অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নতুন ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেই ইতিহাস লিখল বাংলাদেশ! শুধু জয় নয়, টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে পুরো ম্যাচজুড়ে চাপে রেখে সাড়ে তিন দিনের মধ্যেই ৯ উইকেটে হারিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে রোববার বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে যোগ হলো এমন এক অধ্যায়, যার মাহাত্ম্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে জয়ের ধরন!
অস্ট্রেলিয়ার ছুড়ে দেওয়া ৫৭ রানের ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৪.২ ওভারেই জয় নিশ্চিত করেন সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। আজ মাত্র এক উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার এই জয় ছিল পুরো ম্যাচের চিত্রেরই প্রতিফলন। সাড়ে তিন দিনে খেলা হয়েছে মোট ১১টি সেশন, আর প্রতিটি সেশনেই আধিপত্য ছিল বাংলাদেশের।
জয়ের ভিতটা অবশ্য শেষ দিনে তৈরি হয়নি। হাসান মাহমুদের পেস, তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাটিং, অধিনায়ক শান্তর নেতৃত্ব, মেহেদী হাসান মিরাজের কার্যকর ভূমিকা- সব মিলিয়ে দলগত পারফরম্যান্সেই অস্ট্রেলিয়াকে তাদের নিজেদের মাঠে কোণঠাসা করেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার ২০ উইকেটের ১৪টিই নিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা, যা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কতটা সফরকারীদের হাতে ছিল, সেটিও স্পষ্ট করে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়, তার ওপর ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমন একতরফা দাপট-সব মিলিয়ে শান্তর কাছে এই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্য সব সাফল্যকেও ছাপিয়ে গেছে। ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই, আমার মতে এটি যে কোনো ফরম্যাটেই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়। আমরা বিশ্বাস করি, সামনের দিনগুলোতে আমরা আরও স্পেশাল কিছু করব।’ শুধু দলের অধিনায়ক হিসেবেই নয়, একজন ক্রিকেটার হিসেবেও এই মুহূর্তটিকে বিশেষ মনে করছেন শান্ত। সতীর্থদের পারফরম্যান্সে গর্বিত এই বাঁহাতি ব্যাটার বলেন, ‘খুবই আনন্দিত। আমার দল ও নিজের ওপর আমি খুবই গর্বিত। আমরা যা করেছি, গর্ব করার মতোই ব্যাপার। আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি এবং শেষ পর্যন্ত জিততে পেরে অনেক খুশি।’
ডারউইনের জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে পেসারদের উত্থানেরও বড় বিজ্ঞাপন। অস্ট্রেলিয়ার মতো কন্ডিশনে পেসাররা যেভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন, তাতে দীর্ঘদিনের একটি পরিবর্তন চোখে পড়ছে বলে মনে করেন শান্ত, ‘দেখুন, টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। পাঁচ বছর আগেও আমাদের পেসাররা টেস্ট খেলতে চাইত না। কিন্তু এখন আমরা অনেক টেস্ট ক্রিকেট খেলছি এবং তারাও টেস্ট ফরম্যাটকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা খেলতে চায়, পারফর্ম করতে চায়, বিশ্বমানের হতে চায়। এখন তাদের মানসিকতাই এমন। মুশফিকুর ও মুমিনুলের মতো সিনিয়র খেলোয়াড়রাও তাদের বেশি করে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে উৎসাহিত করেছেন।’
এই জয় তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের বদলে যাওয়া মানসিকতারও প্রতিচ্ছবি। একসময় বিদেশের মাটিতে টেস্টে ভালো করার স্বপ্নই যেখানে বড় হয়ে উঠত, সেখানে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদের ঘরের মাঠে টানা ১১ সেশন নিয়ন্ত্রণে রেখে জয় এখন বাস্তবতা। পেসারদের আগ্রাসন, ব্যাটারদের দায়িত্বশীলতা এবং পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সেই বাস্তবতাকে সম্ভব করেছে।
তবে সিরিজ এখনও শেষ হয়নি। আগামী ২২ আগস্ট ম্যাকাইতে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে নামবে বাংলাদেশ। ডারউইনের সাফল্যের পরও আত্মতুষ্টিতে না ভেসে একই ক্রিকেট ধরে রাখার প্রত্যয় শান্তর কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে- আমি একই কথাই বলব। আমরা যদি সেশন ধরে ধরে খেলতে পারি, আর লোয়ার অর্ডার যদি নিয়মিত অবদান রাখতে থাকে, তাহলে এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।’ ডারউইনে বাংলাদেশ শুধু অস্ট্রেলিয়াকে হারায়নি, নিজেদের সামর্থ্যরে সীমারেখাটাও যেন নতুন করে এঁকেছে। ২৩ বছরের অপেক্ষার পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় এসেছে এমন এক দাপটে, যা এখন জোগাচ্ছবাংলাদেশের ক্রিকেটে পরের বড় স্বপ্ন দেখার সাহসও!
