২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

* নতুন রাষ্ট্রপতিকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর * রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে চীনের অভিনন্দন * রুমিন ফারহানাসহ ছয়জন যে কারণে ভোট দেননি * আজ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন নির্বাচনের ফল ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম ২৫৫ ভোট পেয়েছেন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ১৭৭ ভোট বেশি পেয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিজয়ী হয়েছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তার পাশে বসে থাকা নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে করমর্দন করেন এবং একটি লাল গোলাপের স্টিক দিয়ে অভিনন্দন জানান। এ সময় সংসদ কক্ষের সকল সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান। মির্জা ফখরুল তাদের উদ্দেশে হাত তুলে সালাম ও অভিবাদন জানান। এর পরপরই বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এগিয়ে এসে মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তার সঙ্গে কোলাকুলি করেন। পরে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরাও একে একে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে তার সঙ্গে আলিঙ্গন করেন। নতুন রাষ্ট্রপতি একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে করমর্দন করেন এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের সালাম জানান। এ সময় সংসদ কক্ষে আনন্দঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়।

এর আগে দুপুর ২টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন দুই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন এবং নির্বাচন পরিচালনার নিয়মাবলী সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন। এরপর নির্বাচনি সহায়ক কর্মকর্তারা সংসদ সদস্যদের আসনে ব্যালট পেপার নিয়ে যান। সদস্যরা নিজ নিজ আসনে বসে পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেন। প্রথম ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংসদ সদস্যরা ভোট দেন। সরকারদলীয় রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ভোট প্রদান করেন। জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সদস্য এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কথা ছিল। ভোট পড়েছে মোট ৩৪৩টি। তবে অসুস্থতার কারণে বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ভোটে অংশ নিতে পারেননি। আর সংসদ সদস্য না হওয়ায় ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না কর্নেল (অব.) অলি আহমদের।

ভোটগ্রহণের জন্য তিনটি ব্যালট বাক্স রাখা হয়। সংসদ সদস্যদের পর্যায়ক্রমে ব্যালট পেপার দেওয়া হয়, যাতে ভোটগ্রহণে ভিড় না হয়। ব্যালট পেপারে দুই প্রার্থীর নাম ছিল। ভোট দিয়ে নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর করে ব্যালট বাক্সে জমা দেন সংসদ সদস্যরা। ভোটগ্রহণ পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ সময় দায়িত্ব পালন করেন। ভোটগ্রহণের শুরুতে প্রথম ২০ মিনিট সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়। বিকাল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ব্যালট বাক্স খোলা হয়। এরপর প্রকাশ্যে ভোটগণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ ভোটাভুটি হয়েছিল। এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০২, ২০০৯, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে একাধিক প্রার্থী না থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ফলে ৩৫ বছর পর আবার সংসদ সদস্যদের ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান।

রুমিন ফারহানাসহ ছয়জন যে কারণে ভোট দেননি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ ছয়জন ভোট দেননি। এর মধ্যে বিএনপির মির্জা আব্বাস ও মোস্তফা কামাল পাশা বিদেশে চিকিৎসাধীন। বিএনপির সংসদ সদস্য ওসমান ফারুক ও খেলাফত মজলিসের আবুল হাসানও ভোট দিতে আসেননি। আবুল হাসান বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তার দলের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের জানিয়েছেন।

জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকেও ভোট দিতে দেখা যায়নি। বিএনপির আসলাম চৌধুরীর সংসদ সদস্য পদ আদালতের রায়ে বাতিল হয়েছে। ভোটদানে বিরত থাকার বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, এই নির্বাচন অর্থহীন এবং প্রহসনের। ভোট না দেওয়ার পক্ষে তিনি তিনটি কারণ তুলে ধরেছেন। রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমার কাছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে অর্থহীন মনে হয়েছে। কারণ, ভোটে অনিশ্চয়তা না থাকলে সেটা কোনো নির্বাচন নয়। এই ভোটের ফলাফল কী, তা সবার জানা। তাহলে এটাকে ভোট কেন বলব।

সুতরাং এটা মনোনয়ন, নির্বাচন নয়।’ ভোট না দেওয়ার দ্বিতীয় কারণ ব্যাখ্যা করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এত বড় একটি গণঅভ্যুত্থান গেল, যার সঙ্গে জাতি হিসেবে আমাদের আত্মত্যাগ, অনেক স্বপ্ন জড়িত। তাহলে আমরা সবাই মিলে কেন একজন অরাজনৈতিক এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করতে পারলাম না।’ তৃতীয় কারণকে নিজের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের আগে বিএনপি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ভয় দেখাল।

অথচ ২০১৬ সাল থেকে বিএনপি ভিশন ২০৩০-এ গলার রগ ফুলিয়ে কথা বলছে। এখন তারা বলছে, দলের বাইরে ভোট দিলে তার সদস্যপদ বাতিল হবে। এ রকম প্রহসনের ভোট আমি কেন দেব?’

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে। এ ছাড়া নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলেও সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। তবে একবার শূন্য হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেই নির্বাচনে আবার অংশ নিতে কোনো বাধা নেই। ভোট চলাকালে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, দলটির একমাত্র সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ ভোটদানে বিরত থাকবেন। কারণ হিসেবে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিষয়ে জুলাই সনদে ঐকমত্য হওয়া সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় এই নির্বাচনে ভোট দেবে না ইসলামী আন্দোলন। তবে পরে ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন বলে জানিয়েছেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। গতকাল তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে নতুন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী এখন প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে সংসদের স্পিকার (বর্তমানে যিনি ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্বে আছেন) রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করাবেন।

রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিত্ব-এমপি পদশূন্য হবে

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) যদি নির্বাচিত হন, তবে শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সংসদ সদস্যপদ এবং মন্ত্রিত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এর জন্য আগে থেকে পদত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। গতকাল জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে প্রার্থীর পদত্যাগ ও অন্যান্য নিয়ম প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, বর্তমান সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী ভোটার তালিকা, তফসিল ঘোষণা, ভোটগ্রহণ এবং শপথ গ্রহণের সব কাজ পরিচালিত হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগের সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে চীনের অভিনন্দন

বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যে ঢাকায় চীনা দূতাবাসের ফেইসবুক পেইজ থেকে অভিনন্দন জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে চীন অনেক গুরুত্ব দেয়। নতুন যুগে যৌথ প্রচেষ্টায় ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গড়ার ক্ষেত্রে নিবিড়ভাবে কাজ করতে প্রস্তুত চীন, যাতে দুই দেশ ও জনগণের বড় রকমের উপকার হয়।