ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্যে এডিস মশার বিস্তার ঠেকাতে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তিন মাসব্যাপী বিশেষ প্রতিরোধ অভিযান। রাজধানী ঢাকাসহ সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় একযোগে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশকনিধন এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এ অভিযানের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রতি সপ্তাহে এক ঘণ্টা করে পরিচ্ছন্নতায় সময় দিলে ডেঙ্গু পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের পরিবর্তন আনতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবাই মিলে দেশ গঠন করতে চাইলে কোনো বাধাই তা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। সরকারপ্রধান বলেন, আগামী তিন মাস ডেঙ্গু সমস্যা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। প্রতি সপ্তাহে এক ঘণ্টা করে পরিচ্ছন্নতার জন্য সময় দিলে অবশ্যই পরিস্থিতির পরিবর্তন আসবে। সবাইকে যত্রতত্র ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, পরিচ্ছন্ন দেশ গড়তে প্রত্যেক নাগরিকের ভূমিকা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের মানুষ দেখিয়ে দিয়েছে পরিবর্তন সম্ভব। এবার রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করি।
তিন মাসব্যাপী এই অভিযানের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ বাসাবাড়ি, আঙিনা ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা পানি অপসারণ এবং এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সচেতন করা হবে। দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই তিন মাসব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা এবং আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে পরিচালিত এ অভিযানে বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, নির্মাণাধীন ভবন, হাসপাতাল, বাজার ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে জমে থাকা পানি অপসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করতে নিয়মিত অভিযান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভিসাইড ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হবে।
বাড়ছে উদ্বেগ : প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। বিশেষ করে রাজধানী ও ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ায় রোগটি এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয় বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকা, ছাদ ও বারান্দায় বিভিন্ন পাত্রে পানি জমে থাকা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি এডিস মশার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনও মশার বংশবিস্তারের সুযোগ বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তিন মাসের বিশেষ অভিযানকে স্বাগত জানালেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অভিযানকে নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে। শুধু রোগের প্রকোপ বাড়ার পর অভিযান জোরদার করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর : অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। বাড়ির ছাদে পড়ে থাকা পাত্র, ফুলের টবের নিচের ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল, নির্মাণসামগ্রীর পাত্র এবং বিভিন্ন ধরনের জলাধারে জমে থাকা পানি এ মশার প্রজননের জন্য উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে নগরবাসীকে সপ্তাহে অন্তত এক দিন নিজেদের বাড়ি ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে কোথাও পানি জমে আছে কি না তা দেখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জমে থাকা পানি অপসারণের পাশাপাশি যেসব পাত্রে পানি রাখা প্রয়োজন, সেগুলো ঢেকে রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অভিযানের আওতায় নির্মাণাধীন ভবনগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। এসব স্থানে বিভিন্ন গর্ত, বেজমেন্ট, ড্রাম, বালতি ও নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে পানি জমে থাকার সম্ভাবনা বেশি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মাঠে নামছে স্থানীয় প্রশাসন : তিন মাসের এ কর্মসূচিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে নিজেদের আওতাধীন এলাকায় মশকনিধন কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ স্থানীয় পর্যায়ে রোগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, রোগী শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করবে। মশকনিধন কর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি এলাকায় যতক্ষণ পর্যন্ত বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে পানি জমে থাকবে, ততক্ষণ শুধু রাস্তা বা উন্মুক্ত স্থানে কীটনাশক ছিটিয়ে মশার সংখ্যা কার্যকরভাবে কমানো কঠিন।
মাঠে ডিএনসিসির দেড় হাজার সদস্য : জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১ হাজার ৫০০ সদস্যের সমন্বয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার থেকে ২৪টি দলে ভাগ হয়ে ডিএনসিসির ১০টি অঞ্চলের ৫৪টি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন, এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ইমরুল কায়েস প্রধানমন্ত্রীকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ডিএনসিসির বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং ব্যবহৃত কার্যকর উপকরণ সম্পর্কে অবহিত করেন।
ডিএনসিসি জানিয়েছে, জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এর আওতায় ডিএনসিসির অঞ্চল-৫, বিশেষ করে সংসদ ভবন ও এর আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ সোর্স রিডাকশন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং লার্ভা নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিএনসিসির ১০টি অঞ্চলের ৫৪টি ওয়ার্ডে জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবসের কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রমে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল এবং আগে শনাক্ত ডেঙ্গু হটস্পটগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ডিএনসিসি বলছে, এই কার্যক্রমে শুধু মশক নিধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা, উৎস ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভিসাইড প্রয়োগের মাধ্যমে সোর্স রিডাকশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাড়ি বাড়ি অভিযান : ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন এলাকায় আজ শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে বাড়ি বাড়ি অভিযান। এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে ২৪টি দলে ভাগ হয়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কর্মী মাঠে কাজ করবেন। জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে সকাল ৯টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে প্রধানমন্ত্রীর দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম উদ্বোধনের পরই এ কর্মসূচি শুরু হবে। ডিএনসিসি জানিয়েছে, দিবসটি উপলক্ষে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে একটি তথ্য স্টল স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, এডিস মশা দমন এবং নাগরিকদের করণীয় বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য ও সচেতনতামূলক উপকরণ প্রদর্শন করা হবে।
এদিকে জাতীয় কর্মসূচিকে ঘিরে ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে অঞ্চল-৫, বিশেষ করে সংসদ ভবন ও আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ সোর্স রিডাকশন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং লার্ভানিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। ডিএনসিসি জানায়, এ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য অঞ্চল-২, ৩ ও ৪ থেকে নির্ধারিত সংখ্যক সুপারভাইজার ও মশককর্মীকে সাময়িকভাবে অঞ্চল-৫-এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়া কর্মীরা নিজ নিজ এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে যাবেন। এ ছাড়া অঞ্চল-১, ৬, ৭, ৮ ও ৯-সহ ডিএনসিসির অন্যান্য এলাকাতেও সমন্বিতভাবে বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এসব এলাকায় চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল এবং আগের হটস্পটগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অভিযান চালানো হবে। ডিএনসিসির ভাষ্য, এবারের কার্যক্রমে শুধু মশক নিধনের ওপর নয়, বরং এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত, উৎস ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভিসাইড প্রয়োগের মাধ্যমে সোর্স রিডাকশনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর্মসূচির সার্বিক তদারকি ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। মাঠপর্যায়ে জনবল মোতায়েন, কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং চিহ্নিত প্রজননস্থল ধ্বংসের বিষয়টি নিয়মিত মনিটর করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসাব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার তাগিদ : ডেঙ্গু প্রতিরোধের পাশাপাশি সম্ভাব্য রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডেঙ্গু পরীক্ষা করার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুতে জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা কিংবা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে রোগীর অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও কিছু বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার এড়িয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় শয্যা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা-সুবিধা প্রস্তুত রাখা দরকার।
শুধু অভিযান নয়, দরকার ধারাবাহিকতা : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তিন মাসের অভিযান কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন ও পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর। অতীতে বিভিন্ন সময় মশকনিধন অভিযান পরিচালিত হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর অনেক এলাকায় আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। মশার ঘনত্ব ও লার্ভার উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, কার্যকর কীটনাশক ব্যবহারের পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হবে।
তাঁরা মনে করেন, মশকনিধন কর্মসূচির সফলতা যাচাইয়ে শুধু কত লিটার কীটনাশক ছিটানো হয়েছে বা কতটি এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে—এ ধরনের পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। কোথায় কতটি প্রজননস্থল ধ্বংস হয়েছে, মশার ঘনত্ব কতটা কমেছে এবং ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ও সংক্রমণের প্রবণতায় কী পরিবর্তন এসেছে, সেসব সূচকও বিবেচনায় নিতে হবে।
নাগরিকদের দায়িত্বও কম নয় : ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের দায়িত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, একটি বাড়ির ভেতরে জমে থাকা পানি যেমন ওই পরিবারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি আশপাশের মানুষের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে। তাই বাড়ির মালিক ও বাসিন্দাদের পাশাপাশি বাড়ির মালিক সমিতি, আবাসিক কমিটি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট একটি দিন বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া, পানি জমতে পারে এমন অপ্রয়োজনীয় পাত্র সরিয়ে ফেলা, পানির ট্যাংক ও অন্যান্য জলাধার ঢেকে রাখা এবং ছাদ ও বারান্দা পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। শিশু-কিশোরদের ডেঙ্গুর ঝুঁকি ও প্রতিরোধের পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো হলে তারা পরিবার ও প্রতিবেশীদেরও সচেতন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমন্বিত উদ্যোগই সাফল্যের চাবিকাঠি : ডেঙ্গু মোকাবিলায় তিন মাসের এ অভিযানকে কার্যকর করতে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি কর্পোরেশন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং সাধারণ নাগরিক— সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। শুধু মশা নিধন বা হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা; এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। নিয়মিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ, মানসম্মত চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা— সবগুলো কার্যক্রম একই সঙ্গে চালাতে হবে। তিন মাসের বিশেষ অভিযান তাই কেবল একটি মৌসুমি কর্মসূচি না হয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করবে— এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। আর এ উদ্যোগ সফল করতে সরকারি তৎপরতার পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি পাড়া-মহল্লার ভূমিকা রয়েছে।
