প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে ঢাকার দুই শর্ত

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রক্রিয়া হিসাবে দুটো শর্তের কথা বলেছে বাংলাদেশ সরকার। সফরের ক্ষেত্রে ঢাকার সিদ্ধান্তের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার আসামিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেছে ঢাকা। গতকাল রোববার দুপুরে এক ব্রিফিংয়ে সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম। ব্রিফিংয়ে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলাপ-আলোচনার মধ্যে ছিলেন ঢাকা ও দিল্লির কর্মকর্তারা। ‘অবশ্য, ৫ আগস্ট নয়া দিল্লিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের কারণে সেই প্রক্রিয়াটা কলুষিত হয়। এক্ষেত্রে আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি।’ মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা দরকার। এক্ষেত্রে, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ ত্বরান্বিত করার এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদির অভিযুক্ত খুনিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের কাজ দ্রুততার সঙ্গে করার অনুরোধ আমরা ভারত সরকারকে করেছি। আমরা তাদের প্রত্যুত্তরের অপেক্ষায় রয়েছি।’

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। আন্দোলন দমাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার দল আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে আহ্বান জানিয়েছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করছি, এ বিষয়ে কোনো আপডেট থাকলে আপনাদের জানাব।’ তবে ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রোববার এক প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে নেওয়া হবে না। আদালতের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের করা অভিযোগগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত কি না, তা যাচাই করা হবে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে জানিয়েছিল, হাদি হত্যা মামলার তিন আসামিকে ভারত থেকে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেশটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

তাদের মধ্যে মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদও রয়েছেন। ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে সেখানে আইনি প্রক্রিয়া চলায় প্রত্যর্পণ কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘আদালত কর্তৃক ঘোষিত সাজা’ কার্যকর করতে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ফেরত দেওয়ার ‘বাধ্যবাধকতা’ রয়েছে।

চুক্তিতে আরও বলা হয়, প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রের ‘বিচারিক কর্তৃপক্ষ’ বিষয়টি দেখভাল করবে। চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ অপরাধগুলো এই চুক্তির আওতায় পড়বে না। তবে খুন, নরহত্যা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং খুনে প্ররোচনা দেওয়ার মত ১২টি অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।

এ ক্ষেত্রে ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনের বিধানগুলোও প্রাসঙ্গিক, যেখানে পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার, পাসপোর্ট ও ভিসা (সিপিভি) বিভাগ এই প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত বিষয়গুলোর মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, মন্ত্রণালয় চুক্তি অনুযায়ী যথাযথ মনে করলে একজন তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে। ওই ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন যে আসামিকে হস্তান্তর করার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে, তবে তিনি প্রত্যর্পণের সুপারিশ করতে পারেন।

অন্যদিকে, প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত তদন্ত শেষে ম্যাজিস্ট্রেট যদি দেখেন যে বিদেশি রাষ্ট্রের দাবির পক্ষে প্রাথমিক কোনো প্রামাণ্য ভিত্তি (প্রাইমা ফেসি) নেই, তবে তিনি আসামিকে অব্যাহতি দিতে পারেন।

গত ১০ অগাস্ট ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে সেখানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা আসে দুই পক্ষেই। তবে সেজন্য ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির ওপর জোর দেয় ঢাকা। ওই বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছিলেন, ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাওয়ার পাশাপাশি তাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে বলেছে ঢাকা।

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ এবং গত ৫ আগস্ট দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে তার বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চাপা উত্তেজনা চললেও আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরের প্রস্তুতি চলছে বলে গত শুক্রবার খবর দিয়েছিল এনডিটিভি।

ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছিল, প্রধানমন্ত্রীর সফরের সম্ভাব্য তারিখ হতে পারে ২২-২৩ অগাস্ট; অর্থাৎ, ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ঠিক এক সপ্তাহ পর।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সম্ভাব্য ওই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা গুরুত্ব পেতে পারে। এখন ঢাকা দুটি শর্তের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরায় প্রধানমন্ত্রীর সফর আবার অনিশ্চয়তায় পড়ল কি না, কর্মকর্তারা সে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি।

শহীদুল করিম বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির আলোকে প্রতিবেশী দেশসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে ঢাকা। তিনি বলেন, এই নীতির ভিত্তি হচ্ছে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক কল্যাণ।