ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় একে একে চারজনকে হত্যা

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রংপুর ব্যুরো

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ও তার স্ত্রী-সন্তানসহ চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল রোববার ভোরে তাদের আটক করা হয়। গতকাল রোববার দুপুরে প্রেস ব্রিফিংয়ে মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জানান, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় তারা এক এক করে ওই বাড়ির চারজনকে হত্যা করে। পুলিশ কমিশনার বলেন, চারজন হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলাকায় অভিযান শুরু করে। অভিযানের একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়।

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুজন জানিয়েছেন গত বৃহস্পতিবার শেষ রাতের দিকে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে বসে মাদক সেবন ও আড্ডা দিচ্ছিলেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। তারা প্রায়ই এই কাজ করতেন। ওইদিন এ দৃশ্য দেখে ফেলায় প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তারা। পরে শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা বেরিয়ে আসলে তাকেও হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী বেরিয়ে আসেন। এরপর তাকেও হত্যা করা হয়। সবশেষ ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম তাদের চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করেন তারা। এরপর বাড়িতে ঢুকে স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন জিনিস লুট করে পালিয়ে যায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। পুলিশ কমিশনার বলেন, এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কিনা বা আরও কোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গত শনিবার দিবাগত রাতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ (৬৫) চারজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এরমধ্যে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় তার নিজস্ব দোতলা বাড়ির ছাদে। আর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০) ও মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থীর (২৫) লাশ পড়ে ছিল ছাদে ওঠার সিঁড়িতে এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) লাশ পাওয়া যায় খাটের নিচে। স্থানীয়রা জানান, স্কুলশিক্ষকের বাসাটি কয়েকদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে তাদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। গত শনিবার রাত নয়টার দিকে ভেতর থেকে দুর্গন্ধ টের পেয়ে স্থানীয়দের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরে গণপতি চক্রবর্তীর অন্য স্বজন ও পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ তালা ভেঙে ওই চারজনের লাশ উদ্ধার করে। এসময় বাসার ভেতরে জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় ছিল।

নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, সবশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে মুঠোফোনে তাদের সঙ্গে কথা হয়। এরপর শনিবার ফোনে যোগাযোগ করা হলে সব ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফোনে কাউকে না পেয়ে রাত নয়টার দিকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর ওই বাড়িতে যান। সেখানে পৌঁছে প্রধান গেট বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখেন।

পরে ৯৯৯-এ কল দিলে সেখান থেকে কোতোয়ালি থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। এসময় বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল বলেও তিনি জানান।

খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহসহ রহস্য উদ্ঘাটনে তৎপরতা শুরু করে।

জানা গেছে, গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। গতবছরের ডিসেম্বরে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর যান। এরপর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন।

গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী কারমাইকেল কলেজের মাস্টার্স ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো।

গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের আর কেউ রইল না : রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে খুনের মধ্য দিয়ে হত্যাকারীরা গোটা পরিবারটিকেই শেষ করে দিয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা। তারা বলছেন, এই পরিবারটির আর কেউ বেঁচে নেই। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে শনিবার রাতে বাসায় গিয়ে চারটি মরদেহ পায় পুলিশ।

বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে শেষ কথা বলেছিলেন তার মাসী পূজা চক্রবর্তী। তারপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। পূজা চক্রবর্তীই শনিবার রাতে আবার তার বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তাদের পরিবারের খোঁজ নিতে আসেন। আর তখনি তিনি জানতে পারেন পরিবারের সবাইকে খুন করা হয়েছে।

রাতে পূজা চক্রবর্তী কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, আমার ভগ্নিপতি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক কষ্ট করে এই বাড়িটা করছেন। খুব শান্ত মানুষ। তাদের সবাইকে এভাবে মেরে ফেলল। কাউকে বাঁচিয়ে রাখল না। একটা পরিবারকে এভাবে শেষ করে দিল! আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কী! আমরা চাই, এর সুষ্ঠু বিচার হোক।

রাতে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর স্ত্রী শেফালী চক্রবর্তী। তিনি বলছিলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। তার শ্বশুরের নাম হেমন্ত চক্রবর্তী। উনার চার ছেলের দুই ছেলে আগেই মারা যান। এক বছর আগে গণপতি চক্রবর্তী অবসরে যান। তিনি বলছিলেন, তার নিজের দুই মেয়ে। গণপতিরও প্রথমে মেয়ে। পরে প্রীয়ম জন্ম নেয়। গোটা পরিবারে সেই একমাত্র ছেলেসন্তান ছিল।

গোপীনাথ চক্রবর্তীও বয়সের ভারে ন্যূজ্ব। তিনি হৃদরোগের রোগী। খুব একটা চলাফেরা করতে পারেন না। গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন।

গণপতি চক্রবর্তী মির্জাপুর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরে মির্জাপুর হাইস্কুল থেকে পড়াশোনা করেন। মিঠাপুকুর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন সরকারি কারমাইকেল কলেজ থেকে। পরে তিনি রংপুর জিলা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কিছুদিন গাইবান্ধাতেও চাকরি করেন।

গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বাবার বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চিনাই সিনাই ইউনিয়ন গ্রাম বানেশ্বর নীলকণ্ঠ (বকুলতলা) গ্রামে। প্রীতিলতারা তিন ভাই আর দুই বোন। তারা হলেন- জীবন চক্রবর্তী, গাণিতিক চক্রবর্তী, অভিনাথ চক্রবর্তী, প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও পূজা চক্রবর্তী।