বাংলাদেশে এসডিজি বাস্তবায়ন

তিন গ্রামকে ‘পাইলটিং ভিলেজ’ বানাচ্ছে সরকার

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নিরাপদ পানির সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ও যোগাযোগ সমস্যার মতো নানা সংকটে থাকা দেশের তিন গ্রামকে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দিনাজপুরের নাফানগর, খুলনার পানখালী ও রাঙামাটির মিতিঙ্গাছড়িকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বেছে নিয়ে স্থানীয় তিন ধরনের ঝুঁকি ও সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিনটি গ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও জলবায়ু ঝুঁকির ধরন আলাদা। ফলে প্রতিটি গ্রামের জন্য স্থানীয় সমস্যা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় পৃথক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) বলছে, এসডিজির মূল মন্ত্র হলো কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা। এসডিজির ১৭টি অভীষ্ট, ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা ও ২৫০টি সূচকের মধ্যে বাংলাদেশের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ভ্রমণ গাইড

উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, সব দেশের জন্য সব সূচক সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। এসডিজির অভীষ্টগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বৈশ্বিক অভীষ্টের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার সমন্বয় এসডিজি অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে কোনোটি পুরোপুরি লক্ষ্যের পথে নেই। ১০টির অগ্রগতি থেমে আছে, একটির অবনতি হচ্ছে এবং ছয়টিতে কিছু অগ্রগতি হচ্ছে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিলোপ, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, গুণগত শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং অসমতা হ্রাসের মতো বিষয়গুলোতে অগ্রগতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

এসডিজি ভিলেজ হিসেবে বাছাই করা নাফানগর গ্রামটি দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায়। সেখানে প্রায় ৪ হাজার ৩৯৭ মানুষের বসবাস। গ্রামটির প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ মুসলিম এবং ৩৫ শতাংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার মতো জলবায়ু ঝুঁকি রয়েছে সেখানে। দারিদ্র্যের হার প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্ব প্রায় ৭০ শতাংশ। শুষ্ক মৌসুমে পানীয় জলের তীব্র সংকটও রয়েছে।

নাফানগরের সম্ভাবনার জায়গায় কাঁকড়া চাষকে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। ঝপঝপিয়া নদী ও খালগুলো ব্যবহার করে সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদারের সুযোগও রয়েছে।

নাফানগরের জন্য নির্ধারিত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিভিত্তিক শিল্পে কর্মসংস্থানের অনুপাত ২০ শতাংশে উন্নীত করা এবং নদী-নালা, খাল-বিলে পরিচালিত দূষণবিরোধী অভিযানের সংখ্যা দ্বিগুণ করা। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপদ পানি ও পয়ঃব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী গ্রামটি সুন্দরবন-সংলগ্ন অনগ্রসর উপকূলীয় এলাকা। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা এখানকার বড় সমস্যা। সিডর, আইলা ও আম্ফানের মতো ঘূর্ণিঝড়ে গ্রামটির অবকাঠামো ও মৎস্যঘের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানীয় জলের তীব্র সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষিত যুবক বেকার এবং মৌসুমি বেকারত্বও রয়েছে।

পানখালীর সম্ভাবনার মধ্যে রয়েছে কাঁকড়া চাষ, নদী ও খালকে কাজে লাগিয়ে সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা। গ্রামটিতে কাঁকড়া চাষ ও নির্মাণকাজে নারী-পুরুষ সমান মজুরি পাওয়ার বিষয়টিকেও ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পানখালীর জন্য নিরাপদ খাবার পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধাভোগী সংখ্যা শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ ব্যবস্থাপনার খাবার পানি ব্যবহারকারী জনসংখ্যার হার শতভাগে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রামটির পাইলট কার্যক্রমে পানি ও স্যানিটেশনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি একটি পাহাড়ি জনপদ। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বনজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই এলাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। কৃষি, জুমচাষ, পশুপালন, মৎস্যচাষ, হস্তশিল্প ও বনজ সম্পদভিত্তিক কাজ এখানকার মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

তবে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও যোগাযোগ অবকাঠামোর চরম সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাহাড়ি ভূমিধস, অতিবৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও রয়েছে। ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং নাগরিক সুবিধা ব্যাহত হয়। জরুরি সময়ে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসংক্রান্ত যোগাযোগের ঘাটতিও রয়েছে। মিতিঙ্গাছড়িতে বাঁশ-বেতভিত্তিক কুটিরশিল্প ও বনজ সম্পদভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কর্ণফুলী নদী, কাপ্তাই হ্রদ ও পাহাড়ি পরিবেশকে কেন্দ্র করে টেকসই পর্যটন বিকাশের সম্ভাবনাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এই গ্রামের জন্য ২০২৮ সালের আগে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে এনে পরপর ৩ বছর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কাপ্তাই উপজেলায় বেকারত্বের হার ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন গ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনা একই ধরনের হবে না। যে গ্রামের যে সমস্যা, সেই অনুযায়ী এসডিজির অভীষ্ট ও জাতীয় অগ্রাধিকার সূচকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যক্রম নির্ধারণ করা হবে।

মিতিঙ্গাছড়ির ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দুর্গমতা, যোগাযোগ সংকট, অপ্রতুল স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং কর্মসংস্থানের অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সমাধানে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, পার্বত্য এলাকায় বিশেষ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নের মতো উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।

নাফানগরের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য, পুরুষদের কর্মবিমুখতা, মৌসুমি বেকারত্ব, সুপেয় পানির অভাব, বাল্যবিবাহ ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব মোকাবিলায় সামাজিক সুরক্ষা বলয়, কারিগরি শিক্ষা, শ্রম বৈষম্য দূরীকরণ ও বাল্যবিবাহ রোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।