ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম পর্যন্ত যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়ককে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরে মূল এক্সপ্রেসওয়ের পাশাপাশি দুইপাশে সার্ভিস লেন, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস ও ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অর্থায়ন নিশ্চিত হলে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু করে ২০৩২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। বিপুল ব্যয়ের এই প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট কমাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সীতাকুণ্ড নাগরিক সমাজের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মন্ত্রীর মেহেদীবাগস্থ বাসভবনে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়কালে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান। সাক্ষাৎকালে সীতাকুণ্ড নাগরিক সমাজের নেতারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট নিরসনে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সীতাকুণ্ডের সমুদ্র উপকূলীয় বেড়িবাঁধের উপর মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিশেষ করে সীতাকুণ্ড অংশে বড় দারোগারহাট থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের দাবিও তুলে ধরেন তারা। জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী সরকারের পক্ষ থেকে যাত্রাবাড়ী থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। পরে সীতাকুণ্ড নাগরিক সমাজের নেতারা তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সংবলিত একটি স্মারকলিপি মন্ত্রীর কাছে পেশ করেন। এতে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির লাইন সীতাকুণ্ড পর্যন্ত সম্প্রসারণসহ সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও দাবির বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সহযোগিতা কামনা করা হয়।

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডরগুলোর একটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। রাজধানীর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, বাণিজ্যিক অঞ্চল ও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান সড়ক এটি। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে এই মহাসড়ক দিয়ে। কিন্তু জনবসতি, বাজার, শিল্পাঞ্চল, আঞ্চলিক সড়কের সংযোগ, অপরিকল্পিত ইউটার্ন ও যানজটের কারণে মহাসড়কটির অনেক অংশে স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু মহাসড়ক প্রশস্ত করার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারসহ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ছয় লেনের মূল সড়ক, দুই পাশে সার্ভিস লেন

প্রস্তাবিত প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ছয় লেনের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত সড়ক। মূল এক্সপ্রেসওয়ের পাশাপাশি দুই পাশে সার্ভিস লেন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে স্থানীয় যানবাহন ও দূরপাল্লার যানবাহনের চলাচল আলাদা করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে স্থানীয় বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, পণ্যবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি একই সড়ক ব্যবহার করে। বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থানীয় যানবাহনের ওঠানামা এবং পথচারীদের চলাচলের কারণে দূরপাল্লার যানবাহনও বাধাগ্রস্ত হয়। প্রস্তাবিত সার্ভিস লেন চালু হলে স্থানীয় যানবাহন মূল এক্সপ্রেসওয়েতে না উঠে নির্ধারিত সার্ভিস লেন ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে দূরপাল্লার যানবাহন মূল সড়কে অপেক্ষাকৃত বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারবে। এতে একদিকে যাতায়াতের সময় কমবে, অন্যদিকে সড়কের সক্ষমতাও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ফ্লাইওভার-আন্ডারপাস

এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি করিডরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যানজট নিরসনে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস ও ইন্টারচেঞ্জ। সওজের প্রস্তাবে সাইনবোর্ড, শিমরাইল, মদনপুর, বারইয়ারহাট, আবুতোরাব বাজার ও সলিমপুর এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ও যানজটপ্রবণ অংশগুলোতে উড়াল সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে মূল মহাসড়কের যানবাহনকে স্থানীয় যান চলাচল থেকে আলাদা করার লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী থেকে মদনপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রামের সলিমপুর থেকে সাগরিকা পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণের একটি প্রস্তাবও রয়েছে। তবে কোন অংশ ভূমিতে এবং কোন অংশ উড়ালপথে নির্মিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে চূড়ান্ত নকশা নির্ধারণ করা হবে।

সম্ভাব্য ব্যয় ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক অর্থায়নের মাধ্যমে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকও সহ-অর্থায়নে আগ্রহী। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এত বড় প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন, টোল থেকে আয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধরন নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থায়নের শর্ত, সুদের হার, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা- সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।

পিপিপি থেকে সরকারি প্রকল্প

ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই করিডোরকে এক্সপ্রেসওয়েতে উন্নীত করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এডিবির সহায়তায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকৌশল নকশা এবং অর্থায়ন কাঠামো তৈরির কাজও হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও সামনে আসে। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রূপ পায়নি। নতুন করে ছয় লেনের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ের পরিকল্পনা সামনে আসায় দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিকল্প পরিকল্পনাও আছে

ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরের ভবিষ্যৎ অবকাঠামো নিয়ে শুধু সওজ নয়, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষও কাজ করছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ রয়েছে তাদের। ফলে একই করিডরে একাধিক বড় প্রকল্প যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোন পথে কত লেনের সড়ক হবে, কোথায় উড়ালপথ প্রয়োজন, কোথায় বিদ্যমান সড়ক ব্যবহার করা যাবে এবং কোথায় নতুন জমি অধিগ্রহণ করতে হবে- এসব বিষয় সমন্বিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ করলেই হবে না; ভবিষ্যতে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে রেল, সড়ক ও নৌপথের সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ হবে দ্রুত

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্ব শুধু যাত্রী পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ এই করিডোরের ওপর নির্ভরশীল। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। আমদানি করা শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই করিডোর দিয়ে বন্দরে পৌঁছায়। গার্মেন্টস শিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাসড়কে যানজট হলে শুধু যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন না, পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয়ও বেড়ে যায়। একটি ট্রাক নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় রাস্তায় আটকে থাকলে জ্বালানি ব্যয় বাড়ে, চালান পৌঁছাতে দেরি হয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে এসব ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বন্দর থেকে রাজধানী এবং রাজধানী থেকে বন্দরমুখী পণ্য পরিবহনে সময়ের নিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

কমবে যানজট, বাড়বে সড়কের গতি

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড় সমস্যা হচ্ছে বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহনের গতি হঠাৎ কমে যাওয়া। কোথাও বাজার, কোথাও বাসস্ট্যান্ড, কোথাও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ- প্রায় পুরো করিডরেই স্থানীয় ও আন্তঃজেলা যানবাহনের মিশ্র চলাচল রয়েছে। প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ইন্টারচেঞ্জ ছাড়া মূল সড়কে যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না। ফলে হঠাৎ করে গাড়ি ঢুকে পড়া, ইউটার্ন নেওয়া কিংবা রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠানামার মতো ঘটনা কমানো সম্ভব হবে। সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এক্সপ্রেসওয়ের পাশাপাশি পথচারী পারাপার, সার্ভিস লেন, স্থানীয় পরিবহন এবং মহাসড়কের দুই পাশের জনবসতির সঙ্গে সংযোগের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনা না করলে নতুন ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

জমি অধিগ্রহণ বড় চ্যালেঞ্জ

এত বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে জমি অধিগ্রহণ। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে শুরু করে কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অংশে মহাসড়কের দুই পাশে বসতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা রয়েছে। নতুন সার্ভিস লেন, ইন্টারচেঞ্জ, ফ্লাইওভার কিংবা সংযোগ সড়কের জন্য অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন হলে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা তৈরির সময় যতটা সম্ভব বিদ্যমান সড়কের জমি ব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উড়ালপথ নির্মাণের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।

শুধু নির্মাণ নয়, রক্ষণাবেক্ষণেও গুরুত্ব

বাংলাদেশে বড় সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ের মতো ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণের পর সেটির মান ধরে রাখতে হলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আলোকসজ্জা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এক্সপ্রেসওয়ের টোল থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের একটি অংশ মেটানোর সুযোগ থাকতে পারে। তবে টোলের হার এমন পর্যায়ে রাখতে হবে, যাতে পণ্যবাহী ও গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়।

সময়মতো শেষ করাই বড় পরীক্ষা

প্রস্তাবিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৭ সালের শুরুতে কাজ শুরু হলে ২০৩২ সালের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, অর্থায়ন, ঠিকাদার নিয়োগ এবং নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে সময় বাড়ার নজির রয়েছে। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও শুরুতেই বিস্তারিত সমীক্ষা শেষ করে চূড়ান্ত নকশা ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতিতে বড় প্রভাবের সম্ভাবনা

ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়িত হলে শুধু রাজধানী ও বন্দরনগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থাই বদলাবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। দ্রুত পণ্য পরিবহন হলে শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে। আমদানি-রপ্তানি পণ্যের পরিবহন সময় কমলে ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরের আশপাশে নতুন শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক হাব, গুদাম ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঠেকাতে এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে ভূমি ব্যবহার ও শিল্প স্থাপনের বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্পে পরিণত হতে পারে। প্রায় ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ও চট্টগ্রামের মধ্যে সড়ক যোগাযোগে নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নির্মাণকাজের ওপর নয়; সময়মতো অর্থায়ন, বাস্তবসম্মত নকশা, জমি অধিগ্রহণের দক্ষতা, নির্মাণের মান, টোল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করার ওপরও। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের পথে কতটা এগোয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।