপির পাশাপাশি ১১ দলীয় জোটেরও এ নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে বিগত দিনের মত একক প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকছে না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটদানের প্রক্রিয়া তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা প্রার্থীর সামনে তার নাম লিখবেন প্রকাশ্যে, বিভক্তি সংখ্যা লিখবেন। কাজেই আমি কাকে ভোট দিচ্ছি তা জানা যাবে।’ এ নির্বাচন সামনে রেখে কোনো বিশেষ অধিবেশন ডাকা হচ্ছে না বলে জানান চিফ হুইপ।

ভোটের দিন সংসদ কক্ষে বৈঠক ডাকবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এই বৈঠকে যার যার আসনে সংসদ সদস্যরা বসবেন। নির্বাচনী কর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন। তফসিল অনুযায়ী বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে। এক ঘণ্টার মধ্যে ভোট শেষ হয়ে গেলে গণনা করে ফল ঘোষণা করা হবে। কোনো ভোটার দেরি করলে ৫টা পর্যন্ত সময় থাকবে। নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ভোট দেওয়ার সময় গণমাধ্যমে দেখানো হবে। পরে সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত সময় ভোট দেবেন। সবাই ভোট দেওয়ার পর গণনা করা হবে।’

এদিন সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা হয়, যেখানে সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। সভায় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং হুইপদের মধ্যে মো. জি কে গউছ, রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া ও এ. বি. এম আশরাফ উদ্দিন নিজান অংশগ্রহণ করেন। কায়সার কামাল বলেন, ‘রাষ্ট্র কাঠামোর সর্বক্ষেত্রে ফ্যাসিস্টমুক্ত করতে হবে। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ।’

সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বিএনপির দলীয় প্রার্থীর বিষয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করবেন; তখন আপনারা আমরা সবাই একসঙ্গে জানব। যেদিন আমাদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে, দাখিলের সময় আমরা সবাই জানবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রার্থী চূড়ান্ত করতে তারেক রহমানকে দায়িত্ব দিয়েছে দল, তিনি প্রার্থী ঘোষণা করবেন। বিরোধী দল থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠায় এ নির্বাচনও হচ্ছে।’

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদকে বেছে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, গণতন্ত্রের জন্য একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন এবং আমরা দেশবাসীকে রাজনৈতিক অবস্থানটাও জানান দিতে চাই।

‘আমাদের যিনি প্রার্থী, তাকে আমরা মনে করছি, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অভিভাবকত্ব হিসেবে তিনি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হবেন।’

‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উচিত ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেহেতু গণভোটের রায়ও সংস্কারের পক্ষে এসেছে, তাই ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যেত। তাহলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আরও বেশি সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হত।

“তারপরেও যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে, এটাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দিতে চাই না। আমরা সে কারণে বিরোধী দলের জায়গা থেকে প্রার্থী দিয়েছি।”

তবে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম দাবি করেন, জুলাই সনদ অনুযায়ীও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে। ৭০ অনুচ্ছেদে অর্থবিল ও আস্থাভোট ছাড়া অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মত দিতে পারবেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া জানালেন ইসি সচিব : আগামী ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে বিরতিহীনভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘২০ আগস্ট বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হবে। কারণ যদি অনির্ধারিত কারণে কোনো সংসদ সদস্য পৌঁছাতে দেরি করেন, সেই সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ রাখা হয়েছে। সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষে নিজ নিজ আসনেই অবস্থান করবেন। নির্বাচন কমিশনের নিযুক্ত কর্মকর্তারা তাদের কাছে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন।’

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ফিরে ইসি সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের কাছে নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

তিনি জানান, প্রতিটি ব্যালট পেপারে দু’টি অংশ থাকবে- মুড়ি অংশ এবং মূল ব্যালট। মুড়ির অংশে প্রার্থীর ক্রমিক নম্বর, ভোটারের নাম, বিভক্তি নম্বর ও স্বাক্ষরের ঘর নির্ধারিত থাকবে। ডানদিকের মূল ব্যালটে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের নাম থাকবে এবং পাশে থাকা ফাঁকা স্থানে ভোটার সংসদ সদস্য তার পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন। ভোটারদের (সংসদ সদস্য) সুবিধার কথা মাথায় রেখে কক্ষে তিনটি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স স্থাপন করা হবে, যার যেকোনো একটিতে তারা ভোট দিতে পারবেন।

আখতার আহমেদ বলেন, ‘বিকেল ৫টায় ভোট গ্রহণ সমাপ্তির পরপরই অধিবেশন কক্ষের ভেতরে রাখা ব্যালট বক্সগুলোর সামনেই সরাসরি ভোট গণনা শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত চার বা পাঁচজনের গঠিত একটি ব্যালট গণক দল ব্যালট পেপার শর্ট আউট করে গণনা কার্যক্রম শেষ করবে। মোট ৩৪৯টি ব্যালটের মধ্যে কতটি বৈধ বা বাতিল হয়েছে এবং কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন, তা নির্বাচনকর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) অধিবেশন কক্ষেই সরাসরি সবার সামনে ঘোষণা করবেন। পরবর্তীতে কমিশন সচিবালয়ে এসে অফিসিয়ালি ফলাফলের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।’

ইসি সচিব জানান, অধিবেশন কক্ষ থেকে ভোটের কার্যক্রমের সরাসরি সম্প্রচার (লাইভ টেলিকাস্ট) করার সুবিধা থাকবে এবং সাংবাদিকদের বসার জন্য নির্ধারিত স্থান রাখা হবে। তিনি আরও বলেন, কমিশনের পক্ষ থেকে আমাদের ২০ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ আইডি কার্ড ইস্যু করা হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে সংসদ ভবনে প্রস্তুতিমূলক সভা : রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রস্তুতিমূলক সভা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের নিচতলায় ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এ সভা শুরু হয়। সভায় সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছেন।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ পরিচালক মনির হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনে এ সভা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এতে সংসদ সচিবালয়ের সচিব থাকছেন। ইসি সচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলও অংশ নিয়েছে।’

এর আগে ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল অনুযায়ী, আগ্রহী প্রার্থীরা ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত।

একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।

সাড়ে তিন দশক পর এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এরই মধ্যে বিরোধীদল জামায়াত তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকলে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট হয়। সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। স্থানীয় সরকার ও সংসদ নির্বাচনে গোপন ব্যালটে ভোট হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হয় প্রকাশ্যে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তার দায়িত্ব পালন করেন। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র নির্বাচন ভবনে সিইসির কাছে জমা দিতে হয়। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত দলীয় প্রার্থীর জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের কার্যক্রম সিইসির কার্যালয়ে সম্পন্ন হয়। একক প্রার্থী থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একাধিক প্রার্থী হলে সংসদ কক্ষে ভোট হয়। এ সময় সহায়ক কর্মকর্তারা নির্বাচনি কর্তাকে ভোটগ্রহণের কাজে সহযোগিতা করেন। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিলে সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। পরে ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি আইনে প্রকাশ্য ভোটের বিধান করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসহ বর্তমানে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।

এর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনসহ বিএনপির সংসদ সদস্য ২৪৭ জন এবং জামায়াতের ৭৭ জন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র ৮ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৮ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের ৩ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ১ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) ১ জন, গণসংহতি আন্দোলনের ১ জন, গণপরিষদের ১ জন, খেলাফত মজলিশের ১ জন এবং জাগপার ১ জন সদস্য রয়েছেন।