‘গুম করে রাখা সেলে শোয়ার পর পা শৌচাগার পর্যন্ত চলে যেত’

ভুক্তভোগীর জবানবন্দি

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

গুম করে যে সেলে রাখা হতো সেখানে শোয়ার পর পা শৌচাগার পর্যন্ত চলে যেত বলে অবশিষ্ট জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগী নূরে আলম। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি এই জবানবন্দি দেন। ডিজিএফআইয়ের জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার) সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সপ্তম সাক্ষী হিসেবে নূরে আলম জবানবন্দি দেন।

নূরে আলম এর আগে ১২ আগস্ট জবানবন্দি দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছেন, ২০১৬ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। ওই বছরের ১২ এপ্রিল রাতে তাকে গুম করা হয়।

জবানবন্দিতে মঙ্গলবার নূরে আলম বলেন, র‌্যাব-৪-এ গুম থাকার কয়েক মাস পর তাকে র‌্যাব-১০-এ নেওয়া হয়। র‌্যাব-১০-এ তাকে রাখার সেলটি ছিল খুবই ছোট। সেটির প্রস্থ ছিল আড়াই ফুট থেকে তিন ফুট। দৈর্ঘ্য ছিল সাড়ে ছয় ফুট থেকে সাত ফুট। সেই সেলের ভেতরে একটি শৌচাগার ছিল এবং একটি পানির ট্যাপ ছিল। সেখানে এক রাত অবস্থান করেন। পরদিন ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর তাকে গাড়িতে তোলা হয়। সেটি ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা চলে। এরপর তাকে আগের মতোই একটি ছোট্ট সেলে নেওয়া হয়। সেখানে শোয়ার পর তার পা শৌচাগার পর্যন্ত চলে যেত। বাঁ দিকে নড়াচড়া করলে পানির ট্যাপে পা লাগত। সেখানে কয়েক দিন রাখার পর তাকেসহ অন্যদের একটি গাড়িতে তোলা হয় উল্লেখ করে নূরে আলম বলেন, দেড় ঘণ্টা চলার পর গাড়িটি একটি স্থানে দাঁড়ায়। তারপর তাদের একটি বাড়ির দোতলায় রাখা হয়। সেখানে গুমকারীরা বিভিন্ন ধরনের ভারী মালামাল নিয়ে এসে মেঝেতে রাখে। এরপর র‌্যাবের লোকজন ভেতরের দিক থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। তারপর র‌্যাবের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে টহল দিতে থাকে। হ্যান্ডমাইকে চিৎকার করতে থাকে। সেখানে তিন-চার ঘণ্টাব্যাপী মিথ্যা জঙ্গি উদ্ধারের নাটক সাজায় র‌্যাব।

পরে সেখানে চট্টগ্রাম র‌্যাব-৭-এর তৎকালীন প্রধান কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ আসেন উল্লেখ করেন নূরে আলম। তিনি বলেন, মিফতাহ এসে তাদের চোখ খুলে দিতে বলেন। চোখ খোলার পরে তারা সেখানে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ, বলবেয়ারিং, তার, গুনা, পেরেক ও বই দেখতে পান। এভাবে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা নাটক সাজিয়ে সফল অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব! পরে রাতে আকবর শাহ থানায় তাদের হস্তান্তর করে। আকবর শাহ থানা-পুলিশ মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাদের জেলখানায় পাঠায়।

পরে তাকে র‌্যাব রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল উল্লেখ করে নূরে আলম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তৎকালীন এএসপি রুহুল আমিন তাকে বলেন, ‘তোমাকে ডিজিএফআইয়ের লোকজন বাসা থেকে তুলে নিয়ে এসেছে এবং তোমাকে প্রথমে যে জায়গাটিতে রাখা হয়েছিল, সেটি ছিল ডিজিএফআই ও পরেরটি ছিল টিএফআই।’

তার গুমের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ডিজিএফআই ও র‌্যাবের লোকজন দায়ী বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নূরে আলম। দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ চান তিনি।

জেআইসিতে গুম করে রাখার এই মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে তিনজন ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন। তারা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। মঙ্গলবার তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

এ মামলার অন্য ১০ আসামি পলাতক। তাদের মধ্যে আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক। আরও আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক। এ ছাড়া পলাতক আছেন আসামি গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।