সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

সাত ধাপে সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম পাঁচ ধাপেই অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে কমিশনের। মামলা সংক্রান্ত জটিলতা, সীমানা-সংক্রান্ত সমস্যা কিংবা অন্যান্য কারণে যেসব ইউনিয়নের নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে করা সম্ভব হবে না, সেগুলোকে ষষ্ঠ ও সপ্তম ধাপে নেওয়া হবে। আগামী ১২ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের এই প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা শেষ হবে ২০২৭ সালের ২৭ মে। গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ইউপি নির্বাচন নিয়ে কমিশনের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ভোট হবে চলতি বছরের ১২ নভেম্বর। দ্বিতীয় ধাপের ভোটের জন্য ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ধাপের জন্য ৩০ ডিসেম্বর তারিখ প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি চতুর্থ ধাপ, ৪ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম ধাপ, ২২ এপ্রিল ষষ্ঠ ধাপ এবং ২৭ মে সপ্তম ধাপের ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইসি সূত্র জানায়, দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ২৭২টির নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের প্রয়োজন রয়েছে। আইন অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, বিভিন্ন বার্ষিক পরীক্ষা, ধর্মীয় উৎসবসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সাত ধাপে ভোট গ্রহণের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সময়সূচি নয়। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ইউপি নির্বাচন আয়োজনের সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। ওই সভার পর ভোটের ধাপ ও অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত করা হবে।
কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পাঁচ ধাপেই অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে। ষষ্ঠ ও সপ্তম ধাপ মূলত রাখা হচ্ছে। মামলা বা অন্যান্য জটিলতার কারণে যেসব ইউনিয়নের নির্বাচন নির্ধারিত ধাপে করা সম্ভব হবে না, সেগুলো পরবর্তী ধাপে নেওয়া হবে। বর্তমানে এমন ৫৬টি ইউনিয়ন রয়েছে, যেগুলোর নির্বাচন বিভিন্ন কারণে পিছিয়ে যেতে পারে। এসব ইউনিয়নসহ বাকি ইউনিয়নগুলোর জন্য শেষ দুই ধাপ রাখা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে ৬৩ জেলার ৮০ উপজেলা : প্রথম ধাপে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ঠাকুরগাঁও জেলা বাদে ৬৩ জেলার প্রায় ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে একটি উপনির্বাচন থাকায় ওই জেলার ইউপি নির্বাচন কার্যক্রম দ্বিতীয় ধাপে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রথম ধাপে উপজেলা বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সাধারণত জেলার সদর উপজেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে যেসব জেলায় উপজেলার সংখ্যা বেশি, সেসব জেলার ক্ষেত্রে ভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার মতো অধিক উপজেলা থাকা জেলায় তিনটি করে উপজেলা প্রথম ধাপে রাখা হচ্ছে। আর ১০ বা তার বেশি উপজেলা রয়েছে—এমন জেলাগুলোতে দুটি করে উপজেলা প্রথম ধাপে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্র, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নির্বাচনসামগ্রী সরবরাহ এবং ভোট গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চাপ—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ইউনিয়নে ভোট না নিয়ে কয়েকটি ধাপে নির্বাচন সম্পন্ন করার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার লক্ষ্য রয়েছে কমিশনের।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বৈঠক ২১ সেপ্টেম্বর : ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। এর চার দিন পর ২১ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভা হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এসব সভায় নির্বাচনের প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হবে। কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হবে। ওই সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলোও আলোচনা হবে।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপেরও উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো একটি সুসংগঠিত নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হবে। প্রতিটি দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি সংলাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
ইসি সূত্র জানায়, সংলাপে ইউপি নির্বাচনসহ নির্বাচন ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হতে পারে। মাঠপর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোটারদের নিরাপত্তা, নির্বাচনী পরিবেশ এবং কমিশনের প্রস্তুতি— এসব বিষয়েও দলগুলোর মতামত নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
বিদ্যমান আইনেই নির্বাচন : ইউপি নির্বাচনের আগে নির্বাচনী আইন সংশোধন করা হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, প্রাথমিকভাবে বিদ্যমান আইন অনুযায়ীই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে যে আইন রয়েছে, তার অধীনেই ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আইন সংশোধনের কোনো প্রয়োজন হলে সেটি পরবর্তী সময়ে বিবেচনা করা হতে পারে। তবে নির্বাচন আয়োজনের বর্তমান প্রস্তুতি বিদ্যমান আইনের ভিত্তিতেই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইসি কর্মকর্তাদের মতে, ইউপি নির্বাচন দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় নির্বাচনী আয়োজনগুলোর একটি। কয়েক হাজার ইউনিয়নে একযোগে নির্বাচন আয়োজনের পরিবর্তে ধাপে ধাপে ভোট গ্রহণ করা হলে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনসামগ্রী সরবরাহ, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারির কাজও তুলনামূলকভাবে কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে।
কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোটের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবারের ইউপি নির্বাচন। এরপর ডিসেম্বরেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের ভোট হবে। নতুন বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আরও চার ধাপে নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অন্যান্য বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
এখন পর্যন্ত কমিশনের হাতে থাকা পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পাঁচ ধাপে অধিকাংশ ইউনিয়নের ভোট শেষ করাই মূল লক্ষ্য। আর শেষ দুই ধাপ রাখা হচ্ছে মূলত জটিলতায় আটকে থাকা ইউনিয়নগুলোর জন্য। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা এবং ২১ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভার পর সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা আরও স্পষ্ট হবে। এরপর কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করবে।
