আজ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ আজ। এদিন বেলা ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সংসদ ভবনে এ নির্বাচন হবে। প্রায় তিন যুগ পর সংসদ সদস্যদের (এমপি) ভোটে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। এর আগে প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেন। এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ। এই নির্বাচনকে অনেকে ঐতিহাসিক বলে দাবি করেছেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকায় কোনো সংসদ সদস্য তার দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন না। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদের মূল অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এতে ৩৪৯ জন এমপি ভোট দিতে পারবেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম-৪ আসনে নির্বাচিত ঘোষিত বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা আদালতের রায়ে বাতিল হওয়ায় তিনি শপথ নিতে পারেননি। ফলে আসনটি শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াত দলীয় এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়টি (দল থেকে বহিষ্কৃত) ঝুলে থাকায় তিনি ভোট দিতে আসবেন কি না তা জানা নেই সংসদ সচিবালয়ের। ভোটদান ও ভোট গণনা সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হবে। প্রাথমিক সমীকরণে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে ২৪৭ এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষে ৯০ জন এমপি রয়েছেন। দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের বাইরে থাকা ১২ সদস্যের মধ্যে তিনজন বিএনপির মিত্র গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি)। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সদস্য একজন। বাকি আটজন স্বতন্ত্র। তাদের প্রায় সবাই একসময় বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। এ সমীকরণে মির্জা ফখরুলের জয় নিশ্চিত হলেও বাকি ১২টি ভোট রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা জানান, অলি আহমদ স্বতন্ত্র কিংবা ইসলামী আন্দোলনের ভোট টানতে পারলে বিরোধী জোট সেটিকে রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল বিএনপির বাইরের ভোট পেলে ক্ষমতাসীন দল তার প্রতি বৃহত্তর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার বার্তা দিতে পারবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরদিন আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ অনুষ্ঠান হবে। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আগামী শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আমাদের দিক থেকে প্রস্তুতিতে কোনো অসুবিধা নেই। এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন এমন বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন- ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, সরকারপ্রধান, মন্ত্রিসভার সদস্য, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা এবং কূটনীতিক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যালট ওপেন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচনে ভোটাররা গোপন ব্যালটে নয়, ভোট দেবেন প্রকাশ্যে ‘ওপেন’ ব্যালটে। কে কাকে ভোট দিচ্ছেন তা উপস্থিত সবার কাছে দৃশ্যমান থাকবে। নির্বাচন আয়োজনের পুরো আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে ব্রিফ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনি কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দীন। সাধারণত নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জ্যেষ্ঠ সচিব ব্রিফ করে থাকেন। তবে আইনের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব সিইসির ওপর ন্যস্ত থাকায়, এই বিশেষ ও ঐতিহাসিক সময়ে তিনি নিজেই সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান সিইসি।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে সিইসি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর ওই দিনই ক্যাবিনেট ডিভিশন থেকে এ বিষয়ে গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর সংসদীয় পদ্ধতিতে এই প্রথম একাধিক প্রার্থীর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মাঝে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতায় কিছুটা ঘাটতি থাকলেও তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সব মহড়া ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে।
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ও বিধিমালার আলোকে নির্বাচন কমিশন এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদ বর্তমানে নিয়মিত অধিবেশনে না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সিইসি নিজেই সংসদ সদস্যদের বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। গত ১১ আগস্ট ন্যূনতম সাত দিন সময় রেখে এই সংক্রান্ত গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই এই নির্বাচনের ভোটার। নির্বাচন কমিশন আগেই ভোটার তালিকা ও তফসিল প্রকাশ করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনে মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে দুটি মনোনয়ন জমা দেওয়া হয় ড. অলি আহমদের নামে এবং বর্তমান সরকারি দল বিএনপির পক্ষে একটি মনোনয়ন জমা দেওয়া হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে। পরবর্তীকালে ১৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহায়তায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার দিনের মূল স্বাক্ষর রেজিস্টারের সঙ্গে প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখে তিনটি মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে নিয়ম অনুযায়ী একই প্রার্থীর দুটি বৈধ মনোনয়নপত্রের মধ্যে একটি বাড়তি হিসেবে গণ্য হওয়ায় চূড়ান্তভাবে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে কোনো প্রার্থীই নাম প্রত্যাহার করেননি।
ভোটার তালিকার ক্রমিকে কিছুটা বৈচিত্র্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সিইসি জানান, সংসদীয় সীমানার সিরিয়াল অনুযায়ী পঞ্চগড়-১ থেকে শুরু হয়ে বান্দরবানে গিয়ে ৩০০ আসন শেষ হলেও এই নির্বাচনে মূলত সংসদের ‘বিভক্তি নম্বর’ অনুযায়ী ভোটিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের উপনির্বাচন বা শূন্যতার কারণে ভোটার তালিকায় বিভক্তি নম্বরে কিছুটা ডিসকন্টিনিউইটি রয়েছে। তবে তা নিয়মানুগভাবেই সমাধান করা হয়েছে এবং মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যরা এই নির্বাচনে ভোটার হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নির্বাচন পরিচালনার জন্য স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করা আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং সে অনুযায়ী কমিশন পরামর্শক্রমেই সব সূচি নির্ধারণ করেছে বলে জানান সিইসি। ভোটগ্রহণ শেষে বিকেল ৫টার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে ভোট গণনা শুরু হবে এবং ফলাফলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন সিইসি নিজে। পুরো গণনার প্রক্রিয়া থাকবে শতভাগ স্বচ্ছ। নির্বাচন চলাকালীন ও ভোট গণনার সময় সংসদ সদস্যরা কক্ষে উপস্থিত থাকতে পারবেন। ভোটার ও প্রার্থীদের নাম ব্যালট পত্রে স্পষ্ট উল্লেখ থাকায় কে কাকে ভোট দিচ্ছেন তা উপস্থিত সবার কাছে উন্মুক্ত থাকবে। ভিআইপি ভোটারদের ভোটদান এবং ফলাফল গণনার পর্বটি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি স্পষ্ট করেন যে, সংসদ ভবনের ভেতরের পরিবেশ ও বিধিমালা বজায় রাখার দায়িত্ব স্পিকারের, যা তাদের নিজস্ব আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। তবে ভোটের দিন হাউজের ভেতরে কোনো ধরনের নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না। এছাড়া এই নির্বাচনকে ঘিরে অতিরিক্ত বা কোটি কোটি টাকা খরচের খবর গুজব ছাড়া কিছু নয় বলে তিনি জানান। সংসদের বৈঠক ডাকার মতো নিয়মিত বিষয় এবং কিছু ব্যালট ও স্টেশনারি ছাড়া কমিশনের আলাদা কোনো বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় বা অতিরিক্ত বাজেট তৈরি হয়নি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশ ও আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনের দিকে বিশেষ নজর রাখছে উল্লেখ করে সিইসি নাসির উদ্দীন আশা প্রকাশ করেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন একটি অত্যন্ত সুন্দর, স্বচ্ছ ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে সক্ষম হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আইনি বাধা নেই : অ্যাটর্নি জেনারেল
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইনি কোনো বাধা নেই বলে মন্তব্য করেছেন অ?্যাটর্নি জেনারেল ব?্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। গতকাল বুধবার অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে করা রিট হাইকোর্টে খারিজের পর এবার আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন রিটকারী আইনজীবী মো. ইউনুছ আলী আকন্দ। গত মঙ্গলবার রিট আবেদনটি খারিজ করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইউনূছ আলী আকন্দ। গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে রিট করেন আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল থেকে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটপ্রদান করেন, তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে, তবে তিনি সে কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না।’ আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ জানান, ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন না। তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ব্যাহত হয়।
গেল ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদের পৌনে দুই বছর বাকি থাকতে পদত্যাগ করেন। এ পদে দায়িত্ব নিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
