গবেষণা

হামের ৫৯ শতাংশ সংক্রমণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

হামে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২০০ শিশুর ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ১৬৭ জনের টিকা নেওয়া ছিল না। তাদের মধ্যে অবশ্য ৯১ জনই তখন নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছায়নি। ১৭ জন হাম আক্রান্তের নমুনা জিনোম সিকোয়েন্সিং করে প্রত্যেকের নমুনাতে বি-থ্রি জেনোটাইপ শনাক্ত করেছে গবেষক দল, যা টিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। হামে আক্রান্ত শিশুদের গুরুতর অসুস্থতার নেপথ্যে অপুষ্টিই প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গবেষণায়। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩১ শতাংশ তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। সংক্রমিত শিশুদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে হামে আক্রান্ত হয়েছে, যা হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে। গবেষণার ফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে বছরব্যাপী টিকা কর্মসূচি চালু রাখা এবং হাম আক্রান্তদের আইসোলেশন কঠোরভাবে অনুসরণের প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া চট্টগ্রামে হামের রোগীদের চিকিৎসায় ডেডিকেটেড একটি হাসপাতাল চালুর প্রস্তাব দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে করে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানো অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

'বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব: রোগের বিস্তার, উপসর্গ, জেনেটিক বিশ্লেষণ ও মা-শিশুর অ্যান্টিবডির অবস্থা' শিরোনামে এ গবেষণা হয়। গত বুধবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সম্মেলন কক্ষে গবেষণার ফল তুলে ধরা হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়া ২০০ শিশু এবং এসব শিশুদের ১০০ জন মায়ের তথ্য নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এআিএফ) এ গবেষণা চালায়।

গ্রামে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বেশি আক্রান্ত : গবেষণায় অংশ নেওয়া ২০০ শিশুর মধ্যে ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ তারা নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে ১৪৮ জন (৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ) গ্রামীণ এলাকার এবং ১২৭ জন (৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ) নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবারের শিশু। গবেষণায় 'প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর' ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার। তিনি বলেন, "প্রাদুর্ভাবের বড় একটি অংশ গ্রামীণ এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা প্রমাণ করে, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই ভাইরাসের চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।"

আক্রান্তদের মধ্যে গুরুতর হামজনিত জটিলতা ও হামের তীব্রতা বৃদ্ধিতে পুষ্টিহীনতা বড় একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

এতে দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। এছাড়া ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ শিশুকে বুকের দুধের বাইরে অন্য খাবার খাওয়ানো হয়, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিটামিন 'এ' হামের মারাত্মক জটিলতা প্রতিরোধে সহায়তা করে। কিন্তু আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মাত্র ৬৩ জন (৩২ শতাংশ) শিশু গত ছয় মাসে ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল পেয়েছে, যা একটি বড় ধরনের ঘাটতি নির্দেশ করে।

ডা. কামরুন নাহার বলেন, "যেসব শিশু ভিটামিন 'এ' পায়নি, তাদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ শিশুর মারাত্মক ও তীব্র জটিলতা দেখা দিয়েছে। গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয় যে, শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো হামের তীব্রতা কমাতে পুরোপুরি সক্ষম নয়, এর সঙ্গে অন্যান্য চিকিৎসা ও পুষ্টি অপরিহার্য।"

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাঝারি বা তীব্র পুষ্টিহীনতা, গ্রামীণ বা বস্তি এলাকায় বসবাস, দারিদ্র্য, অতিরিক্ত জনবহুল ঘর এবং ভিটামিন 'এ' এর অভাব মারাত্মক জটিলতার ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। যেসব মায়ের হামের টিকা নেওয়ার কোনো ইতিহাস ছিল না, তাদের শিশুদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ শিশুই হামে আক্রান্ত হবার পর মারাত্মক জটিলতার শিকার হয়েছে।

টিকার বয়সের আগেই আক্রান্ত : গবেষণায় দেখা যায়, ২০০ জন হাম আক্রান্তের মধ্যে ১৬৭ জনের টিকা নেওয়া ছিল না। তবে তাদের মধ্যে ৯১ জন তখনও টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। এর মধ্যে ১১ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল ৬ মাসের কম এবং ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু ১ থেকে ৫ বছর বয়সী। আর ৪৬ শতাংশ শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে।

সাধারণত ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয়, অর্থাৎ তারা টিকা নেওয়ার বয়সের আগেই আক্রান্ত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে আক্রান্তদের বয়স ২ মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

যারা হামের টিকা নেয়নি, তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ অসচেতনতা বা তারিখ ভুলে যাওয়ার কারণে, ৩০ শতাংশ শিশু অসুস্থ থাকার কারণে, ৮ শতাংশ মায়ের অসুস্থতার কারণে এবং ৪ শতাংশ টিকার ভয় ও বাকি ৪ শতাংশ কার্ড হারিয়ে ফেলার কারণে টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে তুলে ধরেন কামরুন নাহার।

হাসপাতালেই সংক্রমণ : গবেষণায় সংক্রমিত শিশুদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুই কোন না কোন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে, যা হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতাই তুলে ধরে। কামরুন নাহার বলেন, "হাসপাতালগুলোতে শয্যা স্বল্পতার কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশু থাকায় হামের সংক্রমণ হচ্ছে।" চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, "শনাক্ত হওয়ার আগে নানা উপসর্গ নিয়ে জেনারেল ওয়ার্ডেও হামের রোগী থাকছে। তাদের সংস্পর্শে সাধারণ রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ হচ্ছে। অন্য রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আবার হাম নিয়ে হাসপাতালে আসছে। "হামের জন্য পৃথক হাসপাতাল করা গেলে সংক্রমণ কমবে। চিকিৎসা দেওয়া সহজ হবে।"

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. এম এ হাসান চৌধুরী বলেন, "হাম উচ্চমাত্রায় সংক্রমণশীল। একজন রোগী থেকে ১২-১৫ জনের শরীরে সংক্রমণ হতে পারে। তাই আইসোলেশন খুবই দরকার। আক্রান্তকে আলাদা না রাখলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য বিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে।"

এছাড়া আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩২ জনের (১৬ শতাংশ) পূর্বে হামে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। কামরুন নাহার বলেন, "জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।" এ গবেষণায় ১৭ জনের নমুনা জিনোম সিকোয়েন্সিং করে প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই 'বি-থ্রি' জেনোটাইপ শনাক্ত করেছে গবেষক দল। হামের এ ধরণটি টিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কামরুন নাহার বলেন, "এই অঞ্চলের যেহেতু রোহিঙ্গাদের বসবাস, তাই ধারণা ছিল নতুন ধরনের কোনো জেনোটাইপের সংক্রমণ হয়েছে কিনা। তবে গবেষণায় নতুন কোনো 'ইমপোর্টেড ইনফেকশন' পাওয়া যায়নি।

"বি-থ্রি জেনোটাইপ আইইডিসিআর এবং আইসিডিডিআরবির পরীক্ষাতেও শনাক্ত হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়, এবার হামের সংক্রমণ হয়েছে সার্বিক টিকাকরণ কমে যাওয়ায়। ৯৫ শতাংশ ভ্যাকসিনেশন করতে পারলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।"

প্রয়োজন টিকা ও আইসোলেশন : কামরুন নাহার বলেন, "টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের তুলনায় টিকাবিহীন শিশুদের মারাত্মক জটিলতায় ভোগার সম্ভবনা প্রায় দ্বিগুণ ছিল। সবচেয়ে স্বস্তির ও উল্লেখযোগ্য খবর হলো, যারা টিকা নিয়েছিল, তাদের মধ্যে একজন শিশুরও মৃত্যু হয়নি।"

গবেষক দল হাম নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে তার মধ্যে আছে, নিয়মিত হামের টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালনার মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা, বাদ পড়া শিশুদের টিকা দিতে বাড়ি বাড়ি যাওয়া, ভিটামিন 'এ' সাপ্লিমেন্ট ও শিশুদের পুষ্টিমান উন্নত করা, টিকাদানের বয়সের কম বয়সি শিশুদের জন্য দ্রুত শনাক্তকরণ ও আইসোলেশন; হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন সুবিধা ও পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা করা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, "কোভিডে যেভাবে আইসোলেশন করা সম্ভব হয়েছিল, হামের বেলায় তা হচ্ছে না। যদি কঠোরভাবে আইসোলেশন করা যায় এবং ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা যায়, তাহলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। "হাসপাতালে ১৯৩ জন হামের রোগী ভর্তি আছে। নিয়মিত রোগী বাড়ছে। হাসপাতালে আক্রান্তদের মাধ্যমে অন্যদেরও সংক্রমণ হচ্ছে।" অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, "২০২৪ সালের ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং আগের কয়েক বছরের ব্যর্থতার কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যাকসিনেশন ও আইসোলেশন দুটোই নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও এত রোগী কেন। যেহেতু হাম উচ্চ সংক্রমণশীল, তাই মূল কাজ এখন আইসোলেশন। শিশুর মায়েদের পুষ্টিও নিশ্চিত করতে হবে।"