প্রিয়জনের পথ চেয়ে স্বজনরা

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

গুম হওয়া মানুষের তালিকা দীর্ঘ। কারও সন্তান, কারও বাবা আবার কারও স্বামী। বেশিরভাগই গত আওয়ামী সরকারের রোষানলের শিকার হয়ে গুম হয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনকালে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। তাদের কেউ কেউ ফিরে এলেও অনেকেই এখনও নিখোঁজ। পরিবারগুলো এখনও জানতে পারেনি তাদের প্রিয় মানুষটি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। তাই গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের প্রিয়জন ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা এক চিরন্তন ও মর্মস্পর্শী বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। বছরের পর বছর অতিবাহিত হলেও নিখোঁজ মানুষদের পরিবারগুলো এখনও আশায় বুক বেঁধে পথ চেয়ে বসে আছেন।

একদিন-দু’দিন নয়, বাবাকে ছাড়া ইনশা আর ইনামের কেটে গেছে প্রায় আট বছর। বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, জানা নেই পরিবারের কারোরই। বাবা, কবে ফিরবে? নিষ্পলক চাহনিতে শুধুই বাবাকে খুঁজে ফেরা। অশ্রুসজল অপেক্ষার প্রহর গুণে গুণে মলিন মুখগুলোতে মুছে গেছে হাসির রেখা। ইনশা বলেন, ‘তদন্ত কমিশন গঠন হওয়ার পর আমি আবার নতুন করে আশা দেখছি যে আমি আমার বাবাকে ফিরে পাব। আমি আশা রাখি যে আমার বাবা বেঁচে আছেন।’

২০১৯ সালের ১৯ জুন গুম হন ইসমাঈল হোসেন। ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যায় তাকে। হদিস মেলেনি আজও। নিখোঁজ প্রিয় মানুষটির আশায় দিন কাটছে স্ত্রী নাসরিন জাহানের। এখনও অপেক্ষা, ফিরে এসে ফের হাল ধরবেন সংসারের। নাসরিন জাহান বলেন, ‘আমার ছেলে মেয়ে প্রতিদিন ঘুমানোর আগে আমাকে প্রশ্ন করে যে মা, বাবা কি বেঁচে আছে? আমার কাছে তো প্রশ্নের উত্তরটা নেই। ছয় বছর হলো আমি এভাবে বহন করছি, আমি এখনও জানলামই না যে আমি বিধবা না কি সধবা। আমি বুঝতেই পারছি না যে আমার স্বামী আছে না কি আমার স্বামী নেই।’ গুম হওয়া মানুষদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করতে এমন কর্মকাণ্ড চালিয়েছে কর্তৃত্ববাদি আওয়ামী সরকার। ভিন্ন মতকে দমনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে তোলা হয় আয়নাঘরের গোপন বন্দিশালা।

ছেলের ছবি বুকে নিয়ে এক মায়ের কান্না ১৩ বছর ধরে। বিরোধী রাজনীতির বলি হয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে গুম হয় তার ছেলে। পরে, গড়ে তোলেন ‘মায়ের ডাক’ নামে সংগঠন। প্রিয় সন্তানের ফেরার অপেক্ষা নিয়েই এগিয়ে নিচ্ছেন গুমের বিরুদ্ধে জনমত গড়ার কাজ। সেই মা বলেন, ‘আমার ছেলে এখনও আমার চোখের আড়ালে আছে। শুনি এই হইছে, সেই হইছে, সবই কানে শুনি, কিন্তু আমার মানিককে তো আমি এত বছরের মধ্যে দেখিনি।’

বংশাল থানা ছাত্রদলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হোসেন গুমের এক যুগ হতে চলেছে। স্ত্রী ফারজানা আক্তারের গর্ভে রেখে যাওয়া ছেলে আরাফ হোসেন আজও বাবার মুখ দেখেনি। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা থেকেও হয়েছে বঞ্চিত। আড়াই বছর বয়সে বাবা হারা আদিবা ইসলাম হৃদি আজও ঘুমের ঘোরে বাবাকে ডাকে। আর দুই সন্তান নিয়ে স্বামীর সন্ধানে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন স্ত্রী।

সূত্রাপুর থানার ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড (বর্তমান ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড) ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি খালেদ হাসান সোহেল গুমেরও এক যুগ পার হয়েছে। পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারায় মো. সাদমান শিহাব আরিয়ান। তার বয়স এখন ১৭। এখনও সে বাবার পথ চেয়ে বসে থাকে। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে সোহেলের স্ত্রী সৈয়দা শাম্মি সুলতানার মানবেতর দিন কাটছে। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকা থেকে ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি অপহৃত হন ব্যবসায়ী মো. কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরী। স্বজনদের দাবি, রিয়েল এস্টেট কোম্পানির সঙ্গে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়। এখনও তিনি ফিরে আসেননি।

শুধু পারভেজ, সোহেল ও কুদ্দুসুসই নয়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলে গুমের শিকার ৩৫২ জন এখনও ফেরেননি। নিখোঁজের এ পরিসংখ্যান গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘মায়ের ডাক’র। তারা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তাও জানেন না স্বজনরা। তারা আজও পথ চেয়ে বসে আছেন-হয়ত একদিন ফিরে আসবে প্রিয় মানুষটি। অন্তর্বর্তী সরকার গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধানে গঠন করেছে ‘গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি।’ কিন্তু তারা এখনও নিখোঁজদের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এমন বাস্তবতায় আজ সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। প্রতিবছর দিবসটি উপলক্ষ্যে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়। দিবসটি উপলক্ষ্যে ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। মায়ের ডাকের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ আমলে গুম ছিলেন ৭০৫ জন। ৫ আগস্টের পর অনেকেই আয়নাঘর থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বিচারবহির্ভূত কোনোকিছুই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু গত ১৫ বছরে এমন বক্তব্যে কর্ণপাত করেনি বিগত সরকার বরং চূড়ান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিচয় দিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘বাংলাদেশে এ ধরনে পরিস্থিতি যেন আর কখনও না ঘটে। এবং একই সঙ্গে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যারা গুম হয়েছে এবং যারা ফেরত এসেছে, যারা এখনও আসেনি, আমরা মনে করছি যে তারা ফেরত আসতে পারে, সে সম্ভাবনাও আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই মানুষগুলো যেন ন্যায় বিচার পায়। গুমের শিকার প্রতিটি পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে।’

জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে গুমকে অভিহিত করা হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে। আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করার মধ্যদিয়ে দেশের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দৃঢ় হবে আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায় বিচার, এমনটাই আশা করছেন, স্বজন হারানো পরিবারগুলো। চাইছেন, নতুন বাংলাদেশে মুছে যাক গুমের সংস্কৃতি।

জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক দিবস, যা সাধারণভাবে ‘গুম দিবস’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ যখন এটি পালন করছে, তখন দেশটি তার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম উদ্বেগজনক অধ্যায়ের সম্মুখীন হচ্ছে। অধ্যায়টি ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাপক জোরপূর্বক গুমের অভিযোগে জর্জরিত। ভুক্তভোগীদের সম্মান জানানো, তাদের পরিবারকে সহায়তা করা এবং গোপন আটক ও জোরপূর্বক অপহরণের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতিবছর ৩০ আগস্ট দিবসটি পালন করা হয়। বছরের পর বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর কথিতভাবে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটিয়েছে। অনেক সময় তাদের স্বজনরা জীবিত না মৃত, সে বিষয়েও কোনো তথ্য জানতে পারেনি পরিবার।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গুম সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করলে বিষয়টি আরও জোরালোভাবে সামনে আসে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, তারা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ পেয়েছে এবং যাচাইয়ের পর তাদের তথ্যমতে, ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে এমন মামলা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়। কমিশনের সদস্যদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে এবং ধারণা করা হচ্ছে, ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার কখনোই কমিশনের কাছে আসেনি। কমিশন জোরপূর্বক গুমকে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং বলেছে, তাদের তদন্তে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কমিশন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে- বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমদ ও হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা আবদুল্লাহিল আমান আজমি, ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের ঘটনা।

অভিযোগগুলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বছরের পর বছর এমন ব্যক্তিদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যাদের কথিতভাবে সাদা পোশাকের নিরাপত্তা সদস্যরা তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যেতেন এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আটকে রাখতেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো ২০০৯ সাল থেকে ৭০৮টি কথিত জোরপূর্বক গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, আর র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন ২ শতাধিক কথিত গুমের ঘটনায় জড়িত ছিল। ঘটনাগুলোর মধ্যে যে ঘটনাটি এই প্রবণতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, তার একটি হলো বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়া। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গাড়িচালকসহ তিনি নিখোঁজ হন। তার অবস্থান সম্পর্কে এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমের নিখোঁজ হওয়া। ২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকায় তাকে সাদা পোশাকধারী নিরাপত্তা সদস্যরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তার কোনো সন্ধান আর পাওয়া যায়নি। কমিশনের অনুসন্ধানের ফলাফল এসব দীর্ঘদিনের ঘটনাকে আবারও জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ২০২৬ সালের জুনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এক সাক্ষী বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাবেক জ্যেষ্ঠ র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের কথিত ভূমিকা নিয়ে সাক্ষ্য দেন।

কথিত গুমের শাসনব্যবস্থার অন্যতম শিহরণ জাগানো প্রতীক ছিল ‘আয়নাঘর’, যে শব্দটি এমন গোপন আটককেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, যেখানে ভুক্তভোগীদের কথিতভাবে স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে আটকে রাখা হতো। জোরপূর্বক গুম বিষয়ে তদন্ত কমিশন বলেছে, তাদের তদন্তে গোপন আটককেন্দ্র এবং এমন একটি ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেখানে অভিযানগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে খণ্ডিতভাবে পরিচালিত হতো, ফলে দায় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়তো। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কমিশনের প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা এরমধ্যে ১ হাজার ৬৭৬টি অভিযোগ পেয়েছে এবং অনুমান করেছে যে, জোরপূর্বক গুমের সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার গুমের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং এসব ঘটনা গোপন রাখার লক্ষ্যে একটি ‘সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা’র কথা বলা হয়।

পরবর্তী সময়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বলেছিল, সারা দেশে এ ধরনের শত শত গোপন আটককেন্দ্র ছিল, আর অনেক ভুক্তভোগী মাস বা বছর ধরে বন্দি থাকার পর ফিরে এসেছেন এবং অন্যরা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। জোরপূর্বক গুম বিষয়ে তদন্ত কমিশন গুমের ঘটনায় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মাত্রা খুঁজে পেয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবিত ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ছিলেন জামায়াত-শিবিরের নেতা বা কর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও এর সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কমিশনের মতে, যারা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

এই অনুসন্ধান দীর্ঘদিনের সেই অভিযোগকে আরো জোরালো করেছে যে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, নীরব করা বা নিষ্ক্রিয় করার জন্য জোরপূর্বক গুমকে ব্যবহার করা হয়েছে। একই সময়ে সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোরপূর্বক গুমের কোনো নীতি পরিচালনার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিল। আওয়ামী লীগের পুরো মেয়াদজুড়েই বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ছিল। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের বিষয়ে তথ্যের দাবিতে বারবার বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করেছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলোর গঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’ সত্য ও জবাবদিহির দাবিতে অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকায় পরিবারগুলো ও অধিকারকর্মীরা মামলাগুলোর আন্তর্জাতিক মানের তদন্তের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেন। ভুক্তভোগীদের স্বজনরা বছরের পর বছর ধরে চলা অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় তদন্তের দুয়ার খুলে দেয়। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট জোরপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন করে, যা অপরাধটি প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে সুরক্ষার ক্ষেত্রে দেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করে। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করে। যাতে তদন্ত, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা এবং গুমের ঘটনাগুলোর জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের ব্যবস্থা রাখা হয়।

অধ্যাদেশে গোপন আটককেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও ব্যবহারকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সরকার পরবর্তীতে একটি স্থায়ী আইনি কাঠামোর দিকে এগিয়ে যায়। ২০২৬ সালের মে মাসে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে পরামর্শের পর যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে, যাতে দায়ীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যায় এবং বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুম আর কখনও ফিরে আসতে না পারে। ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ শিরোনামের খসড়া আইনটি জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ, দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষা ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে।

এতে জোরপূর্বক গুমকে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যুর ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারকে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও ক্ষতিপূরণ তহবিল পাওয়ার জন্য ‘গুম সনদ’ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

গত ৪ আগস্ট থেকে জনমত গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়া আইনটি বর্তমানে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্প জানিয়েছে, তারা ওই সময়ের নথি সংরক্ষণ করবে, যার মধ্যে জোরপূর্বক গুম, হত্যাকাণ্ড এবং কথিত আয়নাঘর আটকব্যবস্থার বিষয়ও থাকবে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ গুম ও হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত নির্দেশনা রয়েছে বলে কথিত অডিও রেকর্ডিংও সংগ্রহ করেছে। বাংলাদেশ যখন ‘গুম দিবস’ পালন করছে, তখন নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর গল্প এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। পরিবারগুলোর দাবি শুধু ক্ষতিপূরণ বা স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা জানতে চায়, তাদের ছেলে, মেয়ে, স্বামী, বাবা ও ভাইদের কী হয়েছিল এবং তারা চায় দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা হোক।

তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধান, চলমান ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম এবং প্রস্তাবিত আইনি কাঠামো জোরপূর্বক গুমের বিষয়টি মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা করা, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আর কখনও এমনভাবে ব্যবহার করতে না দেওয়া।