রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তৃণমূল থেকে উঠে এসে বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি হয়ে ওঠা এ ‘সজ্জন’ রাজনীতিক এবার আসীন হলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেন তিনি; শপথ পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ কয়েকশ’ অতিথি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এ শপথের মধ্য দিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন গেল ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এর প্রায় চার সপ্তাহ পর নতুন রাষ্ট্রপ্রধান পেল বঙ্গভবন। শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ দরবার হলে প্রবেশ করেন তিনি। দরবার হলের মঞ্চে নিজ আসনের সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যান্ডদলের সদস্যরা বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয়সংগীত বাজান। এরপর আসন গ্রহণ ও শপথ অনুষ্ঠান শুরুর অনুমতি প্রার্থনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন উপস্থাপন করেন এবং শপথবাক্য পাঠ ও গ্রহণের অনুরোধ জানান।

তখন রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান স্পিকার। শপথগ্রহণ শেষে নতুন রাষ্ট্রপতি ও বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নিজেদের আসন পরিবর্তন করে বসেন। রাষ্ট্রপতির শপথ শেষে শপথ নেন চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী। তাদের শপথ শেষে রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সেই সঙ্গে অতিথিদের দরবার হলের উত্তর দিকে ক্রেডেনশিয়াল মাঠে চা-চক্রে অংশগ্রহণের অনুরোধ জানান তিনি।

শপথ অনুষ্ঠানে দরবার হলের প্রথম সারিতে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী সৈয়দা শামিলা রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমান।

প্রথম সারিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সংসদের বিরোধী দলীয় দলের নেতা শফিকুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানকেও দেখা গেছে। দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ জামান, বিমানবাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন ও নৌবাহিনীর প্রধান খোন্দকার মিজবাহ উল আজীম।

এই সারিতে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহলসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ছিলেন অতিথিদের কাতারে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। একাধিক প্রার্থী থাকায় ৩৫ বছর পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান সংসদের ৩৪৯ জন সদস্যের মধ্যে ৩৪৩ জন এই নির্বাচনে ভোট দেন। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন।

তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। বিপুল ব্যবধানে নির্বাচিত হওয়ার পরদিনই রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন বিজয়ী প্রার্থী মির্জা ফখরুল। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত হওয়ার আগে ৭৮ বছর বয়সী রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ ছাড়া ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তার আগে পাঁচ বছর ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। মির্জা ফখরুলই বিএনপির সবচেয়ে দীর্ঘকালীন মহাসচিব। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাঁর নেতৃত্ব বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছিল।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার কালীবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বামপন্থী ছাত্রসংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ইপিএসইউ) সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। পরে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। একই সময়ে সরকারি চাকরির অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দিতে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। এর দুই বছর পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের জন্মস্থান উত্তরাঞ্চলের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পৌর চেয়ারম্যান (বর্তমানে মেয়র পদ) নির্বাচিত হন তিনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। দীর্ঘদিন দলের অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহ-সভাপতি ও পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

২০০১ সালের নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বগুড়ার একটি আসন থেকে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে মির্জা ফখরুল তখন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

নতুন রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে উঠবেন

নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগামীকাল রোববার বঙ্গভবনে উঠবেন বলে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে। সেদিন সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে তিনি মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবন থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওয়ানা করবেন। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শুক্রবার সন্ধ্যায় শপথ নিয়েছেন দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব সামলানো মির্জা ফখরুল। রাষ্ট্রপতি কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, রোববার বঙ্গভবনে ২ নম্বর গেটে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল ‘গার্ড অব অনার’ মঞ্চে নিয়ে যাবে। সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেবে। এ পর্ব শেষে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে তার কার্যালয়ে যাবেন।

রাষ্ট্রপতি কার্যালয় জানিয়েছে, শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন নতুন রাষ্ট্রপতি। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করার পর তাকে তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। শ্রদ্ধা জানানোর পর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিন্টু রোডের বাসায় ফিরবেন। এরপর তিনি তার গুলশানের বাসভবনে যেতে পারেন।