বেতন বাড়ল সরকারি চাকরিজীবীদের
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল কাঙ্ক্ষিত নবম পে-স্কেলের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তিন ধাপে কার্যকর হবে এই পে-স্কেল। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-১ এ সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। আর ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। গতকাল সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৪২ ও সবনিম্ন ১০০ শতাংশ বেতন বাড়বে, যা বাস্তবায়িত হবে তিন ধাপে। এ ক্ষেত্রে গ্রেড-১ এর জন্য ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০তম গ্রেডের জন্য বেতন ২০ হাজার টাকা। এ ছাড়াও ৯ম পে-স্কেল অনুযায়ী প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু হতে যাচ্ছে। যার আওতায় মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে একই সঙ্গে নতুন বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ চূড়ান্ত করতে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া চূড়ান্ত করে এই কমিটি। অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তরর্বতী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। নবম বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
কমিশনের হিসাবে, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে বর্তমানে বছরে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ বরাদ্দ ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তখন তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোয় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়ছে?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা অধিকতর যৌক্তিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সরকার 'জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬' অনুমোদন করেছে। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন পুনরির্নধারণ করা হয়েছে। নতুন বেতনস্কেলে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার গ্রেডভেদে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। নতুন বেতনস্কেলের তথ্য অনুযায়ী, ১ম থেকে ১১তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ শতাংশ করে বাড়ানো হয়েছে। আর ১২তম গ্রেড থেকে নিচের গ্রেডগুলোতে বৃদ্ধির হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে।
১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ২য় গ্রেডে ৬৬ হাজার থেকে ৭৬ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। ৩য় গ্রেডে বর্তমান ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে ৯৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা। ৪র্থ গ্রেডে ৫০ হাজার থেকে ৯১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা। ৫ম গ্রেডে ৪৩ হাজার থেকে ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা। ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬৭ হাজার ১০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ৭ম গ্রেডে বর্তমান ২৯ হাজার থেকে ৬৩ হাজার ৪১০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৮০০ টাকা। ৮ম গ্রেডে ২৩ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ৪৭০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৪৬ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৮০০ টাকা। ৯ম গ্রেডে ২২ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৬০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা। ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার থেকে ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা। ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ থেকে ৩০ হাজার ২৩০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা। এই ১১টি গ্রেডেই প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ।
এরপর ১২তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১১৫ শতাংশ। এই গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা।
১৩তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১১৮ শতাংশ। এ গ্রেডে ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার ৫৯০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা।
১৪তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১৩০ শতাংশ। এই গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৪ হাজার ৬৮০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা। ১৫তম ও ১৬তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৩৫ শতাংশ। ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২৩ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার ৮০০ থেকে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা। ১৬তম গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২২ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৯০০ থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা। ১৭তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৩৮ শতাংশ। এ গ্রেডে ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা। ১৮তম গ্রেডে বৃদ্ধির হার ১৩৯ শতাংশ। এই গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার ৩১০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার থেকে ৫০ হাজার ৯০০ টাকা। ১৯তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪১ শতাংশ। এ গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫৭০ টাকা পর্যন্ত বেতন বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা। সবশেষে ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ। এই গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার ১০ টাকা পর্যন্ত বর্তমান মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা। নতুন বেতনস্কেলে এভাবেই উচ্চতর গ্রেডগুলোতে ১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে নিচের গ্রেডগুলোতে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিটি দুই ধাপে বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের কথা বলেছিল। এর মধ্যে প্রথম বছরে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর হতে পারে বলে আলোচনা ছিল। সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে গৃহীত কার্যক্রম নিয়ে সম্প্রতি 'জনগণের সরকারের ১৮০ দিন' শীর্ষক ই-বুক প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সেখানে 'নবম পেুস্কেল: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর' শীর্ষক উপশিরোনামে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তার আগে অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তরর্বতী সরকার সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করেছিল। তারা অন্তরর্বতী সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল গত জানুয়ারিতে। ওই কমিশন বিদ্যমান গ্রেড ২০টি বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল। আর সর্বোচ্চ বেতনকাঠামো নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল নির্ধারিত ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
