স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান

পেট্রোবাংলার বড় উদ্যোগ কিনবে নতুন রিগ

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে ১১৮টি কূপ খননের চার বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিজেদের ড্রিলিং ফ্লিট সম্প্রসারণ এবং প্রকল্পগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেট্রোবাংলা।

দেশে চলমান তীব্র গ্যাস সংকট নিরসন ও ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১,৪৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) নতুন গ্যাস যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে ড্রিলিং রিগের তীব্র সংকট ও নতুন ক্রয়ের অনুমোদনে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে, পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। পেট্রোবাংলা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৭টি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৩০টি, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৩৩টি এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৩৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা করছে।

বর্তমানে পেট্রোবাংলার অনুসন্ধান শাখাু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) নিজস্ব পাঁচটি রিগ রয়েছে। এগুলো হলো— বিজয়-১০, বিজয়-১১, বিজয়-১২, বিজয়-১৮ এবং আইপিএস-১। তবে এর মধ্যে তিনটি রিগ ওয়ার্কওভার (কূপ সংস্কার) কাজের জন্য নির্দিষ্ট থাকায়, উন্নয়ন বা অনুসন্ধানমূলক কূপ খননে সক্রিয় রয়েছে মাত্র দুটি রিগ।

গড়ে ৩,৫০০ মিটার গভীরতার একটি কূপ খনন, রিগ স্থাপন এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরের সময় বিবেচনায়— একটি রিগ দিয়ে বছরে সর্বোচ্চ তিনটি কূপ খনন করা সম্ভব। এই সক্ষমতার ঘাটতি মেটাতে পেট্রোবাংলা একটি নতুন ২,০০০ হর্সপাওয়ারের রিগ কেনার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ১,৫০০ হর্সপাওয়ারের অপর একটি রিগ ক্রয়ের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস, অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, "গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এবং দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে—সরকারের বিশেষ গুরুত্বের সাথে সঙ্গতি রেখে আমরা আগামী চার অর্থবছরে ১১৮টি কূপ খননের একটি কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছি।" তিনি জানান, চিহ্নিত কূপগুলোর বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খননযোগ্য কূপ থেকে দৈনিক ১৭৫ এমএমসিএফডি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৩৬০ এমএমসিএফডি, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪৩৬ এমএমসিএফডি এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৪৯৫ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, ডিপিপি চূড়ান্ত হলে তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কেবল রিগ কেনাই যথেষ্ট নয়; প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করার পরই কেবল মাঠে রিগ নামানো সম্ভব হবে।

পরিকল্পনায় বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও— বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। ১১৮টি পরিকল্পিত কূপের মধ্যে ৪৭টির প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি বা প্রশাসনিক পর্যালোচনার পর্যায়ে আটকে আছে। আর বাকি কূপগুলোর জন্য একেবারে নতুন প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর— জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এপর্যন্ত মাত্র তিনটি কূপ খননের অনুমোদন দিয়েছে। এগুলো হলো— নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ-৫ ও বেগমগঞ্জ-৬ এবং সুনামগঞ্জের সুনেত্র-২। গত ২২ জুলাই ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাপেক্সের এই প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মূল চ্যালেঞ্জ কেবল কূপ খননের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নতুন আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন স্থাপন ও প্রসেসিং প্ল্যান্ট তৈরির মতো অবকাঠামোগত কাজে—পেট্রোবাংলা ঐতিহাসিকভাবেই পিছিয়ে রয়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছর থেকে এপর্যন্ত পেট্রোবাংলা ৩২টি কূপ খনন করে প্রায় ২৮৬ এমএমসিএফডি গ্যাস আবিষ্কার করেছে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে এর মধ্যে মাত্র ১৩৪ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পেরেছে। ফলে আবিষ্কৃত রিজার্ভের অর্ধেকেরও বেশি অনুত্তোলিত অবস্থায় রয়ে গেছে।

পূর্বে খনন করা ৩২টি কূপের পাশাপাশি নতুন ১১৮টি কূপের কার্যক্রম সফলভাবে শেষ করা গেলে, সব মিলিয়ে সম্ভাব্য মোট ১,৭৫২ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ পাওয়া সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছে পেট্রোবাংলা। প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, "লজিস্টিকসের বিভিন্ন প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোয়, তাহলে উত্তোলন করা এই গ্যাস দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি সংকট লাঘবে বড় ভূমিকা রাখবে।" তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, চার বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি কেবল বাপেক্সের খনন সক্ষমতার ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে না, বরং অনুসন্ধান থেকে দ্রুত উৎপাদনে যাওয়া এবং নতুন আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা নেবে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং পর্যাপ্ত রিগের সংস্থান ছাড়া— নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা অর্জন করা কঠিন হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, "একটি গ্যাস কূপের গড় গভীরতা ৩,৫০০ মিটার। রিগ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সময় হিসাব করলে— একটি রিগ দিয়ে বছরে গড়ে ৩টির বেশি কূপ খনন করাও সম্ভব নয়।"