আইফোনই কাল হলো অপ্রতীমের
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
কুমিল্লা প্রতিনিধি

নিখোঁজের একদিন পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন স্থান থেকে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় একজনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে তাকে আটক করা হয় বলে জানান কোটবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মফিজউদ্দিন ভূঁইয়া। পুলিশ জানায়, ওই এলাকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে একজনকে দেখা যায়। এর ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় 'ক্লু' পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে থাকা ব্যক্তির পরিচয় জানাননি তিনি। সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার বলেন, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। তারা কিছু ক্লু পেয়েছেন এবং একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মো. আনিসুজ্জামান বলেন, 'সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনা ডিটেক্ট করে ফেলি এবং মূল আসামি ধরে ফেলেছি। আজকের যে ঘটনাটি ঘটেছে, অপ্রতিম যে বাচ্চাটি, তার মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা; আপনারা জানেন। এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক, আমাদের নাড়া দিয়েছে।'
তিনি বলেন, 'আমার একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। আমাদের কাছে আছে একজন ব্যক্তি, আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমি এখান থেকে যাওয়ার পর আমরা ননস্টপ জিজ্ঞাসাবাদ করে আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কে কে জড়িত, এটার মোটিভ কী ছিল, কী উদ্দেশ্যে তাকে...। এই ছোট বাচ্চাটি, নিষ্পাপ বাচ্চাটিকে মেরে ফেললো—এটা কি শুধুই একটি আইফোনের জন্যই ছিল, নাকি এর সঙ্গে অন্য কিছু জড়িত; এ বিষয়টি আমরা সঠিকভাবে খতিয়ে দেখব, তদন্ত করব।' পুলিশ সুপার বলেন, প্রকৃত যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেপ্তার করে অপ্রতিমের বাবা-মা ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে পুরো বিষয় জানানো হবে। তিনি এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সহযোগিতাও চান।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে থাকা ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনই নিশ্চিত নয় জানিয়ে মো. আনিসুজ্জামান বলেন, 'এটা এখনও জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে আছে। আমাদের একটু সময় দেওয়া লাগবে। কারণ তার মোবাইল, তার প্রযুক্তি, তার লোকেশন; এই যে ছেলেটি অপ্রতিম মারা গেলো, এর লোকেশন; আমরা এখানে অনেক কিছু মিলাই। যাকে ধরেছি, সে নির্দোষ হতে পারে, আবার দোষীও হতে পারে।' তিনি আরও বলেন, 'এই মুহূর্তে এর সঙ্গে যারা মূল কিলার, মিডিয়ার মাধ্যমে জেনে গেলে ওরা গা ঢাকা দিবে। এজন্য আমি এখন আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমি ঘটনাটা উদ্ঘাটন করেই মূল আসামি ধরে আপনাদের আমরা অবশ্যই ডেকে বিস্তারিত বর্ণনা করব।' অপ্রতিমের শরীরে কী ধরনের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, সুরতহাল এখনও সম্পন্ন হয়নি। সুরতহাল শেষ হলে এ বিষয়ে বলা যাবে।
'আমার তো একটাই ছেলে, ওকে ছাড়া জীবন পার করব কীভাবে'
'আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে আমি জানতে চাই, আমাকে জবাব দেন। আমি এই কুমিল্লায় চাকরি করতে আসছি, এটাই কি আমার অন্যায়? আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি শুধু সেটার জবাব চাই।' কথাগুলো বলেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। একমাত্র ছেলে অপ্রতিমের (১৩) লাশ উদ্ধারের পর আহাজারি করছেন তিনি। গতকাল দুপুরে কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকায় ড. নাহিদ বেগমদের বাসায় যান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় সংসদ সদস্যের কাছে কাঁদতে কাঁদতে এসব আহাজারি করেন তিনি।
তিনি বলেন, এটা কোন দেশ? আমি বাঁচব কীভাবে? আমার তো একটাই ছেলে। কীভাবে আমার জীবন কাটাব? আপনারা সবাই বলেন, ওকে ছাড়া আমি আমার জীবন পার করব কীভাবে? এভাবেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।
এ সময় ড. নাহিদা বেগমের কান্না দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনিও শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠেছেন বারবার। পরে ন্যায় বিচারের আশ্বাস দিয়ে সান্ত্বনা দেন সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী।
বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলের লাশ পাওয়ার পর তার 'হত্যার' বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে মিছিলটি শুরু হয়ে দক্ষিণ মোড় প্রদক্ষিণ করে এরপর আনসার ক্যাম্পের সামনে গিয়ে শেষ হয়। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা, বারো ঘণ্টার মধ্যে বিচার নিশ্চিত না হলে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক অবরোধসহ কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা, 'ধিক্কার ধিক্কার, পুলিশ ধিক্কার' 'অপ্রতীম মরলো কেন, প্রশাসন জবাব দে', 'জাস্টিজ জাস্টিজ, উই ওয়ান্ট জাস্টিজ'সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
ফার্মেসী বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের নাঈমুর রহমান বলেন, 'বারো ঘণ্টার মধ্যে দোষীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। কুমিল্লা শহরে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।' একই শিক্ষাবর্ষের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী অঞ্জন রায় বলেন, 'আজকের এই ঘটনার বিচার ১২ ঘণ্টার মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে, শহরে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কুবি ক্যাম্পাসে পাশে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করতে হবে এবং কুমিল্লার প্রশাসনের বিচার কার্যক্রম দৃশ্যমান করতে হবে না হলে কুমিল্লা-চটগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করা হবে।'
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার বিকালে কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম নামের ১৩ বছরের এক কিশোর। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম। শুক্রবার বিকালে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেনি সে। পরে অপ্রতিমের বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন।
নিখোঁজের পরদিন শনিবার দুপুর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের পাশে লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা গ্রামের ঝোপ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অপ্রতিম কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকায় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তুহিন নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে আইফোনটি নেওয়ার জন্য তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে আটককৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
