প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক যাচ্ছেন আগামীকাল

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী সোমবার নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে নিজের প্রথম বক্তব্য রাখবেন তিনি। সংক্ষিপ্ত এই সফরকালে একাধিক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ও কূটনৈতিক আয়োজনে তার ব্যস্ত সময় কাটানোর কথা রয়েছে।

তুলনামূলক একটি ছোট প্রতিনিধিদল নিয়ে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবেন। বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরা এবং দেশের মূল অগ্রাধিকারগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট করাই তার এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের বার্ষিক উচ্চপর্যায়ের সাধারণ আলোচনা বা 'জেনারেল ডিবেট' ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে বলে বার্তাসংস্থা ইউএনবিকে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। বিভিন্ন দেশের নেতারা এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধান প্রধান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের বিষয়ে নিজ নিজ অবস্থান ও অগ্রাধিকার ব্যক্ত করে থাকেন।

তারেক রহমানের এই সফরটি জাতিসংঘের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গত জুনে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ইতিহাস গড়ে দ্বিতীয় কোনো বাংলাদেশী হিসেবে এই সম্মানজনক দায়িত্ব পেয়েছেন।

গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য হলো— 'আস্থা পুনর্গঠন, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সকলের জন্য ফলপ্রসূ জাতিসংঘ'।

সংক্ষিপ্ত এই সফরকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডজনখানেকেরও বেশি দ্বিপাক্ষিক ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব বৈঠকের মধ্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ আল-খালেদ আল-সাবাহ, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচ এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ব্র্যান্ডন নেলসনও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত এক নৈশভোজেও যোগ দেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের নতুন রূপরেখা, গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং জনগণের প্রত্যাশার বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। 'নিউইয়র্কে তার অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটবে,' উল্লেখ করে কবির বলেন, সাধারণ পরিষদের আলোচনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করবেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে। সফরকালে বাংলাদেশ এই ইস্যুতে একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানের (সাইড ইভেন্ট) আয়োজন করার পরিকল্পনা করেছে। হুমায়ুন কবির বলেন, 'সফরের অংশ হিসেবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা বা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এটি আমাদের জন্য অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।'

জাতিসংঘের রিফিউজি কনভেনশন নিয়ে আলোচনা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এই সফরে নির্দিষ্ট সনদের চেয়ে সামগ্রিক রোহিঙ্গা সংকটের ওপরই বেশি আলোকপাত করবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের বিষয়ে কবির বলেন, বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ক্ষেত্রে এ ধরনের বৈঠকগুলো অনেক সময়ই শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত করা হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর সফরের মূল লক্ষ্য হলো— জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া।' এর বাইরে অন্যান্য পার্শ্ব-বৈঠকগুলোর চূড়ান্ত তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, '৮১তম সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার তুলে ধরার একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এটি একটি নতুন যাত্রা, নতুন সম্ভাবনা এবং নতুন আশার সূচনা।'

শামা ওবায়েদ জানান, সরকারের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' (বাংলাদেশ প্রথম) পররাষ্ট্রনীতিই প্রধানমন্ত্রীর সব কার্যক্রমের মূল দিশারি হিসেবে কাজ করবে, যার মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা।

তিনি আরও জানান, রোহিঙ্গা সংকট বিশেষ গুরুত্ব পাবে এবং সাধারণ অধিবেশন চলাকালে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই বিষয়ে একটি নিবেদিত সেশন বা অধিবেশনের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ, আরাকান আর্মি, আঞ্চলিক শক্তিগুলো এবং বৈশ্বিক স্বার্থান্বেষী মহলের ভূমিকা থাকার কারণে রোহিঙ্গা সমস্যাটি ক্রমেই জটিল রূপ ধারণ করেছে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, 'প্রকৃতপক্ষে এই সমস্যা আরও গভীর হয়েছে ও আঞ্চলিক জটিলতার সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া এই সংকটের সমাধান করা খুবই কঠিন হবে।' রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান।

তিনি বলেন, 'রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। কিন্তু এটি বাংলাদেশের তৈরি সমস্যা নয়। বাংলাদেশ এই সংকটের জন্ম দেয়নি।'

তারেক রহমানের আগমন ঘিরে নিউইয়র্ক বিএনপির জোরালো প্রস্তুতি: জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে সোমবার নিউইয়র্ক পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই আগমন ও সফরকে সার্বিকভাবে সফল করতে জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক নেতারা।

সেই লক্ষ্যে স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার বিকালে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন এবং সাবেক নেতাদেরকে নিয়ে এ পর্যন্ত মোট ৩৪টি প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবারের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বিমানবন্দর এবং জাতিসংঘের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে সর্বোচ্চ শৃঙ্খলা ও ধৈর্য বজায় রাখা হবে। কোনো অবস্থাতেই যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের সহনশীল ও সজাগ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। সভায় উপস্থিত সাবেক ও বর্তমান নেতারা দীর্ঘদিন পর বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরকে সুন্দর, অর্থবহ ও সফল করার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেন।