সৌরবিদ্যুৎ থেকে চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন দ্রুত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বাজার বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে আগামী ১ বছরের মধ্যে ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত বিদ্যুৎ বিভাগের এক সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ, বা ৫,৫০০ মেগাওয়াট— নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের যে বৃহত্তর পরিকল্পনা রয়েছে, এই উদ্যোগ তারই অংশ। এরপর ২৫ আগস্ট বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে পৃথক এক বৈঠকে বিদ্যুৎ বিভাগ কীভাবে যত দ্রুত সম্ভব ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের এই ৪,০০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য অর্জন করা যায়, সে বিষয়ে খাত সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পরামর্শ চায়।

বৈঠকে উপস্থিত একটি সোলার কোম্পানির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য এই ব্যবসা আকর্ষণীয় করতে প্রথম ছয় মাসে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। তিনি বলেন, ‘যারা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন সম্পন্ন করবেন, তারা তাদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ লাভজনক দামে সরকারের কাছে বিক্রি করার সুযোগ পাবেন। এই বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনাসহ শিগগিরই একটি পরিপত্র জারি করা হবে।’

সরকার-অর্থায়নকৃত প্রথাগত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপরীতে এই ছাদভিত্তিক কর্মসূচিটি পরিচালিত হবে ওপেক্স (অপারেটিং এক্সপেন্ডিচার) মডেলের আওতায়। এতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সোলার সিস্টেমের স্থাপন, অর্থায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে এবং গ্রাহকেরা উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন।

নতুন এই মডেলের অধীনে বাসা-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানার জন্য সোলার প্যাকেজ তৈরি করতে সরকার বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ বা সেবা প্রদানকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করবে।

এই মডেলের ফলে কারখানা, অফিস ও অন্যান্য ভবনের মালিকেরা নিজেরা কোনো প্রাথমিক বিনিয়োগ না করেই সৌরবিদ্যুৎ বিনিয়োগকারীদের কাছে কার্যকরভাবে তাদের ছাদ ভাড়া দিতে পারবেন। বেসরকারি খাতের সোলার ইনস্টলেশন প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সরকারের এই সমন্বিত পদক্ষেপটি দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের দ্রুত বিস্তার এবং শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।

সুপারস্টার রিনিউয়েবলসের প্রধান নির্বাহী তোফায়েল আহমেদ এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ছাদভিত্তিক সোলার প্রসারের পাশাপাশি গুণগত মান বজায় রাখার জন্য—দেশজুড়ে সেবা প্রদানকারী বা সার্ভিস প্রোভাইডার নিয়োগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে তিনি আরও বলেন, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের চেয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার যদি সহজ এবং সাশ্রয়ী হয়, শুধু তবেই গ্রাহকরা এতে স্থানান্তরিত হতে আগ্রহী হবেন।

ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহিম বলেন, ‘৪,০০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য অর্জনে ওপেক্স প্রকল্পগুলোর ব্যাংকযোগ্যতা (ব্যাংকের অর্থায়ন সুযোগ), কম খরচে দ্রুত ঋণ পাওয়ার সুবিধা, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ক্রয়ের স্পষ্ট ও আকর্ষণীয় ট্যারিফ কাঠামো এবং নেট মিটারিংয়ের জন্য দ্রুত ও এক ছাতার নিচে (ওয়ান-স্টপ) অনুমোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।’ একই সঙ্গে জেলাভিত্তিক সার্ভিস প্রোভাইডার নির্বাচন এবং কাজের মান নিশ্চিত করতে একটি স্বচ্ছ অনুমোদন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মাসুদুর রহিম বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি এই বিষয়গুলো দ্রুত চূড়ান্ত করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিগত কাঠামো ও দ্রুত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তৈরি করা গেলে- বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, যা এই উচ্চাভিলাষী ৪,০০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্যকে বাস্তব রূপ দেবে।’

বিদ্যুৎ বিভাগের বৈঠকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো প্রস্তাবিত ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে কিছু উদ্বেগের কথাও তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি করা সৌর যন্ত্রপাতির শুল্ক কাঠামো, মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য হুইলিং চার্জ এবং ওপেক্স মডেলের অধীনে কোনো কারখানা সোলার সিস্টেম স্থাপনের পর বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকির বিষয়টি।

এমন এক সময়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ তীব্র জ্বালানি সংকটে রয়েছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহও চাপের মুখে রয়েছে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তিনটি মডেলের প্রস্তাব : বিদ্যুৎ বিভাগ ছাদভিত্তিক সোলারের জন্য তিনটি মডেলের প্রস্তাব করেছে। প্রথম মডেল অনুযায়ী, গ্রাহকেরা অফ-গ্রিড ভিত্তিতে উৎপাদিত বিদ্যুতের পুরোটাই নিজেরা ব্যবহার করবেন। দ্বিতীয় মডেল অনুযায়ী, গ্রাহকেরা তাঁদের প্রয়োজনমতো বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন। এ ক্ষেত্রে ভবনের ছাদের জন্য কোনো ভাড়া দিতে হবে না।

তৃতীয় মডেল অনুযায়ী, গ্রাহকরা উৎপাদিত বিদ্যুতের একাংশ ব্যবহার করবেন এবং বাকিটা গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। আর ছাদে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে ভবনমালিক ছাদের ভাড়া পাবেন। এই তৃতীয় মডেলের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো কারখানা, অফিস ও অন্যান্য ভবনের মালিকদের কাছ থেকে কোনো প্রাথমিক মূলধন না নিয়েই সোলার সিস্টেম স্থাপন করতে পারবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেবা প্রদানকারীরা সেচ ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ চালিত হিমাগার, ইভি (বৈদ্যুতিক যানবাহন) চার্জিং স্টেশন, ভাসমান সৌর প্রকল্প এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির জন্যও প্যাকেজ তৈরি করতে পারবে।

সহজ হচ্ছে নেট মিটারিং বিধিমালা : বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় আকারের ছাদভিত্তিক সোলার সিস্টেম স্থাপনের সুবিধার্থে ‘নেট মিটারিং নির্দেশিকা ২০২৫’ সংশোধনের পরিকল্পনা করছে সরকার।

প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী, সোলার ক্যাপাসিটি অনুমোদিত বিদ্যুৎ লোড অতিক্রম করলেও, গ্রাহকেরা সংশ্লিষ্ট বিতরণ অফিসের অনুমোদন সাপেক্ষে ১০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত সিস্টেম স্থাপন করতে পারবেন। সরকার আশা করছে, এই পরিবর্তনের ফলে আরও বেশি গ্রাহক বড় আকারের সোলার সিস্টেম স্থাপনে উৎসাহিত হবেন এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন।

গত ১২ জুলাই মন্ত্রিসভায় ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০’ অনুমোদনের ধারাবাহিকতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই কৌশলের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর জন্য ছাদভিত্তিক ৫,৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিতে স্থাপিত আরও ৪,৫০০ মেগাওয়াট সোলারের পাশাপাশি বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এলাকাভিত্তিক সেবা প্রদানকারী নির্বাচন : বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে ভৌগোলিক এলাকা অনুযায়ী বেসরকারি সেবা প্রদানকারীদের নির্বাচন করা হবে।

ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) রাজধানীতে তার নিজস্ব সেবা এলাকা এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) তাদের নির্ধারিত এলাকা পরিচালনা করবে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ এলাকা এবং রংপুর বিভাগ কভার করবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগ; নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) রাজশাহী বিভাগ এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) খুলনা ও বরিশাল বিভাগ তদারকি করবে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো গতকাল থেকে সার্ভিস প্রোভাইডারদের তালিকাভুক্তির কাজ শুরু করেছে।

মূল্যায়ন কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানি, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ এবং ন্যাশনাল লোড ডেসপাচ সেন্টারের প্রতিনিধিরা থাকবেন।

অগ্রাধিকার পাবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান : নির্বাচন পদ্ধতিতে যে জেলায় সেবা দেওয়া হবে, সেই জেলায় পরিচালিত কোম্পানিগুলোকে বাড়তি সুবিধা বা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

যে জেলায় কাজ করা হবে, সেই একই জেলায় পরিচালিত কোনো কোম্পানি বা তাদের প্রধান অংশীদার ৪০ পয়েন্ট পাবে। পার্শ্ববর্তী জেলা, একই বিভাগ বা অন্য বিভাগে অবস্থিত আবেদনকারীরা যথাক্রমে ২৫, ১৫ এবং ১০ পয়েন্ট পাবেন।

আবেদনকারীরা টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)-এর নিবন্ধন থাকলে ৫ পয়েন্ট এবং সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতার জন্য সর্বোচ্চ ৩০ পয়েন্ট পাবেন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে তরুণ উদ্যোক্তা এবং নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে, এই স্কোরিং সিস্টেমে স্টার্ট-আপ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ১৫ পয়েন্ট এবং নারী মালিকানাধীন একক স্বত্বার প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ পয়েন্ট রাখা হয়েছে।

আবেদনের সহজ শর্ত : আবেদনকারীদের বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, হালনাগাদ কর সনদ এবং অন্তত ১০ লাখ টাকার ব্যাংক সলভেন্সি বা আর্থিক সচ্ছলতার সনদ থাকতে হবে। তাদের অন্তত ২ কিলোওয়াটের একটি সোলার সিস্টেম স্থাপনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে অন-গ্রিড বা অফ-গ্রিড- উভয় ধরনের অভিজ্ঞতাই গ্রহণযোগ্য হবে। কোম্পানিগুলো এককভাবে বা যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) গঠন করে আবেদন করতে পারবে।

মনোনীত সার্ভিস প্রোভাইডারদের তালিকা ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈধ থাকবে; তবে কোনো প্রোভাইডারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কর্তৃপক্ষ তাকে তালিকা থেকে বাদ দিতে পারবে। আবেদনকারীদের আবেদনের জন্য ৫০০ টাকা এবং চূড়ান্ত নিবন্ধনের জন্য ৫,০০০ হাজার টাকা ফি দিতে হবে।