ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ থামছেই না, অধরা অপরাধী
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেসে জানালার পাশে বসেছিলেন মাইজদীর বাসিন্দা মহিউদ্দিন। ট্রেনটি কুমিল্লার রাজাপুর স্টেশন অতিক্রম করতেই বিকট শব্দে জানালার কাচ ভেঙে ছুটে আসে একটি পাথর। সে পাথরের আঘাতে মাথায় জখম হয়ে লুটিয়ে পড়েন মহিউদ্দিন। হঠাৎ এমন ঘটনায় বগিতে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। খবর পেয়ে রেলকর্মীরা দ্রুত রক্তক্ষরণ বন্ধে ব্যবস্থা নেন। পরে নোয়াখালী পৌঁছে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় পঞ্চাশোর্ধ্ব এই ব্যবসায়িকে। জীবনে আগে কখনও এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রেনটি স্টেশন অতিক্রম করতেই হঠাৎ মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে পড়ে যাই। প্রথমে বুঝতেই পারিনি কী হয়েছে। পরে দেখি মাথা দিয়ে রক্ত পড়ছে। তখন বুঝতে পারি বাইরে থেকে পাথর এসে লেগেছে।’
৩০ জুলাই রাতে উপকূল এক্সপ্রেসেন এ ঘটনাটি কোনো বিচ্ছন্ন ঘটনা নয়। বরং ঢাকা-চট্টগ্রাম, লাকসাম-নোয়াখালী ও লাকসাম-চাঁদপুরসহ কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন পথে এমন ঘটনা এখন নিয়মিতই ঘটছে।
রেলওয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা-২ মো. মনিরুজ্জামান বলেন, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত এই পাঁচ মাসে কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন পথে চলন্ত ট্রেনে ৬২টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
‘লিপিবদ্ধ হওয়া এসব ঘটনায় সাধারণ যাত্রী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে কেউ কেউ অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন বলেও শুনেছি।’
সম্প্রতি দোহাজারি-কক্সবাজার পথে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি আলোচনায় এলেও পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ মাসে কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাথর নিক্ষেপের ঘটনার ৬২টির মধ্যে ৩৭টিই ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম পথে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পথে ১৯টি, লাকসাম-নোয়াখালী পথে চারটি এবং লাকসাম-চাঁদপুর পথে ঘটেছে দুটি ঘটনা। তবে বেসরকারি হিসাবে, এ সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
রেলওয়ের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় শুধু যে যাত্রীরা আহত হয় এমন নয়, সরকারি সম্পদ ট্রেনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনায় ভেঙেছে ট্রেনের জানালার কাচ। ‘দেখা গেছে, কোনো একটি এসি বগির একটি জানালাও ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো বগিটি অচল হয়ে থাকছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত ঠিক হচ্ছে, ততক্ষণ এই বগিটি চলাচলের উপযুক্ত নয়।’ তিনি বলেন, এ বিষয়গুলো রেললাইনের আশেপাশের মানুষজনকে জানাতে হবে এবং বুঝাতে হবে।
যাত্রীদের শঙ্কাণ্ডউদ্বেগ বাড়ছে : রেলওয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধীনে চট্টগ্রাম-আখাউড়া ২০০ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ১৪৭ কিলোমিটার, লাকসাম-নোয়াখালী ৪৮ কিলোমিটার এবং লাকসাম-চাঁদপুর ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ রয়েছে। এসব পথে আন্তঃনগর ও মেইল এক্সপ্রেস মিলিয়ে ২৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। প্রতিদিন আসা-যাওয়া করে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী। তার মধ্যে চলন্ত ট্রেন লক্ষ্য করে একের পর এক পাথর ছোড়ার ঘটনায় দেশের একমাত্র নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে পরিচিত ট্রেনে যাতায়াত করা যাত্রী ও স্বজনদের মধ্যে এখন উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। আতঙ্কিত যাত্রীরা বলছেন, নিরাপদে যাতায়াতের জন্য ট্রেনে উঠলেও কখন কোথা থেকে পাথর এসে আঘাত করবে, সেই ভয় এখন তাড়া করে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাত্রা করা মহানগর প্রভাতীর যাত্রী ফাহিমা চৌধুরী বলেন, ট্রেনে আমরা নিরাপদে যাতায়াতের জন্য চলাচল করি। কিন্তু চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ পাথর এসে পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। ‘শিশু ও বয়স্ক মানুষ নিয়ে ট্রেনে চলাচল করি। পাথর চোখে বা মাথায় লাগলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একটা পাথর শুধু কাচ ভাঙে না, একজন মানুষের জীবনও শেষ করে দিতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের উচিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। যারা এসব করছে তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা দরকার।’
ওই ট্রেনের যাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সারোয়ার বাবু বলেন, হঠাৎ ছুটে আসা পাথরে মুহূর্তেই ভেঙে যাচ্ছে ট্রেনের জানালার কাচ। পাথরের আঘাতে আহত হচ্ছেন নানা বয়সী যাত্রী।
‘কারও মাথা, কারও চোখ, নাক কিংবা কানে লাগছে গুরুতর আঘাত। ঘটেছে প্রাণহানির ঘটনাও। এতে এখন ট্রেনে চড়তেই ভয়-আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে যাত্রীদের মধ্যে।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণত আমরা শুনে থাকি কিশোর-বয়সীরা খেলার ছলে এই ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটায়। মাদকাসক্তরা ঢিল ছুড়ে। কিছুদিন আগেও শুনেছি, একজন এমন ঘটনায় চোখ হারিয়েছেন।’
‘তবে যাত্রীরা তো আর বুঝতে পারে না কারা ঢিল ছুড়ছে। ট্রেনে যারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব থাকেন তাদেরই উচিত ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে লোক পাঠিয়ে জানতে চেষ্টা করা কারা ঘটনা ঘটিয়েছে। না হয় পরে তাদেরকে কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
কারা ছুড়ছে পাথর : রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের এসব ঘটনার সঙ্গে স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোর, মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের একটি অংশ জড়িত প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তারা বলছেন, ট্রেনের সামনে ও পেছনে সিসিক্যামেরা বা অ্যাকশন ক্যামেরা থাকলে ঘটনার সময় অনুযায়ী কোন জায়গায় কারা পাথর ছুড়ছে তা বোঝা যেত।
চট্টগ্রাম হেডকোয়ার্টারের গ্রেড-১ বি ট্রেন পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা ঢাকা থেকে কক্সবাজার আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা করি। যারা ট্রেনে দায়িত্বরত থাকেন, তারা কোনো না কোনো কাজে সব সময় ব্যস্ত থাকে। হঠাৎ করে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলে তা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝা যায় না কারা করেছে।
‘তবে সাধারণত আমরা দেখে থাকি রেললাইনের পাশে কিশোর বয়সী বখাটে, মাদক সেবনকারী কিংবা অসচেতন মানুষজন এ ধরনের কাজ করে থাকে। ট্রেনের শুরুতে এবং শেষে যদি অ্যাকশন ক্যামেরার ব্যবস্থা থাকে তাহলে তাতে ধরা পড়ত কারা এ কাজ করছে।’
কুমিল্লায় কর্মরত সাংবাদিক মাসুদ আলম মনে করেন, ‘ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনায় সঠিক তদন্ত করে কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের খুঁজে বের করে পরিচয় প্রকাশ করা উচিত। যদি কেউ শিশু-কিশোর হয়ে থাকে তাহলে তাদের অভিভাবকদের অবগত করা উচিত।’
রেলের যাত্রীদের নিরাপত্তার রেলওয়ে বিভাগকেই নিতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘পাথর ছোড়ায় জড়িতদের শাস্তির নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা যাবে; না হয় শুধুমাত্র কিশোর বয়সী বখাটে কিংবা মাদকাসক্তদের দোষারোপ করে কোনো লাভ হবে না।’
একের পর এক ঘটনা, আটক হয়নি কেউ : এদিকে একের পর এক ঘটনা পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত এসব ঘটনায় জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি রেল নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা পুলিশ।
এতগুলো ঘটনা ঘটার পরও অপরাধীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না কেন? রেললাইনের পাশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে না কেন- এমন প্রশ্ন যাত্রীদের। পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত, আটক কিংবা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে রেলওয়ে পুলিশ জিআরপির কাছ থেকেও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রেলওয়ে চট্টগ্রাম থানার এসআই সহদেব কুমার সরকার বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দিকে ডুলাহাজরা, রামু, দোহাজারিতে পাথর নিক্ষেপের প্রবণতা রয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত এসব ঘটনায় ১২টি মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলায় কাউকে আটক কিংবা গ্রেপ্তার করা যায়নি।’
এসআই সহদেব বলেন, ‘সাধারণত রাতের বেলা দ্রুতগামী ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। যে কারণে কোন এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে- তা সহজে বোঝা যায় না। তারপরও আমরা অভিযোগের ভিত্তিতে সেসব এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রম বিট পুলিশিং পরিচালনা করছি।’
রেলওয়ে লাকসাম থানার ওসি জসিম উদ্দিন বলেন, সম্প্রতি ফেনী স্টেশন সংলগ্ন ও কুমিল্লার রাজাপুরের দুইটি স্পটে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় যাত্রীদের আহত হওয়া বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছে। ‘তবে কেউ এসব নিয়ে অভিযোগ করেন না। আমরা নিজ থেকে এসব ঘটনা লিপিবদ্ধ রেখে ঘটনাস্থলগুলোতে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করি।’
প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর : পাথর নিক্ষেপের প্রবণতা অন্যান্য সময়ের তুলনায় বাড়ছে দাবি করে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী লাকসাম আরএনবির ওসি মো. সালাহউদ্দিন ভুইয়া বলেন, টহল বাড়ানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। পাথর নিক্ষেপের ঘটনা প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত টহল দিচ্ছি। ‘পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতন করতে লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
এদিকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রুটে কিছুটা কমে আসলেও সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লা অঞ্চলে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেড়েছে। আমরা তদন্ত করছি এটি নিছক দুষ্টুমি, নাকি এর পেছনে কোনো পরিকল্পিত নাশকতা রয়েছে।’
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাথর নিক্ষেপের ঘটনা সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে। রেললাইনের পাশের বসতিগুলোতে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপের ভয়াবহতা তুলে ধরা হচ্ছে।’ পাশাপাশি এমন ঘটনা প্রতিরোধে জেলা, উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
