তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা ফেরত নেবে মিয়ানমার

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তিন লাখের বেশি মানুষ মিয়ানমারে ফিরতে পারবে বলে জানিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। ৯ বছর আগে ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায় দেশটির সেনাবাহিনী। এরপর লাখ লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। সেই ঘটনার ৯ বছর পূর্তিতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বলেছে, যখন রাখাইনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে তখন তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশের কাছ থেকে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য পাঠানো হয়েছে। যারমধ্যে তারা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। আর এরমধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করেছে। যখন রাখাইনের পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হবে তখন তাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করা হবে বলে জানিয়েছে সামরিক জান্তা।

মিয়ানমার সরকারের দাবি, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী একটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর রাখাইনে সেনা অভিযান শুরু করা হয়।

তবে সেনা অভিযানের নামে শত শত মানুষকে হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটায় মিয়ানমারের সেনারা। তাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে একসঙ্গে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এর আগে থেকেই যুগ যুগ ধরে আরও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বাস করছিল।

মিয়ানমারের পূর্ব নাম ছিল বার্মা। তারা রোহিঙ্গাদের নিজেদের জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। এর বদলে তারা রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে দাবি করে। তাদের মতে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে এসে মিয়ানমারে বসতি স্থাপন করেছে।

জান্তা সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সর্বশেষ বিবৃতিতে আরও বলেছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো রোহিঙ্গাদের তালিকার ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য তারা যাচাই করতে পারেনি। আর ৪ হাজার ২৪১ জনকে তারা পেয়েছে যারা কথিত সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত।

এছাড়া বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রবেশের দাবিও অস্বীকার করেছে মিয়ানমার। তারা বলেছে ২০১৭ সালের সহিংসতার পর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে গেছে ৫ লাখ ৪০ হাজার মানুষ। আর উত্তর রাখাইনে রয়ে গেছে ২ লাখ মানুষ।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই বছরের একটি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন চুক্তি করেছিল। কিন্তু ২০২১ সালে অং সান সুচিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটানোর পর মিয়ানমারের পরিস্থিতি খারাপ হয়। দেশজুড়ে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে সাধারণ মানুষ। এতে করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন আর সম্ভব হয়নি।

এরমধ্যে সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২০২৩ সালে লড়াই শুরু হয়। এতে করে নতুন করে আরও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

বর্তমানে আরাকান আর্মি রাখাইনের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে এসেছে।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তথ্যকে সঠিক নয় বলে দাবি করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই প্রসঙ্গে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে এই দাবি করেছে দেশটি।

এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি এবং সাগরপথে অন্য দেশে পাড়ি দেওয়া, পাশাপাশি বাংলাদেশের কক্সবাজারের ক্যাম্পে বসবাসকারীদের বিভিন্ন বিবরণ উপস্থাপন করেছে। লক্ষ্য করা গেছে, এই প্রতিবেদন, প্রকাশনা ও সম্প্রচারগুলো একতরফা এবং ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। তাই রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রকৃত হিসাব নিম্নরূপ পরিষ্কার করতে চায় মিয়ানমার।

দেশটি দাবি করেছে, উত্তর রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের বিষয়ে বাস্তবতা ছিল যে, ২০১৬ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্ট, আরসা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী উত্তর রাখাইন রাজ্যের পুলিশ ফাঁড়ি এবং ব্যাটালিয়নে একযোগে এবং সমন্বিত হামলা চালায়। এ ছাড়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি সরকারি কর্মচারী ও স্থানীয় লোকজনকে হত্যা করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়ায়, তাতমাদাওকে সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছিল। আরসা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকি ও আক্রমণের ফলে স্থানীয় লোকজন অন্য শহর ও গ্রামে পালিয়ে যায় এবং বিপুল সংখ্যক ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে প্রবেশ করে তাদের দাবি, রেকর্ড অনুসারে, আরসা সন্ত্রাসী হামলার আগে রাখাইন রাজ্যের বুথিডং, মুংডো এবং রাথেডং টাউনশিপে ৭ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করতো। এই ঘটনার পর দুই লাখেরও বেশি ‘বাঙালি’ এই অঞ্চলে রয়ে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি বাঙালি বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। এসব পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে রাখাইন রাজ্য থেকে যে ১০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়।

মিয়ানমার বলছে, বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তি অনুসারে, মিয়ানমার তিনটি অনুষ্ঠানে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছিল, তবে বাস্তুচ্যুতদের কেউই মিয়ানমারে ফেরেননি।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ১৯৭৮, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে পরিচালিত অভিযানের কারণে রাখাইন রাজ্য থেকে কিছু বাঙালি বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী, মিয়ানমার সফলভাবে ১৯৭৮ এবং ১৯৭৯ সালের মধ্যে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৮ এবং ১৯৯২ এবং ২০০৫ সালের মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৯৫ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে গ্রহণ করেছে।