বিদ্যুতের অপেক্ষায় নির্ঘুম রাত

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

সকাল ৮টার পর থেকে চুলায় আগুন নেই। দুপুর গড়িয়ে গেলেও রান্না করতে পারেননি শারমিন আক্তার। অপেক্ষা করেছেন গ্যাস আসবে বলে। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের বাসিন্দা শারমিন আক্তারের গতকাল বুধবার সকাল কেটেছে এভাবেই। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে গ্যাস নেই। দুপুরের রান্নাও করতে পারিনি। হঠাৎ আবার এভাবে গ্যাস চলে যাওয়ায় খুব সমস্যায় পড়েছি।’

শুধু শারমিন নন, আবার গ্যাস-সংকটে পড়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। বাসাবাড়ির পাশাপাশি সংকট দেখা দিয়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও। গতকাল বুধবার নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ বলে জানিয়েছেন চালকেরা।

মোহাম্মদ নোমান নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সকাল ৭টায় ষোলোশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নিতে লাইনে দাঁড়ান। বেলা সাড়ে ১১টায়ও তিনি গ্যাস পাননি। পরে প্রথম আলোকে বলেন, নগরের টাইগারপাসসহ কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে ঘুরে গ্যাস পাননি। ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস দিলেও চাপ কম। তাই দেরি হচ্ছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহন লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।

কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) বলছে, গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ কমে গেছে। আজ সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। অথচ চট্টগ্রামে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। সে হিসাবে চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।

কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) বলছে, গত মঙ্গলবার রাত থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ কমে গেছে। আজ সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। অথচ চট্টগ্রামে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। সে হিসাবে চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।

এবার সংকটের কারণ অবশ্য ভিন্ন। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে নয়, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী নতুন জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সরবরাহ কমেছে।

মাত্র কয়েক দিন আগেও গ্যাসের জন্য চট্টগ্রামের ফিলিং স্টেশনগুলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন চালকরা। কেউ গাড়িতে রাত কাটিয়েছেন। কেউ চার থেকে আট ঘণ্টা লাইনে থেকেও গ্যাস পাননি। ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লার চালু হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। ফিলিং স্টেশনগুলোর দীর্ঘলাইনও কমে আসে।

কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হলো না। গতকাল রাত থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার পর আজ আবার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গাড়ির সারি তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় যানবাহনে গ্যাস ভরতেও বেশি সময় লাগছে। বাসাবাড়িতেও এর প্রভাব পড়েছে।

নতুন করে সংকট তৈরির কারণ সম্পর্কে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. শোয়েব বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ মহেশখালীর টার্মিনালে ভিড়তে পারছে না। টার্মিনালে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতির একটি নির্দিষ্টসীমা রয়েছে। বর্তমানে বাতাসের গতি সেই সীমার চেয়ে বেশি।

মো. শোয়েব আরও বলেন, জাহাজ ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতি ২০ নটের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে তা প্রায় ৩৮ নট। ফলে নিরাপত্তার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভেড়ানো যাচ্ছে না।

পেট্রোবাংলার এই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে মহেশখালীর টার্মিনালগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস আসছে। এলএনজিবাহী জাহাজটি ভিড়তে পারলে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৭৫ কোটি ঘনফুটে উঠতে পারে।

এর আগে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের বয়লারে সমস্যা দেখা দেওয়ায় দীর্ঘসময় গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। পরে একটি বয়লার চালু করে আংশিক সরবরাহ শুরু করা হয়। মো. শোয়েব বলেন, বয়লারের সমস্যা এখন আর বর্তমান সংকটের মূল কারণ নয়। নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালে ভেড়ানোর পর সরবরাহ বাড়ানো হবে। এরপর বাকি কাজ করা হবে।

দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে দুটি টার্মিনাল থেকে মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

গত ২১ জুলাই একটি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাবে চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস-সংকট তৈরি হয়েছিল। একপর্যায়ে চট্টগ্রামে দৈনিক সরবরাহ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। পরে টার্মিনালের একটি বয়লার চালু হলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। এখন আবার প্রায় একই পর্যায়ে নেমে আসছে চট্টগ্রামের সরবরাহ।

তবে কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এবার সংকট কাটার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করছে মহেশখালীর আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার ওপর। বাতাসের গতি কমে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভিড়তে পারলেই জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত চট্টগ্রামে চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি নিয়েই সরবরাহ সামাল দিতে হবে।

গরমে অস্থির জনজীবন : গরমে দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ বেড়েছে। অনেক এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে।

সরকারি সংস্থার তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম থাকলেও গ্রামাঞ্চলের চিত্র একেবারেই ভিন্ন।

গ্রামের অনেক এলাকায় টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ আসার কিছুক্ষণ পর আবারও চলে যাচ্ছে। এতে তীব্র গরমের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ঘরে ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাতে না পারায় ভোগান্তিতে পড়ছেন মানুষ।

বিশেষ করে রাতের লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। সারাদিনের প্রচণ্ড গরমের পর রাতে ঘুমানোর সময়ও বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকে ঘরের বাইরে বা খোলা জায়গায় অবস্থান করছেন। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় রাত জেগে থাকতে হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের।

বিদ্যুৎ কখন আসে আর কখন যায় বুঝতে পারি না। এত লোডশেডিং আগে হয় নাই। রাতে ঘুমাতে পারি না। বিদ্যুৎ আসে আর যায়। গরমে খুবই করুণ অবস্থা আমাদের।

দেশের গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে কোনোভাবে সময় পার করা গেলেও রাতে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকায় কষ্ট বেড়ে যায়। তীব্র গরমে শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানোও সম্ভব হচ্ছে না অনেক এলাকায়। ফলে বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি পানির সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে।

রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির দাবি জানিয়েছেন।

মাগুরার বাসিন্দা ইখলাসুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ কখন আসে আর কখন যায় বুঝতে পারি না। এত লোডশেডিং আগে হয়নি। রাতে ঘুমাতে পারি না। বিদ্যুৎ আসে আর যায়। গরমে খুবই করুণ অবস্থা আমাদের।’

বরিশালের আঁখি আক্তার বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে লোডশেডিংয়ে যন্ত্রণায় আছি। আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। সমস্যার সমাধান কবে হবে জানি না।’

গোপালগঞ্জ শহরে তীব্র লোডশেডিংয়ের মধ্যে দিনে-রাতে মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর এসেছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ায় ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) তাদের কার্যালয় ও উপকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ স্থাপনা ও উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশকে চিঠি দিয়েছে।

নীলফামারীর ডোমারে দীর্ঘ ও অনিয়মিত লোডশেডিং নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার পর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডোমার জোনাল অফিস থানায় লিখিত আবেদন করেছে। এতে ডোমার জোনাল অফিস, আন্ধারুর মোড় উপকেন্দ্র এবং চিলাহাটি অভিযোগ কেন্দ্রে রাতের বেলায় নিয়মিত পুলিশ টহল ও নিরাপত্তা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অফিসে সাদা পোশাকে সদস্য মোতায়েন এবং টহল অব্যাহত রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা হচ্ছে- জানতে চাইলে ডোমার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, বিদ্যুৎ অফিসের নিরাপত্তার জন্য সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নীলফামারী জেলার পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ হোসেন খাঁন বলেন, বিদ্যুৎ অফিসে হামলার অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমার এলাকার পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, গতকাল ১১ আগস্ট ডে পিকে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৩৯ দশমিক ৯৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৭৫ দশমিক ৯৫ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা পিকে চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ৫১৯ দশমিক ১৮ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৭০৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট।

১০ আগস্ট ডে পিকে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭৯৬ দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট। সন্ধ্যায় চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ১৫৬ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৩১২ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট।

‘দেউলিয়া’ বিদ্যুৎ সেক্টর সামলাতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার : ৯ আগস্ট ডে পিকে বিদ্যুৎ চাহিদা ১৬ হাজার ৭৯৬ দশমিক ৬৯ মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৬৯ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা পিকে ১৮ হাজার ১৫৬ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৩১২ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট। বিশেষ করে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। সম্প্রতি একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকে, পরে একটি বয়লার চালু হলেও এলএনজি সরবরাহে ভাটা পড়েছে। এতে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা এবং বিভিন্ন কেন্দ্র কারিগরি কারণে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সরবরাহ কমেছে।

এ সমস্যার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকারকে এগোতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো উদ্যোগগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা। অন্যদিকে তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। ফ্যান, এসি, পানি তোলার পাম্পসহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরও বড় হয়েছে।

ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে সব কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না, আর এর প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ সত্য আমরা অস্বীকার করছি না। এই সংকটের দায় এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে নির্বাচিত করেছে। তাই যারা প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভুগছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি।’

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি, প্রতিমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ : তিনি বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, এ সমস্যার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকারকে এগোতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো উদ্যোগগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা।’

আমাদের জ্বালানি সংকটের সমাধানে আরেকটা স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) প্রয়োজন। সরকারকে খুব দ্রুত এটি স্থাপনে পদক্ষেপ নিতে হবে। -বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন

বিদ্যুৎ সংকটের কারণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছি না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারলে বর্তমান সংকট হতো না।’

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। গ্যাস, কয়লা সবকিছুতেই সংকট। সরকার চেষ্টা করছে। আমরা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে পারছি না। তবে আমরা উন্নতি করছি। গতকালের উৎপাদন আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। তবে ঠিক কবে নাগাদ পরিস্থিতি ঠিক হচ্ছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে, শিল্পে সব জায়গায় সংকট। সরকারকে খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশি গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

তিতাসের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চাহিদা ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট, আমরা ২০৪ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো দিতে পারছি। এলএনজি সরবরাহ কম থাকার কারণে আমরা দিতে পারছি না। -তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান।

তিনি বলেন, আমাদের জ্বালানি সংকটের সমাধানে আরেকটা স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) প্রয়োজন। সরকারকে খুব দ্রুত এটি স্থাপনে পদক্ষেপ নিতে হবে। এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ জোর দিতে হবে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চাহিদা ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট, আমরা ২০৪ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো দিতে পারছি। এলএনজি সরবরাহ কম থাকার কারণে আমরা দিতে পারছি না।

৮০ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি : জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘসময় লোডশেডিং প্রেক্ষিতে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের তথ্য তুলে ধরে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে।

এসব সমিতির গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশের মহাপরিদর্শক-আইজিপিকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিটি বুধবার পুলিশের মহাপরিদর্শক-আইজিপির কাছে পাঠানো হয়।

পল্লী বিদ্যুতের একজন কর্মকর্তা চিঠিটি পাঠানোর কথা বলেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বিকালে বলেন, ‘আমরা কিছুক্ষণ আগে চিঠি পেয়েছি। শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ সবসময় সচেষ্ট রয়েছে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’

পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি সংকট ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে সরবরাহ কমেছে। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রামাঞ্চলে অতিরিক্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে এসব এলাকায় ‘জনরোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে’।

কিছু এলাকায় বিদ্যুতের উপকেন্দ্র ও কার্যালয় হামলার শিকার হচ্ছে বলেও চিঠিতে বলা হয়েছে।

পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, দেশের বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ বা প্রায় ৪ কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। জাতীয়ভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের যে বরাদ্দ তারা পায়, সেটিই গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করে।

গত কয়েক দিনে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সম্মিলিত গড় চাহিদা ছিল প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮ ঘণ্টা, ১০ ঘণ্টা এমনকি ১২ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, ‘দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর করছে। এতে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে রয়েছেন।’

এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে আইজিপিকে।

চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, বিদ্যুৎ সচিবের একান্ত সচিব এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবকে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া দেশের সব জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ও জেনারেল ম্যানেজার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ওসিদের কাছেও অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

চলমান বিদ্যুৎ সংকটের জন্য গ্যাসের ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়া গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারে না।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নতুন একটি কৌশলে কাজ শুরু করার কথাও জানান তিনি।

‘আমরা একটা কৌশল নিয়েছি। আমরা সেই কৌশলটা গতকাল সন্ধ্যা থেকে নিয়েছি। আমরা আশা করছি আজকে সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে, ইনশাআল্লাহ।’

সাম্প্রতিক গ্যাস ঘাটতির মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ছে গ্রামাঞ্চলে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বঙ্গোপসাগরের বৈরী পরিস্থিতির কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন এলএনজি খালাস করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দুর্ঘটনার পর এক্সেলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালও এখনও পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এক্সেলারেট টার্মিনাল থেকে আমরা এখনও ফুল ক্যাপাসিটিতে কাজ করতে পারছি না। দেশি উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব না। এটা আপনারা জানেন। একটা দীর্ঘমেয়াদি একটা ব্যাপার।’ গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে মালয়েশিয়ার সঙ্গেও সরকার আলোচনা করছে, বলেন প্রতিমন্ত্রী অমিত।

মালয়েশিয়ায় চিঠি পাঠানোর পর তিনি ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী দেশটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। পরে বাংলাদেশের একটি দল মালয়েশিয়ায় যায়।

‘তার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অফার নিয়ে আমরা কাজ করছি। তার ধারাবাহিকতায় তাদের কাছ থেকে আমরা আশা করছি অ্যাটলিস্ট এক কার্গো এলএনজি আমরা পাব।’

আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আনার বিষয়টিও বিবেচনায় আছে। তবে এ ধরনের বিশেষ ট্যাংক সহজে পাওয়া যায় না বলে এটিকে তাৎক্ষণিক নয়, মধ্যমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখছেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সামাল দিতে সরকার বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিচ্ছে এবং হাতে থাকা সব বিকল্প নিয়ে কাজ করছে।

‘আমাদের হাতে যতগুলো বিকল্প ছিল আমরা সকল বিকল্প নিয়ে কাজ করছি।’ আগের সরকারগুলোর জ্বালানি নীতির সমালোচনাও করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তার দাবি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় বর্তমান সংকটের ভিত্তি আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। দেখেন, যখন ভুল নীতি আপনি গ্রহণ করবেন একটি সময় তার মাসুল দিতে হবে।

তবে বিদ্যুৎ অফিসের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ওই চিঠি দেয়নি।

‘আমরা দেইনি। আপনি আমার কাছে যদি বলেন, আমি মন্ত্রণালয়কে রিপ্রেজেন্ট করছি।’

মহেশখালীতে কারিগরি ত্রুটি, এলএনজি সরবরাহ কমেছে : মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলোতে কারিগরি ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। দুটি ভাসমান টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতার তুলনায় বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩৭ শতাংশ। ফলে সরবরাহ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। এ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। সেখানে দৈনিক চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি প্রায় ৪০ শতাংশ। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নগরীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি, ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন। একই সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকদেরও রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার উৎপাদন ও বিপণন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪১০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।

মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিট এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা ৬০০ এবং সামিটের ৫০০ এমএমসিএফডি। সে হিসাবে বর্তমানে টার্মিনাল দুটির সরবরাহ পূর্ণ সক্ষমতার মাত্র ৩৭ শতাংশ।এক্সিলারেটের বয়লার বন্ধ, সামিটে আবহাওয়ার বাধা পেট্রোবাংলার উপমহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন ও বিপণন) প্রকৌশলী মোহা. মাহমুদুল হাসান জানান, এক্সিলারেট এনার্জির দুটি বয়লারের মধ্যে একটি বর্তমানে চালু রয়েছে। অন্যটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। মেরামত শেষ হলে সেটিও চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, শুধু এক্সিলারেটের কারিগরি ত্রুটিই নয়, সামিটের টার্মিনালও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমস্যায় পড়েছে। সেখানে একটি এলএনজি জাহাজ অবস্থান করলেও বাতাসের গতিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেটি নিরাপদে বার্থিং করতে পারছে না। ফলে জাহাজ থেকে এলএনজি আনলোডিং বা টার্মিনালে স্থানান্তরের কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।

আবহাওয়া ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে এলে কার্যক্রম শুরু করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কারিগরি দল প্রস্তুত রয়েছে। তবে জাহাজের অপারেশন পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এলএনজি সরবরাহও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামে ১৪০ এমএমসিএফডি ঘাটতি : মহেশখালীর সরবরাহ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ এমএমসিএফডি। এর বিপরীতে বুধবার সকালে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২১০ এমএমসিএফডি।

অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১৪০ এমএমসিএফডি বা ৪০ শতাংশ।

কেজিডিসিএলের ইঞ্জিনিয়ার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। পরিবর্তিত সরবরাহের ভিত্তিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ যাতে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হয়, সেটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ ২৩০ থেকে ২৩৪ এমএমসিএফডির মধ্যে ছিল। তবে দুপুরের পর সরবরাহ কমতে শুরু করে। গত রাতে তা আরও কমে যাওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। মুরাদপুরের ফসিল পেট্রোল পাম্পে বুধবার সকাল ১১টায় গ্যাসের জন্য দীর্ঘলাইন দেখা যায়।

গাড়িচালক আকতার হোসেন জানান, সকাল ৮টা থেকে তিনি গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক দিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার পর মঙ্গলবার থেকে আবার সংকট শুরু হয়েছে।

ফসিল পেট্রোলপাম্পের ব্যবস্থাপক মো. ফখরুদ্দীন ইসলাম শিমুল বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক গতিতে সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত পাম্পে গ্যাসের চাপের রিডিং ২২০-এর কাছাকাছি থাকলেও বর্তমানে তা ১৫০ থেকে ১৭০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে।

তিনি জানান, সোমবার রাত থেকে এ সমস্যা শুরু হয়েছে। কিছু সময় গ্যাস পাওয়া গেলেও আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো নোটিশ পাওয়া যায়নি।

নগরীর ওয়াসার মোড় এলাকার এসএইচ খান সন্স সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনেও দীর্ঘলাইন দেখা গেছে। সেখানে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলেও গ্যাস পাওয়ার আশায় গাড়িগুলো অপেক্ষা করছিল।

চালক মোহাম্মদ শফিক বলেন, ‘সকাল ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কখন গ্যাস দেওয়া হবে, তা জানি না। গাড়ি বের করার জন্য প্রতিদিন ১ হাজার ১০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। ফলে আয় না করেও ভাড়া দেওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।’

টাইগারপাস এলাকার রেইনবো সিএনজি স্টেশনেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। ফলে নগরীর বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা, যানবাহনের জট এবং চালকদের আয় কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

গ্যাস সংকটে শুধু পরিবহন খাত নয়, আবাসিক গ্রাহকরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আফজাল ফরমান বলেন, বিদ্যুতের সমস্যার সঙ্গে নতুন করে গ্যাস সংকটও যুক্ত হয়েছে। বাসায় পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্নায় সমস্যা হচ্ছে।

এদিকে গ্যাস সংকটের পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক খন্দকার বেলায়েত হোসেন।

তিনি বলেন, কোভিড-১৯ সময়ের দৈনিক বুলেটিনের মতো গ্যাস পরিস্থিতি নিয়েও নির্দিষ্ট সময়ে একটি ‘দৈনিক গ্যাস পরিস্থিতি বুলেটিন’ প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা, উৎপাদন ও সরবরাহ, মোট ঘাটতি, জাতীয় গ্রিডে এলএনজির অবদান এবং বিদ্যুৎ, শিল্প, সার ও আবাসিক খাতে খাতভিত্তিক বরাদ্দের তথ্য থাকা উচিত।

এ ছাড়া কোন এলাকায় কত ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, গ্যাসের চাপ কত এবং সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে কী প্রভাব পড়ছে- এসব তথ্যও নিয়মিত প্রকাশের দাবি জানান তিনি।

খন্দকার বেলায়েত হোসেনের মতে, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা, এলএনজি আমদানির অগ্রগতি, অতিরিক্ত আমদানি সক্ষমতা এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ সম্পর্কেও নিয়মিত তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। এতে সংকটের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি গুজব ও বিভ্রান্তি কমবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি বাড়বে।

গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর সেখানে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। পরে ৬ আগস্ট একটি বয়লার চালু করে আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু করা হয়। তবে দ্বিতীয় বয়লারটি এখনো মেরামতের আওতায় রয়েছে।

অন্যদিকে সামিটের টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি জাহাজ নিরাপদে বার্থিং করতে না পারায় নতুন করে এলএনজি আনলোডিংও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ফলে মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে না পারায় চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। দ্রুত টার্মিনালগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক করে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো না গেলে শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।