পেট কেটে বস্তা বেঁধে নদীতে লাশ

জিয়াউলের নিষ্ঠুরতা নিয়ে মেজরের বর্ণনা

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

গভীর রাতে ট্রলারে করে হাত ও চোখ বাঁধা ব্যক্তিদের মাঝনদীতে নেওয়া হতো। এরপর মাথায় গুলি করে, পেট কেটে এবং গলায় ও পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে লাশ ডুবিয়ে দেওয়া হতো পানিতে। খোদ র‍্যাব সদরদপ্তরের তৎকালীন গোয়েন্দা পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে এমন হত্যাকাণ্ডের নাম দেওয়া হয়েছিল 'গলফ অপারেশন'। আদালতে দেওয়া এক চাঞ্চল্যকর জবানবন্দিতে গুম, হত্যা ও সুন্দরবনে সাজানো 'এনকাউন্টারের' এমন বিবরণ দিয়েছেন র‍্যাব-৮-এর তৎকালীন উপ-অধিনায়ক মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই জবানবন্দি দেন ৫৪ বছর বয়সী সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি খুলনার বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ডেপুটি এক্সাম কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত আছেন বলে ট্রাইব্যুনালে জানান। এ সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় অভিযুক্ত লে. কর্নেল (অব.) জিয়াউল আহসানের উপস্থিতিতে এই সাক্ষ্য দেন সাব্বির।

র‍্যাবে যোগদান ও প্রেক্ষাপট : জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির জানান, ১৯৯৩ সালের ১৮ জুন তিনি ২৮তম বিএমএ লং কোর্সের সঙ্গে সাঁজোয়া কোরে কমিশন লাভ করেন। ১৬ বছর চাকরির পর ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে মেজর পদমর্যাদায় তিনি র‍্যাবে বদলি হন। শুরুতে র‍্যাব-২-এর ধানমন্ডি কোম্পানির কমান্ডার এবং একই বছরের অক্টোবরে বরিশালে র‍্যাব-৮-এর উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন।

তৎকালীন সময়ে র‍্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) ছিলেন কর্নেল মতিউর রহমান এবং গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান।

সাব্বির জানান, জিয়াউল আহসান বিভিন্ন সময় র‍্যাব-৮-এর অধিনায়ককে এবং তাকে আভিযানিক প্রয়োজনে সরাসরি টেলিফোনে নির্দেশনা দিতেন।

প্রথম 'গলফ অপারেশন' : জবানবন্দিতে বলা হয়, ২০১০ সালের জানুয়ারির দিকে একদিন রাতে লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ব্যাটালিয়ন সদরে আসেন। তিনি কোনো আভিযানিক দল ছাড়াই অধিনায়ক ও উপ-অধিনায়ক সাব্বিরকে নিয়ে পাথরঘাটার চরদুয়ানী ঘাটে যান। সেখানে র‍্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা একটি ট্রলার প্রস্তুত রেখেছিল। সাব্বির বলেন, 'ঢাকা থেকে আসা মাইক্রোবাস থেকে হাত বাঁধা এবং মাথায় কালো টুপি পরা এক ব্যক্তিকে ট্রলারের মাছ সংরক্ষণের খোলে ঢোকানো হয়। আনুমানিক তিন ঘণ্টা পর মোহনায় পৌঁছালে জিয়া স্যার আমাকে পানির গভীরতা মাপতে বলেন। এরপর ওই ব্যক্তিকে খোল থেকে বের করা হয়।'

হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, 'প্রথম সদস্য হাত বাঁধা ব্যক্তির গলা ও পায়ে দুটি সিমেন্ট ভর্তি বস্তা বাঁধে। দ্বিতীয় সদস্য মাথায় ছোট বালিশ ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে এক রাউন্ড ফায়ার করে। তৃতীয় জন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির পেট কেটে ফেলে এবং চতুর্থ জন পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পেট কাটার বিষয়টি নিশ্চিত করে।' এরপর লাশটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ফেরার পথে অস্বাভাবিক নীরবতা কাটাতে জিয়াউল আহসান বলেন, 'এরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এদের না থাকাই ভালো। এভাবেই এদেরকে গলফ্‌ করতে হবে।' সাব্বির জানান, ব্যাটালিয়নে ফিরে তিনি অধিনায়কের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধিনায়ক অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, 'জিয়ার মুখ থেকে সবকিছুই শুনেছ, আমার এখানে কী করার ছিল?'

চারজনকে হত্যার দ্বিতীয় ঘটনা : ২০১০ সালের মে মাসে জিয়াউল আহসান আবারও বরিশালে আসেন। ওইদিন ব্যাটালিয়নের লাইট নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আগের মতোই চরদুয়ানী ঘাট থেকে ট্রলারে ওঠা হয়।

সাব্বির জানান, এবার চারজন ব্যক্তিকে মাথায় কালো টুপি পরা ও হাত বাঁধা অবস্থায় আনা হয়। তাদের এমনভাবে ঢাকা হয়েছিল যে পুরুষ না নারী, তা বোঝার উপায় ছিল না। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই মোহনায় গিয়ে একইভাবে প্রথম তিনজনকে গুলি করে, পেট কেটে ও বস্তা বেঁধে সাগরে ফেলা হয়।

চতুর্থ ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত সুঠামদেহী হওয়ায় তাকে খোল থেকে বের করতে বেগ পেতে হয় র‍্যাব সদস্যদের। পরে তাকেও একই কায়দায় হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। সাব্বির জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি চলত রোবটের মতো; কেউ কারও সঙ্গে কোনো কথা বলতেন না।

পেট কাটা লাশ ভাসল বলেশ্বওে : দ্বিতীয় ঘটনার ২-৩ দিন পর গোয়েন্দা সূত্রে খবর আসে, শরণখোলার বলেশ্বর নদীতে মুখ ঢাকা, পেট কাটা এবং সিমেন্টের বস্তা বাঁধা একটি লাশ ভেসে উঠেছে। অধিনায়কের নির্দেশে সাব্বির বিষয়টি জিয়াউল আহসানকে জানালে তিনি বলেন, 'আমি তো জানলাম, প্রয়োজন নেই। তবে ফলোআপ অব্যাহত রাখো।' ২-৩ মাস পর বিজিবির গোয়েন্দাদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, নিহত ওই ব্যক্তি ছিলেন সাবেক বিজিবি সদস্য নজরুল।

মাঝি আলকাছকে গুম : জবানবন্দিতে মেজর সাব্বির জানান, ২০১১ সালের জুনে জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে আলকাছ মাঝি নামের একজনকে 'এলিমিনেট' (হত্যা) করার নির্দেশ দেন। আলকাছ চরদুয়ানী বাজারে 'গলফ অপারেশন' নিয়ে কথা বলে বেড়াচ্ছিল, যা র‍্যাবের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছিল। সাব্বির শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে এ কাজ থেকে অব্যাহতি চাইলে জিয়াউল আহসান ফোন রেখে দেন। সপ্তাহখানেক পর আলকাছের স্ত্রী র‍্যাব ক্যাম্পে এসে জানান, জিয়া স্যারের কথা বলে আলকাছকে ডেকে নেওয়া হয়েছে এবং তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। সাব্বির বলেন, 'বিষয়টি শোনার পর আলকাছের পরিণতি বুঝতে আমাদের কারও অসুবিধা হলো না।' সুন্দরবনে সাজানো 'এনকাউন্টার' : জবানবন্দিতে সুন্দরবনে তিনটি সাজানো বন্দুকযুদ্ধের (এনকাউন্টার) কথা উল্লেখ করেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।

নিশানখালী খাল (নভেম্বর ২০১১) : বনদস্যু রাজু বাহিনীর আস্তানায় অভিযানের নামে নাটক সাজানো হয়। সেখানে আগে থেকেই ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা অবস্থান করছিল। জবানবন্দিতে বলা হয়, ঘটনাস্থলে দুটি মৃতদেহ পাওয়া গেলেও মামলায় ছয়টি লাশ দেখানো হয়। বাকি চারজনকে ঢাকা থেকে এনে জিয়ার নির্দেশে হত্যা করে মূল অভিযানের সঙ্গে চালিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় র‍্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার সোহাইল এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

কটকা ফরেস্ট স্টেশন (ফেব্রুয়ারি ২০১২) : মূল অভিযানের আগের রাতে জিয়াউল আহসান ট্রলারে করে পাঁচজন হাত বাঁধা ব্যক্তিকে নিয়ে মোহনায় যান। চারজনকে মাঝদরিয়ায় একইভাবে হত্যা করা হয়। পঞ্চম ব্যক্তিকে মূল এনকাউন্টার স্থলে নিয়ে বনের ভেতর ঢুকিয়ে গুলি করে মারা হয়। পরের দিন চারটি লাশ উদ্ধার দেখানো হয়, যার একটি ছিল অজ্ঞাত। সাব্বিরের ধারণা, অজ্ঞাত লাশটি ওই পঞ্চম ব্যক্তির।

মরা ভোলা এলাকা (মার্চ ২০১২) : হেলিকপ্টার ও বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক নিয়ে এই ত্রিমাত্রিক অভিযান চালানো হয়। সেখানেও আগে থেকেই ইন্টেলিজেন্স টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিল। ৩০ মিনিট ফাঁকা ফায়ারিংয়ের পর পাঁচটি মৃতদেহ ও অস্ত্র উদ্ধার দেখানো হয়। সাব্বির জানান, এই অভিযানগুলো যে সাজানো ছিল, তা স্পষ্ট। কারণ দস্যুদের হাতে অটোমেটিক অস্ত্র না থাকলেও ঘটনাস্থলে অটোমেটিক অস্ত্রের ফায়ারের শব্দ পাওয়া যেত। এছাড়া গোলাগুলির সময় র‍্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ছাড়াই সাধারণ পোশাকে ঘুরে বেড়াতেন, যা সত্যিকারের এনকাউন্টারে অসম্ভব।

'জিয়াকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে' : জবানবন্দির শেষ অংশে সাব্বির জানান, 'গলফ অপারেশনের' একটি নির্দিষ্ট ধরন বা প্যাটার্ন ছিল। নিহতদের পরিচয় শুধু জিয়াউল আহসানই জানতেন। হত্যার সরঞ্জাম (যম টুপি, বস্তা, রশি) ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরাই আনত। বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে জিয়াউল আহসান এমন ১৫-২০টি গলফ অপারেশন চালিয়েছিলেন বলে সাক্ষ্যে দাবি করেন সাবেক এই মেজর। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মেজর সাব্বির অধিনায়কের কাছে নিজের অনুভূতির কথা জানালে অধিনায়ক বলতেন, 'জিয়াকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে?' সাব্বিরের দাবি, মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে চাকরির ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া মাত্রই স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেন। ২০১৩ সালের আগস্টে তিনি মাতৃবাহিনীতে (সেনাবাহিনী) ফেরত যান এবং ২০১৪ সালের মার্চে এলপিআরে যান।